নতুন পোস্ট

কবিতা : শিরোনাম নেই : শুভ্র আহমেদ

আমাদের চেনাজানা পথগুলো এতোদিনে বুনোফুল আর নাম না জানা লতায় ভরে গেছে নিশ্চয়ই ; কতোদিন তোর হাত ধরে সেই চেনা পথগুলোয় ঘুরিনি আমরা। যে পথ ছিল আমাদের সেই পথে কী এখন বুনোরুই,শিয়াল, খরগোশ নির্ভয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চাঁদরাতে। চাঁদরাত তো তোর খুব প্রিয় ছিল, তুই যেনো কেমন হয়ে যেতিস সেসময়।

চাঁদরাতের কথায় সেই পূর্ণিমার কথা মনে এলো,আর সেই মানুষগুলোর ; তোকে তো বলা হয়নি আজ বলি, বিশ্বাসমতে প্রত্যেক কোজাগর রাতে লক্ষ্মী নাকি কচ্ছপের বেশে মর্ত্যে নেমে আসে ; কদাচিত কেউ দেখা পেলে তার আশু পরিবর্তন এই যেমন, দরিদ্র ধনবান, অসুস্থ সুস্থ, তার অকল্যাণের পৃথিবী কল্যাণে ওঠে ভরে। আমি কিন্তু আজও জানি নে সুস্থ, ধনী আর কল্যাণময় পৃথিবীর চোখে যদি সেই কচ্ছপের ছায়া পড়ে তবে কী সে আবার যথাক্রমে গরিব, রোগাক্রান্ত, আর অকল্যাণকর হয়ে উঠবে;

তোর নিশ্চয়ই মনে পড়ছে, গত কোজাগরে আমরা কিন্তু কোনো কচ্ছপ দেখিনি।

মেট্রোর মধ্যে সত্যি বলছি মনে হয়েছিল, চন্দ্রস্নান সেরে তুই যদি আরেকবার সেদিনের মতো সামনে এসে সম্মুখবর্তী সহযাত্রীনির জায়গায় দাঁড়াতিস মধ্যমাঠের ঝি ঝি ধরার একাগ্রতা ছেড়ে দুরন্ত পঁচিশের প্রাচীর তুলে তোকেই জড়িয়ে ধরতাম।

আমি আর দীঘায় যেতাম না।তোর চোখেই যখন বঙ্গোপসাগর তখন দীঘায় আর কী কাজ।

এখন অবশ্য দীঘায় যাওয়া বারণ, বঙ্গোপসাগরে চন্দ্রস্নান করাও বারণ।

সতের শ ঊননব্বই, তখন ফরাসি বিপ্লব সবে শেষ। চাকরি-বাকরি খুব বাড়ন্ত। এটা অবশ্য তেমন কিছু নয়, সব বিপ্লবের পরে সবদেশে যেমনটা হয় আর কী। ফরাসিরা তখন অলিতে-গলিতে খুলে বসলো কফি রেস্তোরাঁ নামের এক অভিনব পানশালা। এইসব পানশালাগুলোই তখন হয়ে উঠলো শিল্প -সংস্কৃতি -রাজনীতি চর্চার তীর্থ।এক শ’ নব্বই, ইংরেজ শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কলকাতার অদূরে চন্দননগর সেটুকু অবশ্য ফরাসিদের ছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত।

বাঙালি ইংরেজিতে পারদর্শী না হলেও ইংরেজ অনুকরণে পটু, গালির মতো শোনালেও কথাটা মিথ্যাে বা মিথ নয। মুখের কথায় বিশ্বাস হচ্ছে না , তাকিয়ে দেখুনতো একবার —- ফৌজদারি দণ্ডবিধি আর দেশরক্ষার তাকিয়ে দেখুন, লাল ফিতায় বাঁধা রুটিন ফাইলগুলোর দৌরাত্ম্যের ব্যাপারেও বা কী বলবেন, সিভিল সার্ভেন্ট থুড়ি আমলা থুককো জনগনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা পদ পদবির ভিন্নতায় , গাঁইয়ারা অবশ্য বলে, ‘সব রসূনের পাছা নাকি এক জায়গায় ‘ ওদের দিকে তাকিয়ে দেখুন একবার, কথা অবশ্য সেটা নয়, ঐ রেস্তোরাঁ, চাকরি- বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পুঁজিবাজার,শেয়ার মার্কেট সবকিছুই যখন বাড়ন্ত এদেশে তখন বেঁচে থাকতে হলে মানুষের তো কিছু একটা করা চাই ;সুতরাং সততার অভাব থাকতে পারে,বড় পুঁজির অভাব থাকতে পারে, প্রযুক্তি -বিজ্ঞানের অভাব থাকতে পারে, চাকচিক্যময়তার অভাব থাকতে পারে , তাতে কী ফরাসি শিক্ষায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায় জাত বাঙালি খুব পারদর্শী, তাই সে দেশে হোক আর বিলেতে।

এদেশের রেস্তোরাঁগুলোয় এখন আর আগের মতো আড্ডা জমছে না।অনেক হ্যাপা। সরকারি বিধিনিষেধ মানতে হচ্ছে একপক্ষের, অন্যপক্ষের ভয় অন্যখানে। বুঝতেই তো পারছেন– সংক্রমণ ;

ওসব কথা থাক। পৃথিবী সুস্থ হলে ভাবছি, তোকে সাথে নিয়ে সরবান শিক্ষালয়ের
কাছাকাছি কোনো কমদামি রেস্তোরাঁয় বসে বিয়ারে চুমুক দেবো।

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক বলে যে ছেলেটি বিপ্লবের আগেই মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে প্রদীপ্ত যিশুর মতো হারিয়ে গিয়েছিল তাকে আর একবার কাছে পেলে তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতাম ; পরিচয়ের কথা মনে হতেই আরো একটা কথা মনে পড়ে গেলো। না সুধীন দত্তের কথা বলছি নে,

তোর সাথে আমার যখন আলাপ তখন তুই ছিলি ঠিক পুতুলের মতো।তবে পুতুল নোস,তারচেয়ে বেশি অনেক কিছু। তোর ভিতরের সেই অনেক কিছুটাকে সরিয়ে তোর পুতুলটাকে স্পর্শ করতেই তো পার হয়ে গেলো দু’ যুগ।


আলাপ পর্বের মধ্যে সম্পর্কটাকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইনি, না আমি না তুই; তবু তোর মনে হয়েছে এই বন্ধুত্ব না হলেই ভালো ছিল ;আমার কী মনে হয় জানিস– না থাক সে কথা আরেকদিন।

তোর পুতুলটাকে পুতুলের মতোই যত্নে রাখিস কিন্তু।

‘ কবিরা কখনও হতে পারে নাকি কারোর প্রেমিক ?
তারা ভালোবাসে আর গান গায়
তাদের প্রেমিকা আসে যায় শুধু আসে যায়। ‘

সুবোধ পড়তে পড়তে তোর মাথাটা একদম নষ্ট এখন। অথচ এই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি অনেকবার তোর ঠোঁটচাপা হাসি মরূদ্যানে ফুটিয়ে তুলেছিল রঙিন প্রসূনভরা হাজারটা ঝুলন্ত উদ্যান, যা ছিল ব্যাবিলনের চেয়ে অভিনব। মুমূর্ষুরে উড়িয়ে দিয়েছে বাতাসভরা বেলুনের মতো নীল থেকে নীলাম্বরে। নক্ষত্রখচিত আকাশটাকেও তোর বাড়ির কার্পেট মনে হয়েছিল , এই তো শেষ যেদিন আমি তোর দেহের ভূগোল পাঠে কম্পাসকাঁটার ঠিক ঠিক ব্যবহার করেছিলাম।

সুবোধ যেমন কাদম্বিনীর কাছে, দাঁড়া তোকেও একটা প্রশ্ন করি কিন্তু কিভাবে ? হায় —– বাসা নয়, বাড়ি নয, হোম হোমেই কাটছে সময়।

তোর সাথে দেখা হয় না সেও তো অনেকদিন।

রাতদুপুরে রোদ, এ কোনো ভালো লক্ষ্মণ নয়। অসময়ে বৃষ্টি যেমন মনে
করিয়ে দেয় তোর আকাশ এখন মেঘাচ্ছন্ন।

বন্ধু কেমন আছিস বল ?

গঙ্গাসাগরে চুল ধুয়ে তোর খোঁপার যত্ন নেয়ার বেলায়, কৃষ্ণ বিস্ফোরণের ধাক্কায় আকাশগঙ্গা বেয়ে একটুকরো ছাই নেমে এলেও আমি তাকে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে হাত পেতে ধরে নেবো।

তোকে ছোঁবে না, তোকে ছোঁবে না, তোকে কেউ ছোঁবে না।

কেউ একজন ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আততায়ী এতোটাই সতর্ক, তাকে না পারছি ধরতে না পারছি একক যুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রথম গুলি ছুড়তে।
তাইতো এখন এই আড়াল। তোর চোখ, তোর চিবুক, তোর সুডৌল বুকের উপত্যকাজুড়ে মধ্যদুপুরের মৌ মৌ ঝাঁজ গন্ধের সমবেত সমাবেশে দাঁড়িয়ে এই পৃথিবীর তুচ্ছ কিছু এই যেমন তুলসীফুলের দিকে তাকিয়ে আরো অনেকদিন তোকে নিয়ে আমাদের সেই চিরচেনা পথে পান্থজনের সখা হবো।

শুভ্র আহমেদ

জন্ম : ০৩ অক্টোবর ১৯৬৬

প্রকাশিত বই

কার্নিশে শাল্মলী তরু : কবিতা : ১৯৯৯, আড্ডা
বিচিত পাঠ : প্রবন্ধ : ২০১৪, ম্যানগ্রোভ
বলা যাবে ভালোবেসেছি : কবিতা : ২০১৫, ম্যানগ্রোভ
দুই ফর্মায় প্রেম ও অন্যান্য কবিতা : কবিতা : ২০১৬, ম্যানগ্রোভ
রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বাঁশি বাজিয়েছেন এবং অন্যান্য : প্রবন্ধ : ২০১৯, ম্যানগ্রোভ

About S M Tuhin

দেখে আসুন

কবিতা : আশুতোষ সরকার

আশুতোষ সরকার আজ আমি কোথাও যাবােনা আজ আমি কোথাও যাবােনা আসুক যতই কর্তব্যের অমােঘ ডাকসুবেহ …

একটি কমেন্ট আছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *