নতুন পোস্ট

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র গদ্য । আমি গারসিয়া লোরকা, কবি । অনুবাদ : এমদাদ রহমান

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র গদ্য

This image has an empty alt attribute; its file name is 11085670_federico-garcia-lorca.jpg


আমি গারসিয়া লোরকা, কবি

অনুবাদ ও ভূমিকা : এমদাদ রহমান

হিস্পানি ভাষার কবি ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র এই লেখাটি বিষয় মূলত, স্মৃতি — কবির নিজের আত্মার দিকে ফিরে তাকানোর কথা আছে এখানে। লেখাটি হিস্পানি’তে লা ভিদা দে গারাসিয়া লোরকা, পোইয়েতা শিরোনামে হোশে লুনা’র একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ, যাকে ক্রিস্তোফার মোরের ইংরেজিতে দ্য লাইফ অভ গারসিয়া লোরকা, পোয়েট এই শিরনামে গভীর গান ও অন্যান্য প্রবন্ধ গ্রন্থে একটি সম্পূর্ণ স্মৃতিকথামূলক গদ্য হিসেবে স্থান দিয়েছেন, আবার মোরের এই কথাটিও জানাচ্ছেন যে এই লেখাটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারেরও গদ্যরূপ। ১৯৩৩ সালের ১৬ই অক্টোবর বুয়েন্স আইরেসে কীভাবে একটি নগরী গান গাইতে থাকে, নভেম্বর থেকে নভেম্বরে শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন — আজ আমি সেই ছেলেটির মতো, কোন উৎসবের জন্য নিজের মাকে রঙিন সাজে সাজতে দেখে যে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনিভাবে আমি আপনাদেরকে একটি নগরীর কথা বলব, যেখানে আমি জন্ম নিয়েছিলাম। তার নাম গ্রানাদা। আর গ্রানাদা’র কথা বলতে গিয়ে আমি এই নগরীর সঙ্গীতের বিভিন্ন উদাহরণ দিব। আমি গানগুলো গাইবও। … গারসিয়া লোরকা’র জন্ম স্পেনের গ্রানাদায়, ৫ জুন ১৮৯৮ সালে। কবির গ্রামের নাম ফুয়েন্তে ভাকুইরোস। ১৯ আগস্ট ১৯৩৬-এ মর্মান্তিক মৃত্যু হয় কবি ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা’র। সালভাদর দালি, লুই বুনুয়েল, পাবলো নেরুদা, রাফায়েল আলবেরতি, হুয়ান রামোন হিমেনেথ — এইসব দুনিয়াখ্যাত মানুষ ছিলেন তাঁর বন্ধু। জিপসি-গীতিকা, গভীর গানের কবিতা, গীতিমালা, নিউইয়র্কে কবি ইত্যাদি তাঁর কবিতার বই। আর রয়েছে বেশ কিছু নাটক, যেমন— রক্তবাসর, ইয়ারমা, বারনারদা আলমা’র বাড়ি।

আমার জীবন ? জীবন বলতে যা বোঝায়, তা কি আমার ছিল? আমার নিজেকে এখনও একটি শিশু ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। ছেলেবেলার আবেগ অনুভূতিগুলি এখনও আমার ভিতর প্রবলভাবেই বর্তমান, আমি তাদের কোনোভাবেই ত্যাগ করতে পারিনি। নিজের জীবনের কথা বলতে গেলে, বলতে হবে; আমি আসলে কে? যে-কারোরই জীবন হল বেঁচে-থাকবার-কালে, কী কী ঘটেছে; তার-ই বৃত্তান্ত বা উপাখ্যান। আমার সঞ্চয়ের সমস্ত স্মৃতিই, এমনকি আমার শৈশবের সূচনা থেকেই, যা যা ঘটেছে, এখনও তীব্রভাবে জেগেই আছে।

আমি আমার শৈশবের স্মৃতি সম্পর্কেই এখানে বলছি। এই স্মৃতিগুলো একান্তই আমার একার, এত প্রগাঢ় আর গোপনীয় যে, আমি এই স্মৃতিগুলোকে নিয়ে কখনই কিছু বলতে চাইনি। আলাপ করতে চাইনি। কখনই চাইনি এগুলোকে নিয়ে কোনও বিশ্লেষণে যেতে।

আমি বেড়ে উঠেছিলাম প্রকৃতির সঙ্গে, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে। দুনিয়ার সমস্ত শিশুর মত, প্রত্যেকটি জিনিস, আসবাবপত্র, লতাগুল্মবৃক্ষ আর পাথরগুলো, অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ছিল আমার কাছে। তাদের পৃথক সত্তাগুলোকে শ্রদ্ধা করতাম। অবিরাম কথা বলতাম তাদের সঙ্গে। জীবনের সূচনাকাল থেকে তাদের সঙ্গে আমার কতই-না কথা হল আর তাদের কী তীব্র ভালোই না বাসতাম। আমাদের বাড়ির উঠানে বেশ কয়েকটি পপলার গাছ ছিল, এক ঘোরগ্রস্ত বিকালে আমার মনে হল, কাল কাল এই পপলারগুলো গান গাইছে! বাতাস প্রবল বেগে যখনই গাছগুলোকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে পপলারদের গান পালটাচ্ছে সুর, পালটাচ্ছে তাল, লয় আর হতবিহবল আমি, ভাবছি; এই তো সঙ্গীত, হৃদয়ের অন্তঃস্থ সঙ্গীত। পপলার বৃক্ষদের গান শোনার সহগামী হয়ে পড়েছিলাম, দিনের বড় একটি অংশ চলে যেত তাদের গান শুনায়। আসলে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম।হঠাৎ একদিন, আমি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে পড়েছিলাম, যখন শুনতে পেলাম কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে — ‘ ফে… দে… রি… কো’… তাকাচ্ছি চারপাশে। না, কেউ নাই, কাউকে দেখছি না। কে এমন শব্দ করে ডাকল? অনেকক্ষণ পর আবার সেই ডাক… আমার উপলব্ধি হল এই প্রাচীন পপলারদের শাখাপ্রশাখাগুলো বিপুল বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে, পরস্পরকে আলঙ্গন করছে বিষণ্ণভাবে।

আমি এই মাটিকে ভালবাসি। আমার অনুভূতিগুলো এই মাটির সঙ্গেই আমাকে কড়িকাঠের মত বন্ধনে জড়িয়েছে, আটকে রেখেছে।

প্রায় বিস্মৃত শৈশবস্মৃতিগুলোর সবই হল মাটি-পৃথিবীর মৃন্ময় স্বাদ উপলব্ধির। এই পৃথিবী আর এই পৃথিবীর গ্রামগুলোই, আমার জীবনকে বারবার মহৎ সব অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কীটপতঙ্গ আর প্রানিগুলো আর পাড়াগাঁর লোকজন ছিল আমার কাছে সব সময়ের এক অতি ব্যঞ্জনাময় বিষয়। হয়ত, গ্রামের লোকজনের ব্যঞ্জনাময় অভিব্যক্তিগুলোই যেন আমার জীবন-চেতনাকে আত্মিকৃত করে নিয়েছিল সুদূর শৈশবে। আর, যদি তা না-ই হতো রক্তবাসর বইটি আমার পক্ষে তাহলে কোনকালেই লিখে ওঠা সম্ভব ছিল না। মৃন্ময়কে ভালবাসা, পৃথিবীকে ভালবাসা আমার ভেতরের শিল্পিক অভিজ্ঞতা লাভের মূল বীজটি রোপণ করেছিল।

এটা হল বাস্তবতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্তরূপে এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে কোনকিছুর অকপট বয়ান। সময়টা ছিল সম্ভবত ১৯০০ সাল।আমার স্বদেশ — যে-দেশটি ছিল কৃষকদের—কৃষিজমিগুলোর মাটি চষা হত এমন এক ধরণের লাঙল দিয়ে, যে-লাঙল কায়ক্লেশে মাটির খোলসটাকে খুঁড়তে পারত আসলে নামমাত্রই। সেই বছর কয়েকজন চাষি তইরি করল একেবারে আনকোরা বাবানতি লাঙলের ফলা — এই নামটি আমার স্মৃতিতে উজ্জল — এই তেজস্বী বলবান লাঙলের ফলা ১৯০০ সালের প্যারিস এক্সিবিশনে পদক লাভ করেছিল। ছোট্ট বালক হিসাবে আমার ছিল প্রচণ্ড কৌতূহল। বালকের উৎসুক্য নিয়ে আমি দেখতাম জমির পর জমির মাটি কী প্রচণ্ড ক্ষিপ্রতায় খুঁড়ে চলেছে নতুন লাঙলের চতুর ফলা!

আমার দেখতে ভাল লাগত কীভাবে অগুন্তি ইস্পাতের ফলা খুঁড়ে চলেছে পৃথিবীর বুক আর তার গভীর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনছে নানান শিকড়বাকড়, মনে হত, না, শিকড় নয়, যেন মাটির আত্মা থেকে বের হচ্ছে রক্ত আর মাঝেমাঝে শক্ত কিছুর সঙ্গে লেগে পেরে না উঠে আটকে যাচ্ছে ফলার দুর্বার গতি।ঘর্ষণে উজ্জ্বলিত ইস্পাতের ফলা মাটি খুঁড়ে বের করে এনেছে বহুবর্ণ-পাথর-শোভিত রোমান মোজাইকের একটি খণ্ড, তাতে খোদাই করা দুইজন মানুষের নাম… আজ আমি এই ব্যপারে আর কিছুই মনে করতে পারছি না, তবে, আবছা মনে পড়ছে; নাম দুটি ছিল মেষপালক দাফনিস আর কোলী’র। বিষয়টার গুরুত্ব এইখানেই যে এখান থেকেই আমার জীবনের প্রথম শিল্প-উপলব্ধি হল বিস্ময়কর। বুঝতে পারলাম শিল্প আর সুন্দর সম্পর্কিত মাটির সঙ্গে। খোদাইকৃত এই নাম দুটি — দাফনিস আর কোলী — ছিলেন ভূমিপুত্র, পৃথিবীর স্বাদকে তারা আস্বাদন করেছেন আর জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছেন; প্রেমময় সম্পর্কের বন্ধনে। আসলে, এইসব উপলব্ধি হল আমার ভিতর জেগে ওঠা প্রথম অনুভূতি, যা খুব দৃঢ়ভাবেই ভূমির সঙ্গে বন্ধনে আবদ্ধ, মাঠঘাটে দিনমান কাজ করার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমার নিজের সঙ্গে এই কথাটাই বলতে চাই যে আমি হলাম কৃষক আর জমিজমা বিষয়ক জটিলতায় আক্রান্ত এক মানুষ, যেমনটা মনঃসমীক্ষণবিদরা, বলে থাকেন।মাটির প্রতি এই ভালবাসা ছাড়া আমার পক্ষে কোনভাবেই দ্বিতীয় কাজটি, ইয়ারমা, শুরু করতেই পারতাম না। আমার কাছে মাটি হল দীনতা, দারিদ্রতার এক প্রগাঢ় ইঙ্গিত, আমি দারিদ্রতা ভালবাসি, সবকিছুর উর্ধে বসিয়ে রাখি; কিন্তু এই দারিদ্রতা শোচনীয় বুভুক্ষা নয়; মহিমান্বিত, বিনীত, বিবর্ণ পাউরুটির মত সরল…

বৃদ্ধ জরাজীর্ণ লোকদের সামনে আমি দাঁড়াতে পারতাম না। আমি তাদের ঘৃণা করছি বা ভয় পাচ্ছি, বিষয়টা আসলে তেমন কিছুই নয়। কারণ তারা আমাকে খুব দ্রুত অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিতেন।চুপসে দিতেন। আমি কখনই তাদের সঙ্গে কথা কইতে চাইতাম না। আসলে আমি জানতামই না বৃদ্ধদের সঙ্গে ঠিক কী নিয়ে আর কীভাবে কথা বলা সম্ভব! মোটকথা এই — আমার এই কথাটাই বারবার মনে হতো — জীবনের সমস্ত গুঢ়তা সম্পর্কে কেবলমাত্র বৃদ্ধরাই জানেন। তারা শুধু এরকমই চিন্তা করেন, যাকে বলে অভিজ্ঞতা। দীর্ঘজীবনে কত সঞ্চিত অভিজ্ঞতা তাদের! তারা এমন সব বিষয়আশয় নিয়ে কথা বলতেন, যা ছিল আমার ধারণা-কল্পনা’রও বাইরের। বৃদ্ধরা কোথাও একত্রে জড়ো হলে আমার এমন এক অবস্থা হয় যে মনে হয় এখানে আমার পক্ষে একটিও শব্দ উচ্চারণ করার সামর্থ্য নাই। তাদের তির্যক ভ্রূকুটি, মুখের জটিল আয়ুরেখা, জল ছলছল ধূসর চোখ, তাদের কম্পিত ঠোঁট, তাদের পিতামহসুলভ হাস্য আমাকে আতঙ্কিত করে ফেলত। তাদের মহত্ত্বকে মনে হত সবকিছুকে যেন অতল অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এই হল জরাগ্রস্থ লোকদের বিশিষ্টতা — একটা সুদৃঢ় বন্ধন যেন যৌবন আর অন্ধকারে-আচ্ছন্ন-মৃত্যু’র সঙ্গে!

মৃত্যু! ধীরে, সুচতুরভাবে মৃত্যু সবকিছুর ভিতর ঢুকে পড়ে। বিশ্রাম, শব্দহীনতা, মৌনতা, স্তব্ধতা, প্রশান্তি — এইসব হল মৃত্যুর প্রবেশদুয়ার। মৃত্যু চতুর্দিকে। সর্বত্র। মৃত্যু হল মহান বিজেতা। আমাদের মৃত্যু শুরু হয় অবসরে, যখন পরিশ্রান্ত আমরা বিশ্রামে যাই, পরবর্তী কোনওএক দিনে, কোনও অনুষ্ঠানে, খুব প্রশান্তভাবে কথা বলার ফাঁকে, লোকেদের জুতার দিকে তাকাও। দেখবে, পরিশ্রান্ত জুতাগুলি বিশ্রাম করছে; কী ভয়ানকভাবেই না তারা বিশ্রাম করছে। তুমি দেখতে পাবে বা তোমার মনে হবে জুতাগুলি নির্বাক, বিষণ্ণ, অভিব্যক্তিহীন জিনিস ছাড়া আর কিছুই না। সমগ্র সত্ত্বা তাদের অর্থহীন, নিষ্ফল এবং ইতোমধ্যেই তারা মরতে শুরু করেছে। জুতা আর পা— তারা যখনই বিশ্রামে যায় তখন তাদের নিরাধারা মৃত্যু আমার মনকে ভয়ানকরকম পীড়িত করে ফেলে। আমি একজোড়া অবসর-নিতে-থাকা-পা’র দিকে তাকাই— দেখি যে পা-জোড়া অবসরের সেই শোকাবহ বিয়োগান্তক পদ্ধতিটি আয়ত্ত করে ফেলেছে আর আমি তখন ভাবতে থাকি,- দশ, বিশ, চল্লিশ কিংবা তার চেয়ে আরও বেশি কিছু বছর… এবং হ-ঠা-ৎ একদিন তাদের পরম এবং অন্তিম বিশ্রাম, কিংবা; হয়ত কয়েকটি মিনিট, হয়ত মাত্র একটি ঘণ্টা। মৃত্যু ইতোমধ্যেই তাদের ভিতর ঢুকে পড়েছে। পায়ে জুতাসমেত আমি কখনই ঘুমাতে যাই না, বোধবুদ্ধিহীন লোকেরা দিনের বেলার ঘুমে যেমনটা করে থাকে। আমি পা’র দিকে তাকাই এবং মৃত্যুর অনুভূতিতে ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়।কারো কারো পা’র দিকে — যে-পা গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে বিশ্রাম করছে — তাকালে, ছেলেবেলায় দেখা মরা মানুষের দেহের কথা মনে পড়ে যেত। মরা মানুষের পা’গুলি সবসময়ই এরকম- পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ আর বিশ্রাম করছে তাদের নতুন জুতার ভিতর… মৃত্যুর কারণে, সবকিছুই মৃত্যুর কারণে।

যদি হঠাৎ একদিন, আমি একেবারে বন্ধুহীন হয়ে যাই, আমার বন্ধুদের হারিয়ে ফেলি, যদি আমি ঘৃণা বিদ্রুপ আর ঈর্ষা দ্বারা পরিবৃত্ত হয়ে যাই, তাহলে কোনভাবেই আমি আর কিছুতে জয়ী হতে পারব না।এমনকি আমি লড়াই করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলব। এটা খুবই সামান্য একটা বিষয় অথবা বলা যায়, আমার জন্য এটা আদৌ কোন বিষয় নয়, বিষয়টি আসলে আমার বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কিত, যাদের আমি মাদ্রিদে ফেলে এসেছি এবং যাদেরকে আমি বুয়েন্স আইরেসে পেয়েছি। আমি দৃঢ়ভাবেই জানি, যদি কখনও আমার কোন কাজ নিয়ে হাসিঠাট্টা করা হয়, তাহলে আমার বন্ধুরা খুব দুঃখ পাবে। আমি আমার কোনও কাজের জন্য ভুক্তভোগী হতে চাই না, ভুক্তভোগী হতে চাই আমার বন্ধুদের কারণে। তারা অনেকটাই এরকম, যারা আমাদেরকে বিজয়ী হতে বাধ্য করে ফেলে। আর তাদের শক্তিতে আমিও বারবার জয়ী হতে চাই, কারণ আমি তাদেরকে জীবনে প্রবলভাবে কামনা করি, তাদের ভালবাসা আর বিশ্বাসকে আমি হারাতে চাই না, যা তারা আমাকে উপুর করে ঢেলে দিয়েছে। শিল্পীজনোচিত একটা কথা হল, আমি কখনোই তাদের নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগি না, যারা আমাকে ভালবাসে না কিংবা আদৌ যারা আমাকে চিনে না।

আমার জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা কোনটি? হ্যাঁ, বলছি, এইতো গতকালই অভিজ্ঞতাটা পেলাম।এইতো এই বুয়েন্স আইরেসে, জনৈক নারী নাটকের মঞ্চে আসেন, আসেন আমার সঙ্গে দেখা করতে।বিনম্র,দরিদ্র আর মহিমান্বিত চেহারার এই নারী বাস করেন স্প্যানিশ-বলা এখানকার এই লোকদের কোন একঘরে। সংবাদপত্রমারফত তিনি এখানে আমার আগমন বিষয়ে জানতে পেরেছেন।

আমি কিছুতেই বুঝেউঠতে পারছিলাম না তিনি সত্যিই কী চান। সুতরাং তার সঙ্গে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তিনি আমার সামনে বেশকিছু কাগজ বের করলেন, আর খুব সাবধানে কিছু একটা মুড়িয়ে-রাখা জিনিস খুলতে লাগলেন। তিনি তাকিয়ে থাকলেন আমার চোখের দিকে আর মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার সরল মুখখানিতে, যেন তিনি এই হাসির মধ্য দিয়ে কোনকিছু মনে করবার চেষ্টা করছেন। ‘ফেদেরিকো… কে বুঝতে পেরেছিল… ফেদেরিকো…’ কথা বলতে বলতে তিনি তার হাতের কাগজপত্রের তোড়া থেকে বের করলেন পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া একখানি ফটোগ্রাফ—ছোট্ট একটি শিশুর প্রতিকৃতি। এবং এই প্রতিকৃতিটাই হলো আমার জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা!

‘তুমি তাকে চিনতে পারছ, ফেদেরিকো?’
‘না।’
‘এ হলে তুমি’, যখন এক বছরেরটি ছিলে।’

তোমার জন্মের সময় আমিও ছিলাম। আমি তোমাদের বাড়ির পাশেই থাকতাম। তোমার জন্মের সেই দিনটিতে, আমরা স্বামী-স্ত্রী একটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তইরী হচ্ছিলাম। তোমার মা হঠাৎ অসুস্থ আমরা অবশ্য আর সেই অনুষ্ঠানে যাই নি। তোমার মায়ের পাশে ছিলাম এবং তুমি জন্ম নিলে! তোমার এক বছর বয়সে এই ছবিটি তুলা হয়। এই যে দেখো, ছবির শক্ত কাগজ ছিঁড়ে গেছে। কীভাবে? তোমার ছোট্ট হাতই কাজটা করেছে, যখন ছবিটি একেবারে নতুন ছিল। এটা তুমিই ছিঁড়েছ… ছবির ছেঁড়া অংশটুকু হলো আমার কাছে এক বিস্ময়কর স্মৃতিচিহ্ন।’

এইসব কথাই নারীটি বলেলেন আর আমাকে স্থম্ভিত করে রেখে চলেও গেলেন! আমি চিৎকার করে কাঁদতে চাইলাম— তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে, ছবিটিতে চুম্বন করে আর আমি এই সবকিছুই করতে চাইলাম শক্ত কাগজের ছেঁড়া অংশটির দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে। এইতো আমার প্রথম কাজ।আমি জানতাম না কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ, কিন্তু এটা আমার করা প্রথম কাজ…

এটা দেখেছো? (একটা পোস্টারের দিকে তাকিয়ে), — তুমি কল্পনাও করতে পারবে না– এই যে বিপুল পরিমাণ মুদ্রিত অক্ষরে আমার নামটি লিখিত হয়েছে আর জনসমক্ষে এই যে প্রচার প্রদর্শন, এটা কী পরিমাণ লজ্জার। আমি অনুভব করি, আমার নিজেকে কেবল মনে হয়, আমি যেন উলঙ্গ হয়ে গেছি; কৌতূহলী জনতার ভীরের সামনে! আমি কোনভাবেই আমার নামের প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়াতে পারি না লজ্জায়। থিয়েটার আসলে কী চায়, আমি তার কথাও ভুলে যেতে পারি না। তাই যেন দেখতে পাই, প্রথমবারের মতো, আমি দেখতে পেলাম আমার নাম ব্যবহৃত হচ্ছে, মাদ্রিদে। আমার বন্ধুরা উল্লাশ করছে, তারা ঘোষণা করছে এই কথা যে আমি খুব রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার পথে। কিন্তু এইটা আমার আকাঙ্ক্ষিত ছিল না। আমার নাম নগরীর রাস্তার মোড়ে মোড়ে, যাকে ঘিরে রয়েছে কিছু মানুষের নিঃস্পৃহতা আর কিছু মানুষের প্রচণ্ড ঔৎসুক্য। এই হলো আমার নাম এবং এইখানে তার যথেচ্ছ ব্যবহার; পুর বিশ্ব যে-নামটিকে আঠা দিয়ে সবখানে সেঁটে রেখেছে আর যেই মুহূর্তে নামটি অন্যদের অবশ্যই সুখি করছে, আনন্দিত করছে, আমাকে দিচ্ছে মর্মভেদী যন্ত্রণা। এটা যেন এমন, আমি যেন আমার নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলেছি; যেন দ্বিতীয় কেউ একজন আমার ভিতর থেকে উন্মোচিত হয়ে গেছে! এক শত্রু যেন, প্রাচিরপত্রগুলো থেকে আমারি দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর আমার ভীরুতা দেখে পরিহাস করছে। কিন্তু, হে বন্ধুগণ, আমি যে নিরুপায়।

এমদাদ রহমান

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৯, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার বাদে সোনাপুর গ্রামে।

রাজনীতি ও প্রশাসন-বিষয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা।

কবিতা স্মৃতিকথা, পুরোনো চিঠি আর লেখা গদ্যে এবং অনুবাদে বিপুল আগ্রহ। পাতালভূমি ও অন্যান্য গল্প তাঁর প্রথম বই ।

About S M Tuhin

দেখে আসুন

গল্পগুলো যখন খুলে দেয় বোধের কপাট : শুভ্র আহমেদ

গল্পগুলো যখন খুলে দেয় বোধের কপাট শুভ্র আহমেদ এক গল্পলেখক-গল্প-গল্পপাঠক, এই তিনটিকে যদি স্বতন্ত্র বিন্দু …

একটি কমেন্ট আছে

  1. লেখাটি বেশ ভাল লাগল৷ ভারি সরল গদ্য৷ বক্তব্য নির্মল৷ তাই বোঝা যায় অনুবাদও ভাল৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *