হেডস্যার আতঙ্ক : নেলী আফরিন

হেডস্যার আতঙ্ক

নেলী আফরিন

০১.

‘কী আবদার! ইশকুলে যাবে না, উঁ-হ! রোজ রোজ এক অজুহাত শুনতে একটুও ভালো লাগে না আমার। পিত্তি জ্বলে যায়।’

প্রতিদিনের মতো সকালে উঠেই গজরাতে থাকেন তুতুনের মা। ‘সরকারি ইশকুলে ভর্তি বললেই ভর্তি? আমার বান্ধবীর দেবরের পেছনে কত ধরনা দিয়ে, এতগুলো টাকা খরচা করে তারপর ভর্তি করালাম একটা সরকারি স্কুলে। আর ওনার প্রতিদিন এক বাহানা, ইশকুলে যাব না। মামাবাড়ির আবদার!’

জেলি মাখানো এক টুকরো পাউরুটি তুতুনের মুখে পুরে মা আবার টিপ্পনী কেটে বলেন, ‘নেন, তাড়াতাড়ি খেয়ে আমাকে উদ্ধার করেন।’ তারপর ড্রেস পরাতে মন দেন তুতুনের মা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে তুতুন। আর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝের ওপর। তাতে এতটুকুও মন নরম হলো না তুতুনের মায়ের। বরং আরও জোরে একটা ধমক লাগিয়ে বললেন, ‘এখনও গেলা হয়নি? এ্যাই, একদম চোখ-নাক দিয়ে লেবুর রস ফেলবিনে। তোর বাবা তাহলে গলে একেবারে মোম হয়ে যাবে। ওমনি নাকি সুরে গেয়ে উঠবেন- থাক, ও যখন চাইছে না তখন আজ আর ইশকুলে গিয়ে কাজ নেই। ওসব চলবে না আমার কাছে। ইশকুলে যাবে না, বাড়ি বসে ঘোড়ার ঘাস কাটবে?’

‘ঘাস কাটা! সেটা কিন্তু অনেক কঠিন কাজ বুবু। যেটা তুমিও পারবে না।’ মার পিছন থেকে শান্তস্বরে বলে উঠল পিকলু মামা। ঘাড় ঘুরিয়ে ভাইকে দেখে একেবারে গলে কাদা হয়ে গেলেন তুতুনের মা। ঘাড় বাঁকিয়ে নরম সুরে বললেন, ‘দ্যাখ না ভাই, প্রতিদিন ছেলের এক বায়না, ইশকুলে যাবে না। বাবার আহ্লাদে আহ্লাদে ছেলেটা আমার একেবারে মাথায় উঠে যাচ্ছে। নতুন ইশকুল, অ্যাবসেন্ট থাকলেই হেডস্যার ফোন করে জানতে চাইবেন, ইশকুলে যায়নি কেন? কী বলব তখন? রোজ রোজ এই এক অজুহাত আমার একটুও ভালো লাগে না। তুই একটু বোঝা না ভাই, যেন ইশকুলে যায়।’

গতরাতে এসেছে পিকলু মামা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ নিয়ে যাচ্ছে কানাডায়। তার আগে একমাত্র বোন আর ভাগনের সাথে দেখা করতে এসেছে। মামাকে দেখামাত্র তুতুন দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে থাকে। তুতুনকে কোলে তুলে নিতে নিতে পিকলু মামা বলল, থাক আজ আর তুতুনের ইশকুলে যেতে হবে না। তারচেয়ে বরং আমরা মামা-ভাগনে একটু বেড়িয়ে আসি। বলেই তুতুনকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যায়, মাকে কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে। তুতুনের তখন চোখে পানি আর গালভরা খুশির হাসি।

‘তোর কী খেতে ভালো লাগেরে তুতুন?’

‘ফুচকা আর চটপটি।’ মামা জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে চটপট জবাব দেয় তুতুন।

‘হুম্। কিন্তু ওটাতো এখন পাওয়া যাবে না। বিকেলে। অবশ্য আর একটু পর পাওয়া যাবে। তবে স্কুলের সামনে। যাবি নাকি?’ দুহাতে মামার গলা জড়িয়ে ধরে এদিক-ওদিক মাথা দোলায় তুতুন।

‘তাহলে?’

‘মামা, আইসক্রিম। চকোলেট আইসক্রিম।’

‘আচ্ছা বেশ।’ একটা কনফেকশনারি থেকে চকোলেট আইসক্রিম কিনে ফাঁকা একটা টেবিলে বসল পিকলু মামা তুতুনকে নিয়ে। আইসক্রিমের চকোলেট তুতুনের সারা মুখে হাতে কিছুটা জামায়ও লেগে একাকার। হাত দিয়ে জামা মুছতে মুছতে তুতুন বলল, মা ভীষণ বকবে জামাটা দেখে। এটা ইশকুলের জামা। পিকলু মামা পকেট থেকে টিস্যু বের করে তুতুনের হাত মুখ জামা পরিষ্কার করে দিল।

‘এবার বল দেখি, ইশকুলে যেতে চাস না কেন?’

‘হেডস্যার শুধু মারে, আমার বন্ধুদের।’ তুতুনের নির্ভীক জবাব।

‘তোকেও মারে?’

‘এখনও কোনোদিন মারেনি। আমার বন্ধুদের মারে কেন? আমি ওদের খুব ভালোবাসি।’ প্রতিবাদের সুর তুতুনের কন্ঠে।

‘আচ্ছা, তাহলে এই সমস্যা।’ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পিকলু মামা বলল, ‘তোকে একটা বুদ্ধি দেই’, বলে কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে কী যেন বলল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা বলেছি ঠিকঠাক করতে পারবি তো?’

‘হ্যাঁ, খুব পারব।’ দৃঢ় ও সাহসী ভঙ্গিতে বলল তুতুন।
পরদিন সকালে মাকে অবাক করে দিল তুতুন। কোনোরকম বকাঝকা বা তাড়া দিতে হলো না। তুতুন নিজেই বইখাতা টিফিন গুছিয়ে নিল ব্যাগে। মাকে অবাক করে দিয়ে একা একা টেবিলে বসে দুটো বিস্কুট আর এক কাপ দুধ খেয়ে রেডি হয়ে বসে থাকল স্কুলের জন্যে। তুতুনের মা তো অবাক। ‘ওরে পিকলু, জাদু জানিস নাকি তুই?’ তুতুন ইশকুলে গেল পিকলু মামার সাথে বেশ চনমনে মন নিয়ে।
প্রতিদিনের মতো প্রথমেই ক্লাসে ঢুকলেন ইংরেজি স্যার। ব্ল্যাকবোর্ডের ওপরে ডানদিকে প্রাত্যহিক দিন তারিখ লিখতে গিয়েই তিনি হোঁচট খেলেন। পিছিয়ে এলেন দু’পা। এমনিতেই স্যার খুব রাগী। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরমুখে জানতে চাইলেন, ‘কে করেছে এ কাজ? এতবড় সাহস! টিচারদের অনুমতি ছাড়া ব্ল্যাকবোর্ডের ওপর লেখা!’

ক্লাসের সবাই নিরুত্তর। গর্জে উঠলেন স্যার, ‘জবাব দাও, কে লিখেছে এসব?’ এরপরও সবাই চুপ। স্যার গম্ভীর হয়ে বললেন,‘ সত্যি কথা বলো। তাহলে শাস্তি কম হবে। যে এ কাজ করেছ উঠে এসো টেবিলের কাছে। না হলে অফিস থেকে বেত এনে সবাইকে একসাথে পেটাবো।’ সারা ক্লাসে তখন কেবল ভীত সন্ত্রস্ত কচি কচি নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ। সব নিস্তব্ধতাকে ছাড়িয়ে স্যার এবার চিৎকার করে উঠলেন, ‘এখনও চুপ কেন? উত্তর দাও। কে লিখেছে এসব?’ রেগে আগুন হয়ে গেলেন। দাঁতে দাঁত রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে স্যার বললেন, ‘বলবে না। আচ্ছা, দেখাচ্ছি মজা।’ বলেই স্যার গটগট করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলেন। বেঞ্চ ছেড়ে উঠে এলো তুতুন। কোনো কথা বলল না। মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

‘তুমি লিখেছ এসব? কেন লিখেছ? এইটুকু বয়সে এতবড় সাহস! এত সাহসী ছেলে তো এতক্ষণ কথা বলোনি কেন?’ বলে স্যার ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকালেন। স্যারের সাথে সাথে ক্লাসের সব ছাত্ররা তাকালো। ব্ল্যাকবোর্ডে কাঁচা হাতে বড়ো বড়ো করে লেখা, ‘শিশুদের ওপর মারধর বন্ধ করুন।’ তার নিচে লেখা- ‘শিশুদের ওপর নির্যাতন চলবে না, চলবে না।’

মনে হলো আগুনের কু-লীতে আরও একমুঠো শুকনো ঘাসপাতা ছড়িয়ে দিল যেন কেউ। রাগ আর ধরে রাখতে পারলেন না। তুতুনের হাত ধরে টানতে টানতে সোজা হেডস্যারের রুমে। তারপর সমস্ত ঘটনার বিবরণ করলেন হেডস্যারের সাথে। মেহেদি রাঙানো চাপদাড়িতে হেডস্যারকে দেখলে এমনিতেই প্রচ- ভয় পায় তুতুন।

গম্ভীর মুখে হেডস্যার উঠে এলেন ওর সামনে। মোটা লাঠিটা হাতে নিলেন। গম্ভীরস্বরে বললেন, ‘সত্যি কথা বলবে, কেন লিখেছ এসব, আর কে শিখিয়েছে?’ তুতুনের গলার কাছে সব ভয় আর কান্না চাপ হয়ে জমাট বেঁধে রয়েছে। কথা বেরুচ্ছে না মুখ থেকে। হেডস্যার হাতের লাঠিটা দিয়ে সজোরে একটা আঘাত করলেন। রক্ষে, সেটা তুতুনের পিঠে পড়েনি; পড়েছে শক্ত কাঠের টেবিলের ওপর। সেইসাথে হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘চুপ করে আছো কেন? উত্তর দাও।’

ভয়ে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল তুতুনের সারা শরীর। বারবার বলতে গেল, ‘এসবের আমি কিছুই বুঝিনে, কোনোকিছুই জানিনে। পিকলু মামা আমাকে সব শিখিয়ে দিয়েছে।’ কিন্তু গলার কাছে জমাটবাঁধা সেই ভয় আর কান্নাটা যেন আরও শক্ত হয়ে দলা পাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরছে ওর নরম কচি গলা। বুকের ভেতর ধুকধুক করছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। হেডস্যারের আবার হুঙ্কার, ‘হাত পাতো। ডান হাত পাতো। বাড়ি গিয়ে যেন ভাত খেতে না হয়।’ তুতুন ওর ছোট্ট কচি হাতটা মেলে ধরল সামনে। হেডস্যারের লাঠিটা সপাং করে এসে পড়ল তুতুনের হাতে। ওর এই বয়সে এত জোরে আঘাত আগে কখনও পায়নি। মনে হলো হেডস্যারের লাঠির আঘাত শুধু ওইটুকু হাতের মধ্যে নয় সারা শরীরকে ছাপিয়ে গেল। প্রচ- ভয় আর ব্যথায় যেমন চমকে লাফিয়ে উঠল, সাথে সাথে হাতটা কোলের মধ্যে টেনে নিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল তুতুন।
ওটাই ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা।

বাসায় ফিরেই তুতুন খুঁজল পিকলু মামাকে। কোথাও নেই। ওকে না বলেই চলে গেছে। রাগে অভিমানে আর কষ্টে মাকেও কিচ্ছু বলল না। মনে মনে এটাই বুঝল- বড়রা খুব খারাপ। কেউ ভালো না। আমাদের ছোটোদের নিয়ে মজা করতে সবাই ভালোবাসে। আমরাও যে একটা মানুষ, আমাদেরও যে কষ্ট হয় এটা বড়োরা বুঝতে চায় না। ওরা শুধু ভাবে তোমরা ছোটোমানুষ। আমরা যেভাবে বলব সেভাবে চলবে।
সেদিনের পর থেকে তুতুন আর কোনোদিন ‘স্কুলে যাব না’ এ বায়না ধরেনি। বরং নিজেই ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত স্কুলভ্যানের জন্যে। হঠাৎ করেই যেন বড়ো হয়ে গেল তুতুন। মাস কয়েক পর হেডস্যার অবসরে গেলেন। আর হেডস্যারের মুখোমুখি হতে হয়নি কোনোদিন।
এরমধ্যে পার হয়েছে অনেকগুলো বছর। তুতুনের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হয়েছে। মার ইচ্ছে তুতুন মামার মতো দেশের বাইরে যাবে। আর বাবার ইচ্ছে যা করার দেশের মধ্যে থেকেই করবে। আর তুতুনের ইচ্ছে তার গিটার, গান আর লেখালেখি নিয়ে থাকবে। সেটা দেশেই হোক বা বিদেশে। এখন দেখা যাক ভাগ্য তুতুনকে কোনদিকে নিয়ে যায়। হঠাৎ একদিন তুতুনের বন্ধু আরাফ ফোন করে জানাল, ‘আমাদের ইশকুলের হেডস্যার আব্দুল হাই-র কথা মনে আছে তুতুন? উনি খুব অসুস্থ। দুদিন হাসপাতালে। একদিন দেখতে যাবি?’
সাথে সাথে তুতুনের মনে পড়ে গেল স্যারের সেই মারের কথা। কষ্টটা আজও ভোলেনি। একবার মনে হলো বলে দেবে- ‘যাব না’। আবার মনে হলো এটাই সুযোগ, এরপর হয়তো আর সময় হবে না। স্যারকে সেদিন যেটা বলতে পারিনি আজ সেটা বলবে। দোষটা ওর ছিল না, ছিল পিকলু মামার। আর পিকলু মামা? তারপর থেকে এখনও দেশে ফেরেনি। পড়াশোনার পাশাপাশি একটা চাকরি করছে। দেশে ফিরলে তুতুন নিজে দেখা করে বলবে ছোটোদের দুষ্টু বুদ্ধি শিখিয়ে চোরের মতো গা ঢাকা দিতে নেই। ওটা একধরনের কপটতা। আরাফকে বলল,‘একদিন না। আজ যাব, এখনই।’

‘এখন!’

‘হ্যাঁ।’ অসুস্থ মানুষকে কখনও দেরি করে দেখতে যেতে নেই। এটা আমার মা সবসময় বলেন।

‘কিন্তু এখন তো আমাদের গিটারের ক্লাস।’

‘একদিন ক্লাসে না গেলে কিচ্ছু হবে না।’

০২.

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন হেডস্যার। চোখদুটো বন্ধ। একহাতে স্যালাইন আর একহাতে রক্তের ব্যাগ ঝুলছে। কোথায় সেই গম্ভীর মেজাজ আর কোথায় তার ভারিক্কি চেহারা। লম্বা চওড়া মানুষটা বিছানার সাথে একদম মিশে গেছে। মনে হচ্ছে এ বিরাট পৃথিবীতে তার কোথাও কেউ নেই। স্যারের এ অবস্থা দেখে নিজের ভেতরের জমে থাকা এতদিনের সব রাগ অভিমান কষ্টের কথা ভুলে গেল মুহূর্তের মধ্যে।

স্যারের পায়ের ওপর একটা হাত রাখে তুতুন। একজন নার্সের সাথে কথা বলে শুনছিল স্যারের শারীরিক সমস্যার কথা।‘অতো দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন সাফিন? কাছে আয়।’ হেডস্যারের ক্ষীণ কন্ঠে অবাক হয়ে ফিরে তাকায় তুতুন। আরও অবাক হয় এত বছর পরও স্যার ওকে চিনতে পেরেছেন? তাও এই শরীরে। স্কুলের রেজিস্ট্রারে লেখা নাম ধরে ডাকছেন শুনে আরও বিস্মিত হয়। এগিয়ে এসে স্যারের স্যালাইন পরানো চিকন হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল তুতুন, ‘স্যার, আপনি আমাকে …’

‘তোকে কী ভোলা যায় রে?’ তুতুনের কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, ‘আমার মন বলছিল আমার অসুস্থতার কথা শুনে তুই ঠিকই আসবি। সে বিশ্বাস আমার আছে। চমৎকার লিখিস তুই। তোর কলমে ধার আছে। পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিনে তোর লেখা পেলেই আমি পড়ি। ওটা ছাড়িসনে ধরে রাখিস। এতেই তুই একদিন নাম করবি। সেদিনের ছোট্ট সাফিনের সাহস দেখেই আমি বুঝেছিলাম, তোকে দিয়ে হবে। ছোটোবেলায় তোদের অনেক মেরেছি। এজন্যে নিজেই এখন কষ্ট পাই। বাচ্চাদের মারধর বকাঝকা করলে তাদের ভালোবাসা পাওয়া যায় না। সেটা এতবছর পর এখন বুঝেছি। সত্যিই ভুল করেছি। এ জন্যেই হয়তো সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর কোনোদিন আমি কাউকে মারব না।’ কথাগুলো টেনে টেনে আবার উচ্চারণ করলেন স্যার, ‘আর কোনোদিন তোদের কাউকে আমি মারব না।’ বলতে বলতে স্যার চোখদুটো বন্ধ করলেন। চোখের কোণটা ভিজে উঠল।

‘স্যার, ওসব কথা এখন থাক। আপনিই তো আমার ভেতরের বোধটাকে জাগিয়ে তুললেন।’ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠোঁটে আঙুল দিয়ে একজন নার্স থামিয়ে দিল তুতুনকে। অন্যদিকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘ওনার অবস্থা বেশ খারাপ। কাল সারারাত ভুল বকেছেন আর ছেলেদের নাম ধরে ডেকেছেন। কিন্তু মোবাইলে বা হোয়াটসঅ্যাপে কোনো কথা বলেননি। দুই ছেলেই দেশের বাইরে। সম্ভবত ওনার অনিচ্ছাতে। এটা তাঁর কথাতেই মনে হয়েছে। শেষের এ কয়টা দিন আপনারা একটু সময় দেবেন।’

তুতুনের গোছানো কথাগুলো কিছুই বলা হলো না। বরং মনে হলো খুব ভুল হয়ে গেছে। আসার সময় স্যারের জন্যে একগোছা ফুল আনা উচিত ছিল। আগামীকাল আসার সময় নিয়ে আসব।

পরদিন সকাল সকাল একতোড়া ফুল নিয়ে হাসপাতালে চলে এলো তুতুন। আরাফের টিউটরিয়াল পরীক্ষা। তাই ও আসতে পারেনি। তুতুন একাই এসেছে। স্যারের বেডটা খালি। তুতুনের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। দুজন হাসপাতালকর্মী বেড পরিষ্কারে ব্যস্ত। তাহলে কী স্যারকে অন্য কেবিনে নেওয়া হয়েছে? কর্মীদের কাছে জিজ্ঞেস করল সে, ‘এই বেডের রোগী কোথায়?’ কর্মী দুজন বললেন, ‘উনি তো কাল রাতে মারা গেছেন।’

হাসপাতালের সামনে খোলা চত্বরে এসে দাঁড়ালো তুতুন। হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকালো, কেন যে গতকাল একবার মনে হলো না! দুঃখে-কষ্টে কাতর হয়ে পড়ে সে।

‘অতো চিন্তা করছিস কেন সাফিন? ফুলগুলো না হয় আমার কবরের ওপর দিস।’ স্যারের কণ্ঠ স্পষ্ট কানে ভেসে এলো তুতুনের। হেডস্যারের সেই রাশভারী চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। গতকাল তাঁর শেষ কথাগুলো মনে হলো তুতুনের, ‘আর কোনোদিন আমি কাউকে মারব নারে…, মারব না…।’ বিড়বিড় করে তুতুন বলল, ‘স্যার আপনি কোনো ভুল করেননি। কারণ সেই ছোট্টবেলায় মার খাওয়ার পরই তো আমি সত্যিকার বড়ো হলাম।’ ‘ইশকুলে যাব না’- এটা আমার কোনো স্বাভাবিক বায়না ছিল না। স্কুলেই তো রয়েছে আমাদের শিক্ষার শেকড়। স্কুল ছাড়া কেউ কোনোদিন লেখাপড়া শিখতে পারে? নাকি পেরেছে! এখান থেকেই তো জীবনের পথচলা শুরু। তারপরই না উঠব আমরা সাফল্যের শিখরে। একটা শিশুর পাঠ্যশিক্ষার পাশাপাশি তার নৈতিকশিক্ষা, মেধা ও প্রতিভা বিকাশের জন্য, এমনকি একজন সামাজিক মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার জন্যও স্কুলের বড়ো প্রয়োজন। স্কুলে না গেলে একটা বাচ্চা কীভাবে জানবে ডিসিপ্লিন কী? নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, রোদে দাঁড়িয়ে শরীরচর্চা করা, ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষকের কথা শোনা, পড়ালেখা করা, টিফিনে সবার সাথে মিলেমিশে টিফিন খাওয়া, খেলাধুলা করা- এসবই তো স্কুলের শিক্ষা। সুশিক্ষার সাথে সাথে তাকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে তোলে সামাজিক ও মানসিকভাবে। গড়ে তোলে একজন সত্যিকার মানুষ।

আজ নতুন করে তুতুনের মনে হলো বড়োরা আসলে সবসময় ছোটোদের ভালই চায়। তবে অনেক সময়ই তারা সেটা বুঝতে ভুল করে। যেমনটা ঘটেছে তার বেলায়। ইশকুলে যাব না- এরকম উদ্ভট বায়না না ধরলে তো কেউ তার সাথে এমন আচরণ করত না। বড্ড ভুলের মধ্যে ছিল ও। এতদিন পর ওর ভেতরের ভুলটা ভেঙে গেল। জন্ম নিল আর এক নতুন তুতুন।

* শিক্ষিকা ও ফ্রিল্যান্স রিপোর্টার। শিশু-কিশোরদের উপযোগী গল্প লেখেন।

This image has an empty alt attribute; its file name is 23579pppp-Copy.jpg

About S M Tuhin

দেখে আসুন

আব্বাস আলী আকন্দের একদিন : রোকেয়া ইসলাম

আব্বাস আলী আকন্দের একদিন রোকেয়া ইসলাম লেগুনা থেকে নেমে সোজা প্রিন্স হোটেলে ঢুকে ক্যাশ কাউন্টারে …

একটি কমেন্ট আছে

  1. Opurbo chalia jao

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *