নতুন পোস্ট

মাটির হাঁড়ি : আহমেদ সাব্বির

মাটির হাঁড়ি

আহমেদ সাব্বির

মোকাম আলী খান হান্ড্রেড পার্সেন্ট ভদ্রলোক। কাদার মতো নরম মানুষ। কথা বলেন কম। উঁচুপদে চাকুরি করলেও তার গলার স্বর সবসময় নিচু। স্ত্রী ভক্তিতে তিনি অতুলনীয়। মিসেস খান গুলতেকিন । রূপসী, রুচিশীল। হৈচৈ ভালবাসেন। স্বামীর প্রতি ডেয়ারিং এন্ড কেয়ারিং। দু’জনের দাম্পত্যের সমুদ্রে মাঝেমধ্যে ঝড় ওঠে। আবার থেমেও যায়। ঝড়ের সময় খান সাহেব আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে টয়লেটকেই বেছে নেন। সেই ঝড়ে অনেক সময় ক্ষয়-ক্ষতিও হয়। যেমন স্ত্রীর মান ভাঙাতে দামী উপহার কিনে আনা, শপিং অথবা বেড়াতে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি।খান সাহেবও ক্ষতি পূরণে বেশ তড়িৎকর্মা।

দেশ এখন কঠোর লকডাউনে। রাস্তাঘাট, হাট-বাজার সেই ষাটের দশকের মতো নিরিবিলি। অফিস আদালত বন্ধ। বিনা প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া বারণ।

খান সাহেব নাস্তা সেরে বসে আছেন টিভিরুমে। লকডাউন লাইভ দেখছেন তিনি। মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবে মনটা ভারাক্রান্ত । আগামী সাত দিন তাকে অফিসে যেতে হবে না। সাত দিনের বাজার তিনি আগেই সেরে রেখেছেন। দুইটা ফ্রিজ মাছ মাংসে ঠাসাঠাসি। স্ত্রীর জন্য তিন লিটার আইসক্রিমও কিনে রেখেছেন।

স্বামী বাসায় থাকায় মিসেস খান বেশ ফুরফুরে আজ। দুপুরে কি রান্না হবে সেটা নিয়ে ভাবছেন। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন গরুর পায়া খাবেন। গরুর পায়া আর শাদা ভাত খান সাহেবের ভিষণ পছন্দ। নিজ হাতে আদর করে তিনি স্বামীকে খাওয়াবেন। গরুর পায়া ফ্রিজে মজুদ আছে। কিন্তু তার শখ রান্না হবে মাটির হাঁড়িতে। মাটির হাঁড়িতে রান্নার স্বাদ অপূর্ব। ইউটিউবে দেখেছন।

মোকাম আলী সোফায় কাত হয়ে সংবাদ লাইভ দেখছিলেন। রাস্তাঘাট সাহারা মরুভূমির মতো জনমানবহীন। সেনা বাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট রাস্তায় টহল দিচ্ছে। সন্দেহজনক কাওকে পেলেই পাকড়াও। মিসেস খান টিভিরুমে এসে বললেন- আজ তোমার জন্য একটা সার প্রাইজ আছে। খান সাহেব টিভির পর্দা থেকে স্ত্রীর ডিসপ্লেতে চোখ রাখলেন। জানতে চাইলেন কি সারপ্রাইজ। মিসেস খান বললেন-একটু বাজারে যাও লক্ষ্মী। একটা মাটির হাঁড়ি কিনে আনো। স্ত্রীর কথা শুনে খান সাহেব শক্ত হয়ে গেলেন। বললেন- এই কঠোরতার মধ্যে বাইরে যাওয়া অসম্ভব। দেখছ না টিভিতে। স্ত্রী বললেন- কোন সমস্যা নাই। তুমি যাবে বাজারে । থলে নিয়ে। এটা বৈধ। তোমাকে কেউ আটকালে তোমার পরিচয় দেবে। বলবে তুমি বরগুনার ওসি মামুনের দুলাভাই। দ্রুত তৈরি হয়ে নাও। আমি থলে দিচ্ছি।

স্ত্রীর আদেশ। সুবোধ বালকের মতো প্যান্ট পরে ফেললেন তিনি। আষাঢ়ের আকাশের মতো মুখ করে থলে হাতে বেরিয়ে গেলেন। ব্যালকনি থেকে স্ত্রী চেঁচিয়ে বললেন- মটির হাঁড়িতে চাটি মেরে বাজিয়ে নেবে। ফাটা যেন না হয়। খান সাহেব মাথা নাড়লেন।

রাস্তায় লোকজন নাই। ধূ ধূ করছে। রিকশা, সিএনজি কিছুই চলছে না। খান সাহেব হাঁটতে হাঁটতে এগোতে থাকলেন। টহলরত কাউকেই দেখেলেন না। কয়েকটি বাঁশের বেরিকেট পার হয়ে তিনি বাজারের কাছাকাছি চলে এলেন। কিন্তু মাটির হাঁড়ি কোথায় পাওয়া যায় তিনি জানেন না। একটা মোড় ঘুরতেই পুলিশের বাধার মুখে পড়লেন। খান সাহেব কে থামতে হল। টহলরত সদস্যরা তাকে ঘিরে ধরল। কোথায় যান? দারোগা সাহেব জানতে চাইলেন। খান সাহেব বললেন- বাজরে। ব্যাগ কই? তিনি প্যান্টের পকেটে ভাঁজকরা কাপড়ের থলে বের করে দেখালেন।

দারোগা বললেন- বাজারের ফর্দ দেখান। খান সাহেব ঢোক গিললেন। বললেন- ফর্দ নাই। মাটির হাঁড়ি কিনতে যাই।

হোয়াট! মাটির হাঁড়ি? কি করেন আপনি? চাকুরি করি। বাস্তবতা বোঝেন? দেশের পরিস্থিতি কি জানেন? জ্বি জানি। আমার স্ত্রীও জানেন। তাহলে? হাঁড়ি কিনতে যাওয়ায় কোন নিষেধাজ্ঞা নাই। পরিপত্রে পড়েছি। কিন্তু আপনি যে সত্যিই বাজারে যাচ্ছেন তার প্রমাণ কি? প্রমাণ দিতে হবে। নইলে জরিমানা পাঁচশ টাকা।

খান সাহেব সাক্ষ্য প্রমাণের ঝামেলায় যেতে চাইলেন না। কথা না বাড়িয়ে জরিমানা দিতে রাজী হয়ে গেলেন। বললেন- আমি ‍জরিমানা দিচ্ছি। আমাকে ছেড়ে দেন। তিনি ব্যাক পকেটে হাত দিলেন। মানিব্যাগ বের করতে। কিন্তু কী সর্বনাশ! মানিব্যাগ নাই। বাসায় ফেলে এসেছেন। বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল। তিনি বললেন- আমি দুঃখিত। মানিব্যাগ বাসায় ফেলে এসেছি। খান সাহেবের কথা শুনে পাশের এক কনস্টেবল বলল- স্যার এই লোক মিথ্যা কথা বলছে। গাড়িতে উঠাই ? দারোগা বললেন- না। ভদ্রলোক মানুষ। আমি দেখছি।

খান সাহেব ভাবলেন তার শ্যালক বরগুনা থানার ‍ওসি সেটা দারোগাকে বলবেন। মামুনের পরিচয় দিলে হয়তো কিছুটা সদয় হবেন। কিন্তু তিনি সংকোচবোধ করলেন। শুধু বললেন- দেখুন আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। আপনাদের বিকাশ নম্বর দেন। আমি পাঁচশ টাকা বিকাশ পেমেন্ট দিচ্ছি। দারোগা শুনে হেসে ফেললেন। বললেন- আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন। দেখি কি করা যায়। তারপর ওয়ারলেসে ওভার! ওভার! করতে করতে কোথায় যেন ছুটে গেলেন।

খান সাহেব বসে আছেন রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে। দোকান বন্ধ। দোকানের চালে কয়েকটি কাক জটলা করছে।পাশের নর্দমা থেকে দুর্গন্ধ আসছে।পুলিশ সদস্যরা তার দিকে কৌতুক চোখে তাকিয়ে আছে। তিনি ঠিক করলেন আজ আর বাসায় ফিরবেন না। এরেস্ট হয়ে পুলিশের সাথে থানায় যাবেন। সাংবাদিকরা তার ছবি তুলবে। টিভিতে লাইভ সম্পচার করবে। পরদিন পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হবে। তাতে করে গুলতেকিনের একটা শিক্ষা হবে।

কিছুক্ষনের মধ্যে দারোগা সাহেব ফিরে এলেন। পাশের এক গলিতে সার্চ করতে গিয়েছিলেন । খান সাহেবকে কাছে ডেকে বললেন আমার বইকে ওঠেন। চলেন একটু থানায় যেতে হবে। খান সাহেব ভয়ে কাটকাট হয়ে গেলেন।

দারোগা সাহেবের বাইক ছুটছে। খান সাহেব শক্ত হয়ে বসে আছেন পিছনের সিটে। যেতে যেতে বড় বাজারের সীমানা পার হয়ে থামলেন। দারোগা বললেন- নামেন আপনি। এটাই কুমোর পট্টি। ওই দোকানে ভাল মাটির হাঁড়ি পাবেন। নিয়ে আসুন।

খান সাহেব রোবট হয়ে গেছেন। তাও আবার ব্যাটারি শুন্য রোবট। কোন কথা বলতে পারছেন না। বাইক থেকে নেমে দাঁড়াতেই দারোগা সাহেব তার মানিব্যাগ থেকে একশ টাকার একটা নোট বের করে খান সাহেবের হাতে দিলেন। বললেন- মানিব্যাগ ফেলে এসেছেন বাসায়। হাঁড়ি কিনবেন কি দিয়ে? হাঁড়ি কিনে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যান।

খান সহেব এবার একটু স্বাভাবিক হলেন। তার ইমিউনিটি বেড়ে গেছে। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে হাসলেন। তার মনে হল, এইমাত্র ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে বেঁচে গেছে। বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, ধন্যবাদ।

দারোগা সুলতান মাহমুদ বাইক স্টার্ট দিয়ে বললেন- গুলতেকিন আমার বন্ধু। আমরা একই কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। ওকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন।

মোকাম আলী খান মাটির হাঁড়ি কিনতে উদ্যত হলেন।

This image has an empty alt attribute; its file name is 23579pppp-Copy.jpg

আহমেদ সাব্বির

About S M Tuhin

দেখে আসুন

গল্প । যতিচিহ্নের খোঁজে : মোস্তফা তারিকুল আহসান

গল্প যতিচিহ্নের খোঁজে মোস্তফা তারিকুল আহসান মেয়েটা তার বাম ভ্রু খানিকটা কাঁপিয়ে চোখটা বাইরে আকাশের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *