নতুন পোস্ট

ইন্দ্রজিৎ : মৌলীনাথ গোস্বামী

গল্প

ইন্দ্রজিৎ

This image has an empty alt attribute; its file name is MOULINATH-G.jpg

মৌলীনাথ গোস্বামী

কখন লিখব! সময় কোথায়!- হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে ভাবে ইন্দ্রজিৎ। দুরন্ত গতির ভাঙাচোরা জীবন, যাপনের পায়ে পায়ে হাহাকারের মত বেজে ওঠে…

প্রতিদিন সকাল আটটায়, পাশের পাড়ার চারতলা ফ্ল্যাটের নৈশপ্রহরীর অতন্দ্র উর্দির খোলস থেকে বেরিয়ে, সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরে এসে, নাকেমুখে কোনমতে কিছু গুঁজেই আবার ছুটতে হয় তাকে। গন্তব্য ছাপাখানা। সাড়ে ন’টায় হাজিরা। গ্র্যাজুয়েট ইন্দ্রজিৎ সেখানে সারাদিন অক্ষর আর শব্দ নিয়ে খেলে। কখনও সে কম্পোজ়িটর। কখনও প্রুফরিডার। আবার প্রয়োজনে মেশিনম্যানও। এতদিনের অর্জিত শিক্ষা কাজে লাগিয়ে পেটের ভাত জোগাড় করার ব্যস্ততা। বাধ্যবাধকতা।খাটাখাটনির চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি, উপার্জন বাড়ন্ত। রাবণীয় অভাবের সঙ্গে যুঝতে, প্রেস-মালিক নামক আর এক রাবণের শোষণের সঙ্গে আপস করে, সারাদিন ঘাড় গুঁজে অক্ষর আর শব্দ ঘেঁটে চলে সে… লোহা আর সীসার ছোট বড় ধাতব শীতল অক্ষর। লেটারপ্রেসের ভ্যাপসা খুপরি, এক আবছায়া ঘরে ক্ষয়ে যাওয়া অসংখ্য কাঠের ব্লক, পরিত্যক্ত ফর্মা, রঙিন কালির খালি ডিব্বা, ভাঙা রোলার, দানবের মতো এক ছাপাই মেশিন আর অগুনতি কালিমাখা কাগজের আবর্জনার স্তূপীকৃত মেঘের অন্তরালে, একটানা বসে, অখ্যাত সাহিত্যিকের স্বপ্নপূরণ করে সে। গল্পকার হওয়ার স্বপ্ন। কবি হওয়ার স্বপ্ন। আনকোরা নতুন কাগজের সুবাসিত বুকে, ছাপার অক্ষরে নিজেদের সৃষ্টিকে দেখতে পাওয়ার স্বপ্ন।

ইন্দ্রজিতের হাতেই সব রচনার রূপান্তর ঘটে। যন্ত্রের মতো ফন্টের কেস থেকে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ আর যতিচিহ্ন তুলে নিয়ে, এক ঠায় শব্দের মালা সাজায় সে। হাতের লেখার থেকে ছাপার লেখায় ধীরে ধীরে বদলে যায় কোন তরুণ কবির কবিতা, অথবা কোন অনামী গল্পকারের গল্প। কোমরে খিল ধরে, চোখে চাপ পড়ে, তবু কাজটা ভালো লাগে। খুব যত্ন নিয়ে করে সে। যেন নিজেরই লেখা। টাইপ সাজাতে সাজাতে একটার পর একটা পাণ্ডুলিপি পড়ে। বিশেষ করে কবিতার। মন দিয়ে পড়ে। পড়তে পড়তে ডুবে যায়। মুগ্ধ হয়… কারণ সে নিজে কবিতা লিখতে বড় ভালোবাসে। লেখার চেষ্টা করে আর স্বপ্ন দেখে-

তার নিজের লেখা কবিতার বই হবে… একদিন সে-ও কবি হবে…

আর তাই, আঙুল যখন অন্য লোকের কবিতা সাজাতে ব্যস্ত, ওর মন নিজের একান্তে নিঃশব্দে সাজিয়ে চলে নিজস্ব কবিতা। মনের ফর্মায় ইন্দ্রজিৎ সারাক্ষণ বুনে চলে নিজের সৃষ্টি, নিজের কবিতা। সে যে কবি হতে চায়। নীরেন্দ্রনাথের মতো ঋজু অথচ কোমল কবি। অথবা জয় গোস্বামীর মতো অবাক ছন্দময়। তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাড়া করে তাকে। সবসময়। নিজের ভেতরে ঘুণপোকার মতো একটানা কুরকুর কুরকুর করে চলে। যখন রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে প্রেসে যায় অথবা বাড়ি ফেরে অথবা যখন ফ্ল্যাটবাড়ির পায়রার খোপে নিঝুম রাত নেমে আসে, তখন সিঁড়ির তলায় শুয়ে ইন্দ্রজিতের মনের ভাবনার গভীরে, কুয়াশার মতো পাক খায় শব্দেরা… নিরাকার ধুম্রজাল ভেদ করে কখনও কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠে আসে দু’-চারটে মনের মতো লাইন। ছটফট করে ওঠে ইন্দ্রজিৎ। হয়ত তখন হাতের কাছে কলম বা কাগজ থাকে না। মনে রাখার মরিয়া চেষ্টা করে। থাকেও। কিন্তু প্রেসের কাজের ফাঁকহীন ব্যস্ততার মাঝে, লিখে রাখা হয় না লাইনগুলো। নিজের ভেতরে ঘুরপাক খেতে খেতে সেগুলো একদিন মিলিয়ে যায়। হতাশা গ্রাস করে ওকে। ওর নিজের ভেতরে কে যেন ক্রমাগত চিৎকার করে বলতে থাকে–

হচ্ছে না! হচ্ছে না! এভাবে হয় না!

প্রতিনিয়ত দানাবাঁধা ভাবনাগুলোকে জারাতে না পারার আক্ষেপ, না লিখতে পারার খেদ ওকে নিরন্তর পীড়া দেয়। একটু, অ-নে-ক-টা সময় যদি পাওয়া যেত, তাহলে হৃদয় উজাড় করে কবিতা লিখতে পারতো– ভাবে ইন্দ্রজিৎ…

কোন কোনদিন সুযোগ এসে যায়। প্রেসে বসে, আগের দিনের বা রাতের মনে করে রাখা লাইনগুলো লিখে রাখে, হাতের কাছেই পেয়ে যাওয়া কালিমাখা কোন চিলতে কাগজের সাদা পিঠে। ভাবে, বাড়ি ফিরে লেখাটা শেষ করবে। কিন্তু বিধি ক্ষুধার্ত। পেটে জ্বলন্ত আগুনের কঠিন গদ্য ওকে আর সেই নিঃসঙ্গ লেখাটার কাছে ফেরার সুযোগ দেয় না। যদি বা দেয়, কিন্তু ততদিনে কাগজের টুকরোটা কোথায় হারিয়ে যায়… তন্নতন্ন করে খুঁজেও আর পায় না। কোথায় রেখেছিল মনেও পড়ে না। নিজের মাথা ঠুকতে মন চায়। ব্যর্থতার বিষণ্নতা ঘিরে থাকে তাকে। একটা আনমনা ভাব। একটা কষ্ট। লিখতে না পারার যন্ত্রণা। মনের একান্ত অভিলাষ বাস্তবে রূপায়িত করতে না পারার গ্লানি। কবি হতে না পারার দুঃখ। যদিও একা, তবু অভাবের সংসারে সেই দুঃখটা ঠিক করে অনুভব করারও সময় পায় না ইন্দ্রজিৎ। ফ্ল্যাটবাড়ির সিঁড়ির তলায় পাতা অবসন্ন বিছানায় জেগে বসে ভাবে ইন্দ্রজিৎ–

কোনদিন কি পারবে সে কবি হতে! মনের মতন কবিতা লিখতে!

দীর্ঘশ্বাস পড়ে…

রোজ সন্ধে ছ’টা বেজে যায় ছাপাখানার কয়েদ থেকে মুক্তি পেয়ে বেরুতে বেরুতে। পথে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস গরম চা আর একটা খাস্তা বিস্কুট। তারপর অনেকটা পথ সাইকেল চালিয়ে অবশেষে বাড়ি। হাত-পা ধুয়েই স্টোভ জ্বালিয়ে ভাতে-ভাত ফুটিয়ে নেওয়া। সঙ্গে একটু আলু, একটা ডিম। একার জন্য এর বেশি করতে ইচ্ছে হয় না। তবু ডাল রাঁধে মাঝে মধ্যে। তবে ফোড়ন দেওয়ার বড় হ্যাপা। তাই ওটা হয় কম। কোনরকমে গিলেই আবার দৌড়তে হয় নাইটগার্ডের অভিনয় করতে। আধো ঘুমে জাগরণে রাত কাবার করে, বাড়ির বুড়ি ছুঁয়েই আবার সাড়ে ন’টায় প্রেসে। ছুটি বলে কিছু নেই। রবিবার যদিও ঘোষিতভাবে প্রেস বন্ধ থাকে, তবু প্রায় রবিবারই সকালের দিকে প্রেসে যায় সে। যাওয়া মানেই উপরি আমদানি। এমনিতেই কতটুকু আর মাইনে পায় সে! বাজারদরের ঊর্ধমুখী দৌড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে, রবিবারের এই দৌড়টুকু না করলেই নয়। টানটান রোজনামচায় সময়ের বড় অভাব, কারণ তার অর্থেরও যে বড় অভাব।

রবিবার প্রেসে হাজিরা দেওয়ার আরও একটা কারণ অবশ্য আছে। ‘কাব্যিক’ কবিতা গোষ্ঠী। ইন্দ্রজিৎ তাদের সদস্য। সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত বেশ পুরোনো সংগঠন। নিয়মিত পত্রিকা বেরয় প্রতি মাসে। কবিতা-কেন্দ্রিক নানাবিধ অনুষ্ঠান করে তারা… সেমিনার, সাহিত্য বাসর, কবিতামেলা, কবিতা পাঠের আসর… এই টানেই এদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। প্রেসের কাছেই একটা ভাড়া ঘরে, খ্যাতনামা কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনাচক্র করে ওরা… রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শঙ্খ ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ… এঁদের লেখা পাঠ হয়। ইন্দ্রজিৎ সেইসব শোনে আর রোমাঞ্চিত হয়। কী সব লেখা! আহা! এমন এক লাইনও যদি লিখতে পারত সে- ভাবে ইন্দ্রজিৎ। গায়ে কাঁটা দেয়। এছাড়াও ‘কাব্যিক’ আয়োজিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে বা কবিতামেলায় কত মানুষ কবিতা পড়তে আসে! নামী, অনামী, তরুণ, বৃদ্ধ। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে ডায়রির পাতা থেকে নিজেদের লেখা কবিতা পড়ে। ওদের শুনতে শুনতে ইন্দ্রজিতেরও সাধ জাগে। কল্পনা করে, সে-ও একদিন স্টেজে উঠে কবিতা পড়ছে… সবাই শুনছে মগ্ন হয়ে… তারিফ করছে… তারও কবিতা ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকায়… হয়ত বা কোন নামী কবির সাথে একই সংখ্যায়! ঘোর কেটে গেলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু হাতে আসে না।

আসার কথাও নয়। কারণ, গোষ্ঠীর সাথে ইন্দ্রজিতের সম্পর্ক মোটেও কাব্যিক নয়। বরং দস্তুরমত শোষণের। কাব্যিকের যারা কর্ণধার তারা মূলত টেবিলের কাজ সারেন। এতে কায়িক পরিশ্রম কম। কিন্তু বাইরে ছোটাছুটির যাবতীয় ধন্যবাদহীন কাজ, সবটাই করতে হয় ইন্দ্রজিৎকে… যেমন, কোন ব্যস্ত কবির বাড়ি থেকে লেখা নিয়ে আসা, অথবা প্রেসে লেখা ছাপতে দিতে যাওয়া, প্রুফ নিয়ে আসা, অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্র অথবা পত্রিকার সৌজন্য-সংখ্যা বিভিন্ন লেখকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া… এমন নানারকম কাজ ইন্দ্রজিৎকে নিজের গ্যাঁটের কড়ি খরচ করেই করতে হয়। সে এতটাই মুখচোরা যে মুখফুটে গোষ্ঠীর রথী-মহারথীদের কিছু বলতেও পারে না। এমন নয় যে অন্য সদস্যরা কেউই এইসব কাজ করতে পারবেন না, কিন্তু করেন না। কারণ ইন্দ্রজিৎ আছে যে। ও যেন একটা ফালতু মানুষ! ফালতুই তো… কারণ, ও যে অন্য সব সদস্যদের মত ভালো চাকরি করে না। ভালো উপার্জন করে না। তাই ওকে দিয়ে সহজেই খিদমত খাটানো যায়। খাটানো হয়। এতে অবশ্য খেদ নেই ওর। কবিতার খাতিরে এইটুকু সইতে নিঃশর্তে রাজি আছে সে। প্রেস থেকে, কোনদিন আধবেলা কোনদিন সারাবেলা ছুটি নিয়ে, এইসব ছোটাছুটি করে। আর তাই সপ্তাহের ছুটি পুষিয়ে দিতে রবিবার প্রেসে যেতে হয় তাকে।

সকলের জন্য সবকিছুই করে ইন্দ্রজিৎ, কিন্তু নিজের জন্য কবিতা আর লেখা হয়ে ওঠে না। একান্ত অভিলাষ ছোঁয়া হয় না। এত কিছুর পরে সময় বা মানসিক স্থিতি, কোনটাই অবশিষ্ট থাকে না। হাঁপিয়ে ওঠে সে। হাঁসফাঁস করে। লিখতে না পারার অস্থিরতা কুরে কুরে খায় তাকে। নিজের অসহায়তায় নিজেরই মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করে। খালি মনে হয়, কেন এমন একটা জীবন দিল ভগবান! একটা গোটা কবিতাও লেখা হয়ে ওঠে না! অন্য কবিদের দেখে ঈর্ষা হয় মাঝে মাঝে… কেমন মসৃণ জীবন তাদের! কত সময় লেখা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার। লেখা তো আর সুইচ নয় যে টিপলেই আলোর মত জ্বলে উঠবে! তার জন্য একটা মানসিক স্থিরতা দরকার, ভাবনার অনেকটা অবকাশ দরকার, ছন্দ, মাত্রা, বিন্যাস সবকিছুর জন্য যথেষ্ট সময় দরকার… এসব কিচ্ছুই নেই যে তার জীবনে। অথচ সে যে কবি হতে চায়! … মনেপ্রাণে চায়। তীব্রভাবে চায়। এটা তার কাছে স্বপ্ন… রাতের এবং দিনের। আর স্বপ্ন নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে।

ইন্দ্রজিৎ তাই স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখে। ধিকিধিকি। একটা রুলটানা লম্বা খাতার পাতাদের ঘুমের ভেতর। সেইখানে বিন্যস্ত রুলের অনুশাসনের মাঝে ইন্দ্রজিতের শব্দরা হাত ধরাধরি করে ভাবের কুচকাওয়াজ করে। সাকুল্যে তিন-চারটে কবিতা। ছিমছাম হাতের লেখায়। বাদবাকি সব এলোমেলো পংক্তির গুচ্ছ– অসমাপ্ত, কাটাকুটিতে ভরা। লেখার সংখ্যার স্বল্পতা লেখকের সময়াভাব পরিষ্কার জানিয়ে দেয়। খাতার মলাটের ওপর মিহি ধুলোর আস্তরণ। বেশ কিছুদিন হয়ে গেল হাত পড়েনি। সাদা পাতার গায়ে নতুন কবিতার নকশা যেমন ফুটে ওঠে না, তেমনই পুরোনো কবিতাদের কাছেও ফিরে আসা হয় না। ত্যাজ্য সন্তানের মত ওরা পড়ে থাকে… বিস্মৃত, অবহেলিত। তবু ইন্দ্রজিতের মনে দু’-লাইন কবিতা গুটিপোকার মত গোল হয়ে শুয়ে থাকে, প্রজাপতি হওয়ার অপেক্ষায়। লেখার সুযোগ না থাকলে সেগুলো মনে রাখার চেষ্টা করে। মুখস্ত করে রাখে। টাটকা টাটকা মনে থাকে বটে, তবে বেশিরভাগটাই পরে হারিয়ে যায়। অনেকদিন এমন হয়, লেখার অবকাশ যদি বা পায়, লিখতে বসে অনুভব করে- লেখা আসছে না। অস্থির অস্থির লাগে। ঘরময় পায়চারি করে সে। লিখতে না পারার প্ৰচণ্ড কষ্টে ছটফট করতে থাকে। আর বুঝি স্বপ্নপূরণ হল না! তার অপ্রকাশিত কবিতার বইয়ের পাতারা যন্ত্রণায় ফড়ফড় করে ওঠে…

নাছোড়বান্দা ভাবনারা আনাগোনা থামায় না। এই সেদিন, তাও প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেল, প্রেসে একমনে কাজ করতে করতে কিছু এলোমেলো লাইন মাথায় এসেছিল। সেগুলোকে মনের মধ্যেই নাড়াচাড়া করছিল ইন্দ্রজিৎ। যেমন করে থাকে। অভাবিতভাবেই আটটি লাইন তৈরি হয়ে যায়। লাইনগুলো এত সুন্দর ধরা দিয়েছিল যে ও নিজেই চমৎকৃত হয়েছিল! প্রেসের একটা বাতিল কাগজের একপাশে ছোট ছোট হরফে তড়িঘড়ি সেই আটটি লাইন লিখে রেখেছিল ইন্দ্রজিৎ। তারপর ভাঁজ করে জামার পকেটে রেখে দিয়েছিল। সেই থেকে রোজ লেখাটা সাথে করে নিয়ে আসে… যদি কখনও শেষ করা যায় লেখাটাকে! খুব ভালো তৈরি হচ্ছে লেখাটা। ইন্দ্রজিৎ খুব খুশি ছিল এটা ভেবে যে কবিতা তাকে ছেড়ে যায়নি। তিন সপ্তাহে অবশ্য মন থেকে একটু আবছা হয়ে গিয়েছিল লাইনগুলো, কিন্তু ইন্দ্রজিতের উৎসাহে কোন কমতি ছিল না। মাঝে মাঝেই প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে কাগজটার অস্তিত্ব অনুভব করত সে। করে আস্বস্ত হতো। কেমন একটা নিশ্চিন্ত বোধ করতো। বহুদিন বাদে একটা লেখা নিয়ে তার মনে একটা চাপা উত্তেজনা, একটা ভালোলাগা সঞ্চারিত হচ্ছিল…

আজকের মতো প্রেসের কাজ শেষ। মন টানছে। বাড়ি ফিরে লেখাটা শেষ করতে হবে। আরও কয়েকটা লাইন মাথায় এসেছে তার। মন সেইখানে মশগুল। প্যান্টের বাঁ-পকেটে হাত দিয়ে কাগজটার অস্তিত্ব অনুভব করল সে। কাগজটা যেন ধুকপুক ধুকপুক করছে। টুল থেকে উঠে হাঁটতে গিয়ে অন্যমনস্ক ইন্দ্রজিতের আড়ষ্ট পা ধোঁকা দিল। টাল সামলাতে গিয়ে পায়ের ঠোক্করে উল্টে গেল মেঝেতে রাখা দামি রঙের কৌটো। অনেক টাকার লোকসান। আচমকা ঘটে যাওয়া ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেল ইন্দ্রজিৎ! মুহূর্তের বিভ্রমে দিশেহারা ইন্দ্রজিৎ হাতের কাছে কিছু না পেয়ে পকেট থেকে কবিতার কাগজটা বের করে, মেঝেতে গড়িয়ে পড়া রঙ মুছতে বসে গেল… কয়েক মুহূর্ত… হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেল! ততক্ষণে অসমাপ্ত কবিতার পাতা গাঢ় লাল কালিতে ভরে গেছে… অনেকদিন আগে লেখা আটখানা লাইন আর মনেও নেই!

ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল ইন্দ্রজিৎ, রক্তের মতো লাল রঙ মাখা কোঁচকানো কাগজের মণ্ডটা, দু’-হাতে আঁকড়ে ধপ্ করে মেঝেতে থেবড়ে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে! অস্ফুট গোঙানির মতো তার হাঁ করা মুখগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসে–

‘ঈশ্বর! আমি কবি হতে চেয়েছিলাম!’

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

মৌলীনাথ গোস্বামী

জন্ম ১৯৭০

আজন্ম বসবাস আসানসোলে। স্কুলজীবন কেটেছে আইরিশ মিশনারিদের মাঝে। ম্যানেজমেন্ট নিয়ে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে, রাজ্য সরকারের আধিকারিক।

দীর্ঘ সময় ধরে কবিতা ও গল্প, উপন্যাসের চর্চা করে চলেছেন। বিশ্বাস করেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি বস্তু নিয়ে কবিতা রচনা করা সম্ভব। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে প্রেম, বিচ্ছেদ, মানুষের সামাজিক অবস্থান এবং গভীর মৃত্যু-চেতনা। একাধিক পত্র-পত্রিকায়, তাঁর কবিতা, গল্প নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ- দয়াল । প্রকাশকাল, বইমেলা, ২০২০, প্রতিভাস, কোলকাতা।

লিখবেন, যতদিন জীবন লেখাবে তাঁকে দিয়ে…

This image has an empty alt attribute; its file name is ttttt888-1024x200.jpg

লেখকের আরও লেখা

ধুলো-মানুষের দেশ : মৌলীনাথ গোস্বামী

About S M Tuhin

দেখে আসুন

আব্বাস আলী আকন্দের একদিন : রোকেয়া ইসলাম

আব্বাস আলী আকন্দের একদিন রোকেয়া ইসলাম লেগুনা থেকে নেমে সোজা প্রিন্স হোটেলে ঢুকে ক্যাশ কাউন্টারে …

4 কমেন্টস

  1. সঞ্জয় সরকার

    ‘ইন্দ্রজিৎ’ খুব ভালো লাগলো। একটানা এ মন টানা লেখা পড়ে গেলাম। অনেক ধন্যবাদ লেখককে… 🙏

  2. It’s very effortless to find out any matter on web as compared to textbooks, as I found this article at this web site.

  3. tamoxifen and vertigo nolvadex 40 mg tamoxifen menopause

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *