কবি অর্ণব আশিকের ‘জীবনের খোঁজ জল ও জমিনে’ : প্রেমে মানবিকতায় দীপ্ত কাব্য

কবি অর্ণব আশিকের ‘জীবনের খোঁজ জল ও জমিনে’ : প্রেমে মানবিকতায় দীপ্ত কাব্য

আবদুল কাইয়ুম

কবির কাছে সাধারণ পাঠকদের আকাঙ্ক্ষা হলো,- মাটি ও মানুষে নমিত হোক কবিতা, ইতিবাচক জীবনচেতনায় জারিত হোক কবিতা। কবিতায় পাঠক খুঁজে পাক নিজেকে, নিজের অনুভূতিগুলোর সমান্তরাল বয়ে যাক কাব্যপ্রবাহ। শুধু কী তাই? কবিতার মাঝেকার চিত্র-শ্রতিকল্প অর্থময়তাকে ছাপিয়ে অন্তরে এক অনির্বচনীয় আবেশ ছড়িয়ে দিক। এসব ভালো লাগা ও সমানুভূতিকে জাগায় বলেই অধিকাংশ পাঠক জীবনঘনিষ্ঠ কবিতাকে তার পাঠ্য করে নেয়। আমাদের সৌভাগ্য যে, পাঠকদের এই চাহিদাকে আমল দিয়ে কবিতাচর্চায় ব্যাপৃত কবির সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এই আলোকিত কবিদের সারিতে সাম্প্রতিককালে আর একজন কবিকে পেলাম, তাঁর নাম অর্ণব আশিক। ষাটোর্ধ এই কবি সারা জীবনের কাব্যসাধনার তুমুল প্রস্তুতি নিয়ে তাঁর জীবনবাদী কাব্যদর্শনের প্রথম ফূলটি ফোটালেন ২০১৪ সালে, ‘ধূপগন্ধময় এই জীবন’ কাব্য প্রকাশের মাধ্যমে। বিলম্বে আগত এই অতিসংস্কৃত কবির দ্বিতীয় কাব্য ‘উজানি গাঙে নিঃসঙ্গ নোঙর’ (২০১৬)-এ ইতিবাচক জীবন, গ্রামীণ নিসর্গ ও নদীমাতৃক স্বদেশের আখ্যান নির্মিত হয়েছে। আর সেই উজ্জ্বল কাব্যবোধের ধারায় অবস্থান নিয়েই তিনি প্রকাশ করলেন ‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ (২০১৭) কাব্যটি, যা আমাদের আজকের আলোচ্য।

‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ কাব্যটিতে কবির প্রেম ও সামাজিক চেতনা নানাভাবে প্রস্ফূটিত হয়েছে। জীবনবোধ, দেশপ্রেম ও যুগযন্ত্রণা থেকে উদ্ভূত কবির বিভিন্ন অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে এ কাব্যের কিছু কবিতায়। তার সব চৈতন্যই বাংলার অমল প্রকৃতিকে আশ্লেষ করে এক অতুলনীয় নান্দনিক কাব্যপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির রূপ-সুষমা ও বিশালতায় আস্তীর্ণ করে প্রিয় নারীর প্রতিমূর্তি অংকনে সিদ্ধ এই কবি। আর সেই প্রতিমূর্তি কবির হৃদয়ে বিশ্বের তাবৎ নারীর স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে। সে তার কাছে ধরা দিয়েছে মহিমময়ী ও সর্বাত্মক প্রেমিকার আদলে। কবির উচ্চারণ-

আলাদা আলাদা আলাদা সব
তুমিই জমিন তুমিই আকাশ
তুমিই দরজা তুমিই ঘর
বাহির ও ভিতর তুমিই সব।
( ‘তুমিই সব’)

অন্তরে লালিত এই মহীয়সী প্রেমিকার অপরূপ রূপেরও সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন কবি। তাঁর ভাষায়-

এ নয় তোমার শরীর তুমিই শরীর
বেপরোয়া জোছনা ভেঙে পড়ে সেথায়
গোপন সিন্দুকে ধরে আছে রূপ
টেরি কেটে দাঁড়ানো নারী তুমি
এক স্বপ্নের কৌমুদী ভোর।
( ‘জলরঙে আঁকা মুখ’)

আবার কখনো দেখি, প্রিয়তমা পত্নীর সন্নিধানে স্বপ্নাচ্ছন্ন্ ও সংসারবিবাগী কবি পারিবারিক সংসারধর্মের ঘূর্ণাবর্ত থেকে ছিটকে পড়েছেন। তবু দাম্পত্যের মাঝে যে স্বাভাবিক প্রেম থাকে তার সবই সেখানে আছে। দুটি কবিতায় ( ‘স্বপ্ন ও সংসার’, ‘বিলম্বিত লয়’) প্রেমের এই স্বরূপ অনুভূত হলেও কবির অধিকাংশ প্রেমের কবিতায় তাঁর সেই মনোলীনা এক অসামান্যা দয়িতারই অবস্থান। এসব জায়গায় কবির বোধে নিসর্গ ও পৃথিবী ধরা দিয়েছে মহোত্তর প্রেমের পটচিত্র হয়ে। প্রেমের এই বিশালতা গণ্ডী ছাড়িয়ে সমগ্রের মাঝে মিশে গেছে। প্রেমের আনন্দ-বেদনা ও স্মৃতি সুন্দরভাবে কাব্যরূপ পেয়েছে। যেমন-

পাপড়িগুলি পড়ে আছে স্মৃতির মতো
ঝরাপাতার মিতালি দুঃখের সাথে
একদা তোমার বাগান জুড়ে ফুল ছিল
আমার বাগান জুড়ে তুমি আছো আজ।
( ‘আমার বাগান জুড়ে তুমি আছো’)

কবির আরো কিছু প্রেমের কবিতায় এমনি সুখস্মৃতির সাথে একটি সূক্ষ্ম বেদনার প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। যেমনি হারানো সময় নিয়ে তাঁর চিত্তের আনন্দ প্রকাশ পায়, তেমনি হারাবার কষ্টও তাঁকে ছুঁয়ে যায়-

তুমি নেই
স্মৃতি যেন কাঞ্জিভরম শাড়ির আঁচল,
বার বার খসে পড়ে,
নেশাগ্রস্তের মতো রাত জাগা হৃদয়ে উতরোল কথা কয়,
কবিতার পর কবিতা শোনায়, বিরহী পথ চাওয়ায়
খোঁজে স্মরণীয় মায়াবী সন্ধ্যালগন এবং
তোমার উড়ন্ত আগমন।
( ‘এরই নাম প্রেম’)

এভাবে প্রেমের আনন্দ-বেদনা, প্রেমের জন্য নানা আকুলি-বিকুলি, প্রেমস্মৃতি –এ সবেরই স্বপ্নময় কাব্যিক প্রকাশ লক্ষ্য করি কাব্যটিতে। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো পাঠে স্পষ্টই মনে হবে- তিনি মুখ্যত একজন স্বাপ্নিক কবি। কিন্তু তাঁর কবিতার জীবনবাদী প্রান্তটি একেবারে উল্টো। তখন তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বা যুগযন্ত্রণার নির্মমতায় বিদগ্ধ এক বৌদ্ধিক কবি। আমরা কাব্যটির কিছু কিছু কবিতায় জগত ও জীবনের দু:খক্লেশে বিমর্ষ কবির তীব্র অনুভূতিগুলো লক্ষ্য করি। তিনি কবিতা নিয়ে ফটোগ্রাফি করেননি বলেই দুর্দশার প্রেক্ষিতকে বেদনার্ত হৃদয়ানুভূতি সহকারে প্রকাশ করেছেন। সমকালীন হত্যা ও নৃশংসতার বিপরীতে তাঁর উচ্চারণ-

মা আকাশটা আজ কাঁদছে,
নির্বাচনে মানুষ মরছে, উড়াল সেতু ধ্বসে মানুষ মরছে,
তনুরা মরছে ধর্ষকের সহিংসতায়, প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন ছায়ায়

কবি স্বদেশকে বড় ভালোবাসেন, স্বদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর অবিচল শ্রদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকালীন উন্মাতাল দিনগুলোয় বাঙালির বিপুল রক্তক্ষরণ ও প্রতিরোধ-যুদ্ধকে, সেই কান্না ও স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দকে তুলে ধরেছেন কবি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর পরম শ্রদ্ধার্ঘ লক্ষ্য করি যথাক্রমে ‘১৭ই মার্চ’ ও ‘জনকের ছবি’ শীর্ষক দুটো কবিতায়। শেষোক্ত কবিতায় কবি লেখেন-

প্রতি সন্ধ্যায় আমার ক্রোধ ও দ্রোহের পাশে
জনক তোমাকে দেখি,
৭ই মহাকাব্যের বাণী শুনি
আর তোমার মার্চের সমাধিকে দেখি প্রজ্জ্বলিত মশালের আলোয়
তোমার জীবন ও সংগ্রামের আয়াস সৃজন অনুভব করি
তোমাকে জানার আকাশ ইচ্ছেগুলো নতুন করে জন্ম হয়।

কবি অর্ণব আশিক এ কাব্যের আরো কিছু কবিতায় বিভিন্নভাবে ইতিবাচক মানবিকতায় স্নাত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা খণ্ডচিত্র ও বোধের পরিচয় পাওয়া যাবে তাঁর কয়েকটি কবিতায়। বাংলা ভাষা ও মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা , নারী জাগরণ, গ্রামীণ মানুষের জীবন ও সংকট, নাগরিক জীবনের দুরবস্থা প্রভৃতি বিষয়েও তিনি লেখনী ধারণ করেছেন।

‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ কাব্যটিতে গ্রামবাংলা ও গ্রামীণ নিসর্গ চিত্রায়নের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ জীবন-প্রকৃতি কবি-অন্তরে সেঁটে থেকে পথদ্রষ্টার মতো যেন তাঁর কাব্যবোধকে চালিত করে। গ্রামবাংলা অপরূপ মাধুরিতে ঝরে পড়ে তাঁর কবিতার ভাষায়-

জীবনের খুব কাছে সবুজের ঘাসে, কর্ষিত জমিতে,
নেমে আসে মেঘবতী আকাশ, জল ও কাঁদা একাকার,
কৃষকের চোখের পাপড়ি চুইয়ে বৃষ্টি ফোঁটা ঝরে
রাখালিয়া বাঁশি বেজে ওঠে লাঙলের ফালে;
ভেজা পাখি করে ওড়াওড়ি নিবিড় মেঘের সাথে,
ঠোঁটে নেয় জলকণা, ধূলিকণা, খাদ্য তার।
( ‘গ্রামীণ সম্পর্ক’)

অর্ণব আশিকের শব্দ-বিশেষণ প্রয়োগ ও বাণীবন্ধ নির্মাণের রীতি একান্তই তাঁর নিজস্ব। কাব্যটির প্রতিটি কবিতার ভাষা বিশুদ্ধ ও সুগঠিত। তাঁর ভাষায় কোনো চটুকে ভাব বা প্রদর্শনশীল চমক নেই, প্রেক্ষাপটের উল্টোপাল্টা বাঁক-মোড় নেই। তিনি সর্বদাই প্রসঙ্গের ভেতরে থাকেন। প্রতিটি কবিতাই স্বচ্ছন্দে প্রবহমান, কোথাও কোনো স্থবিরতাও দৃষ্ট হয় না। তাঁর ভাবনাগুলো একনাগাড়ে ভাষায় গড়িয়ে চলে, থমকে দাঁড়ায় দাঁড়ায় না কোথাও। নেই কোনো জোড়াতালি। আর পরিচিত শব্দভাণ্ডার থেকেই চয়ন করেন তাঁর কাব্যোপযোগী শব্দ। তদুপরি, চিন্তার জট পাকিয়ে কাব্যভাষাকে বোধাতীত করার তাড়নাও তাঁর মাঝে দেখা যায় না। এর ফলে তাঁর কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে সাবলীল, সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য। তাঁর প্রতিটি কবিতাই আপন ছন্দের মাধুরি মাখা। তিনি গভীর ভাব প্রয়োগের দ্বারা ভাষাকে দুর্বোধ্য করে তোলেননি। যা তাঁর কল্পনায় ধরা পড়েছে তাকেই তিনি অকপটে তাঁর মতো ভাষায় সরাসরি প্রকাশ করেছেন। অন্য কবিদের থেকে একেবারে আলাদা বৈশিষ্ট্যে ঋদ্ধ তাঁর কবিতাগুলো। আশা করা যায়, কাব্যটি পাঠকের কাছে আদৃত হবে।

প্রকাশকাল অমর একুশে বইমেলা, ২০১৭ । প্রকাশক : শরীফা বুলবুল, বলাকা প্রকাশন, ঢাকা। সুন্দর প্রচ্ছদ ও ভেতর-মলাটে ঋদ্ধ ভূমিকা শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। বইটির মূল্য : ১৩০ টাকা

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

About S M Tuhin

দেখে আসুন

টেক্সট (Text) যখন স ম তুহিনের কবিতা : শুভ্র আহমেদ

পাঠস্পন্দন টেক্সট (Text) যখন স ম তুহিনের কবিতা শুভ্র আহমেদ রবীন্দ্রনাথ প্রায় সকল কে অভিনন্দিত …

3 কমেন্টস

  1. Like!! I blog frequently and I really thank you for your content. The article has truly peaked my interest.

  2. Your site is very helpful. Many thanks for sharing!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *