গল্প – সব আছে : বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

গল্প
সব আছে

This image has an empty alt attribute; its file name is 9577.jpg

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

সন্ধ্যা যখন তমালের ডালের মতো কালো ও নির্জন হয়, তখন মঠের মাঠের জঙ্গলের মধ্যে প্রকাণ্ড পাকুড়গাছটার নীচডালে বসে পা দোলায় মাখন।

আজ পাঁচ দিন হল, মাখনের ভূত এখানে এসেছে। মরবে না মরবে না ভেবে, ঠিক সেই নভেল করোনা ভাইরাসের মহামারিতেই মরল ঠাকুর ঘরের সামনে । একে তো চৈত্র মাস, তার ওপরে দুপুর বেলা। অতি নীল আকাশ থেকে সোনা সোনা রোদ ঝরে পড়ছিল। প্রচন্ড শ্বাস-কষ্টে চিৎ হয়ে পড়ে থাকা মাখনের চোখে আজন্মকাল দেখা ওই উদার আকাশের ভেংচিকাটা আসল রূপটি হঠাৎ ধরা পড়ল। তারই অভিমানে মুখখানা সেই যে চুপসে গেল, মরে গিয়েও তা চুপসেই থাকল। ভবলীলা শেষের পর কোথায় আর যায় ? সবে ভূত হয়েছে। ভূতদেশের আচার-আইন কিছুই জানা নেই। একবার ভেবেছিল, ঠাকুর ঘরের আড়ার ওপরে উঠে বসে থাকবে. আর বাচ্চা-কাচ্চাদের মঙ্গল কামনা করবে। মানব জনমের সবকিছু এখনও চোখের সামনে চকচক করছে। কিন্তু যে ঠাকুর ঘরে সত্তর বছরের জীবনে কখনও পূণ্যার্থী হয়ে, কখনও পুজারী হয়ে প্রতিদিন যেত, সেই ঠাকুর ঘরে ঢুকতে ইচ্ছে হল না। প্রচন্ড একটা অভিমান গুলিয়ে উঠেছিল সুক্ষ বুকে। খাঁ খাঁ দুপুরে চৈত্রের একটা আলগা হাওয়ায় চোখদুটো ছলছল করে উঠেছিল। সেই অভিমানে সেখান থেকে চারমাইল দক্ষিণে ধূধু বিলের পাশে মঠের মাঠের জঙ্গলের এই পাকুড়গাছে এসে আস্তানা গাঁড়ল। নিজের মড়াটার সৎকার দেখার ইচ্ছে ছিল খুব, কিন্তু ক্ষোভ আর অভিমানে তাও দেখা হয় নি।

যা হোক, সন্ধ্যার হাওয়ায় ফুরফুরে মেজাজে মাখন পা দোলাচ্ছে। ভয় থেকে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে সে। কী বিভৎস্য ভয় লেগেছিল মানুষ থাকতে ! করোনার ভয়, মৃত্যুর ভয়, খাবারের ভয়, ঋণের ভয়! আর কী কষ্ট রে বাবা! যখন শ্বাস-কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল-কী করে সহ্য করবে! এখন মনে হচ্ছে সব মিথ্যে। আসলে জীবন আর মৃতটা দড়িতে গেরো লাগার মত একটা ব্যাপার। গেরো খুললেই কী যেন কী হবে! কী একটা দৈত্য এসে দাঁড়াবে! যেই গেরো খুলল, অমনি সব মিথ্যে হয়ে গেল ! কোথার ভয়! কী যে শান্তি! আহ!

ঘেঁটুফুলের গন্ধে গুবরে পোকারা গান গাইছে। সেই গান শুনতেই বোধহয় একটা বাদুড় সাঁই সাঁই করে ফাঁকা বিলের দিক থেকে উড়ে এসে মাখনের ঠিক সামনের ডালে দু’পা বাঁধিয়ে ঝুলে পড়ল। ঝুলন্ত চোখে মাখনকে দেখেই থতমত খেয়ে গেল। একটা হাওয়া-হাওয়া মার্কা প্রাণী না অ-প্রাণী, এখানে যে বসে ছিল, দেখতে পায়নি । এখন ঝুলে থাকবে, না ছুট দেবে ভেবে পাচ্ছে না। হাঁ-হয়ে মাখনকে দেখছে। মাখনও হঠাৎ গায়ের ওপর বাদুড় দেখে একটু হকচকিয়ে গেল। কিন্তু এখন তো সে আর মানুষ না। এ দশায় এ রকমই তো হবে। বুক ভেদ করে, চোখ ভেদ করে চলে যাবে-হাওয়া কাটার মত, এ আর এমনকি। কিন্তু অনেক আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল বাদুড় দেখে। এত সহজে কি মানব জীবনের কথকথা ভোলা যায়! এরকম এক সন্ধ্যার সময় মাখনদের সবেদাগাছে অনেকগুলো বাদুড় ঝুলছিল। বড় ছেলেটার বয়স তখন নয় বছর। সে এমন বায়না ধরল বাদুড় ধরার জন্য যে, মাখন অন্তত চার ঘন্টা এগাছ তলায়, ওগাছ তলায় পাঠকাঠি নিয়ে তাড়িয়ে বেড়াল। কিন্তু বাদুড় ধরতে পারল না। বিল্টু তো সে রাতে মোটে ঘুমোবে না। বাদুড় তার চা-ই চাই। অনেক রাত পর্যন্ত তাকে এটা-ওটা গল্প বলে তবে ঘুম পাড়ানো হল। মনে পড়ছে, আর মাখন হাসছে। এখন একটা আস্ত বাদুড় তার হাতের কাছে। বাদুড়ের গায়ে কোন ফাঁকে হাত ঠেকিয়ে দিচ্ছে, বাদুড় টেরও পাচ্ছে না। কত সহজ এই ভূত জীবন। আহা! এখনকার সন্ধ্যাটাও ঠিক সেদিনটার মত নির্জন। বাদুড় বিষ্ময়মাখা চোখে মাখনকে কিছুক্ষণ দেখে কী না কী ভেবে হঠাৎ সাঁই সাঁই করে পিঠটান দিল, অমনি বেতবনের মাথা আর পাকুড়গাছের ঝুলন্ত ডাল, এর ফাঁকের খালি জায়গায় একটা আওয়াজ হল, “আ মলো! চোখের মাথা খেয়েছ দেখছি! তোমরা বাদুড়রা নাকি করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছ? তা একবার তো মেরেছ, আবার এখানেও মারবে নাকি!”

গলা শুনেই চমকে উঠল মাখন! এ যে খোকন গাজী! ত্রিশ বছর কথা হয় না তার সাথে। পাশাপাশি বাড়ি। এক কাঠা জমি নিয়ে বংশ পরম্পরায় বিবাদ। মামলা ঝুলছে পনেরটা। খোকন করেছে নয়টা, মাখন করেছে ছ’টা। করোনায় কোর্ট বন্ধ না হলে আরও দুটো মামলা রুজু করার ইচ্ছা ছিল মাখনের। একটা হত খোকনের বড় জামাতা আবুলের নামে, সে কিনা সেদিন রাস্তায় আচ্ছা করে বাপ-মা তুলে গালাগালি দিয়েছিল মাখনের শালিকার ছেলেকে, আর একটা মামলা হত-খোকনের বাড়িতে কাজ করে যে মোসলেম, তার বিরুদ্ধে। সে নাকি গন্ডগোলের জমিতে জোর করে গাছ লাগাতে গিয়েছিল। কিন্তু তার তো আর উপায় নেই। মামলা চালাতে চালাতে তিনশ কাঠার টাকা চলে গেছে, তবু কারো জিদ ছাড়াছাড়ি নেই। বাদুড়টা খোকনের খ্যাকানি খেয়ে হুড়মুড়িয়ে পগার পার। এ জন্মে বোধহয় আর এ দিকে আসবে না।

খোকন গাজী গা-টা ঝেড়ে গুনগুন করে একটা পল্লীগীতি গাইতে গাইতে খলখল করে উড়ে আসছিল। কাছাকছি আসতেই সামনের ডালে মাখনকে বসে থাকতে দেখে গান-টান বন্ধ করে সেই পিঠপিঠ চলে যাচ্ছিল। মাখন ডাকল, ‘যাচ্ছিস কোথায় খোকন! বলি তুইও কি করোনায়?’

মাখনের ডাক শুনে বেশ শান্তি লাগল খোকনের। কত দিন এই ডাক শোনে না। মানুষ থাকতে অনেক কিছু হয়েছে, ভুত হয়ে সে সব আর মনে রেখে লাভ কী! খোকন খুব লাজুক ভাবে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, “হ্যা দাদা, আজ সকালেই মরেছি! আপনার এক সপ্তা পর!”
‘‘কেমন লাগছে এখন? শান্তি লাগছে না?”
“খু-উ-ব! ওরে বাপরে শ্বাস-কষ্টে কী কষ্ট রে বাবা !”
“তা অত খলখল করে উড়ছিস কেন? হাড়গোড় যে এখনও কাঁচা, ভেঙে যাবে ! আয় ! এখানে এসে বোস!”
মাখন একটু সরে বসে খোকনকে বসতে দিল। সন্ধ্যে বেশ ঘনিয়ে এসেছে। শ্যাওড়া আর বেতঝোপের মধ্যে দুএকটা জোনাকি উড়তে শুরু করেছে। দূরে প্রকান্ড ফাঁকা বিলের জলে শুক্লপক্ষের চাঁদের আলো। শালুক ফুটেছে। বিল দেখতে দেখতে বেতফলের গন্ধে বাবার কথা মনে পড়ে গেল মাখনের। বাবার পিছন পিছন ছোট্ট মাখন শালুক তুলতে আসত বিলে। একঝুড়ি শালুক তুলে মাখনকে কোলে নিয়ে ফিরত বাড়ি। ফেরার পথে বুড়ির দোকান থেকে দশ পয়সার দুটো লজেন্স কিনে দিত। বাবা মরেছে কত কাল আগে ! মানুষ থাকতে সংসারের ব্যস্ততায় বাবার কথা ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু এখন তো চেষ্টা করলে বাবাকে দেখা যায় ! বাবা তো মরে ভূতই হয়েছে! চিন্তা করতেই মাখনের হাড়ের চাঁদি পুলকে কড়কড় করে নড়ে উঠল।
“আচ্ছা খোকন ! আমার বাবাকে দেখেছিস ?”
“না দাদা, আমি জন্মাবার দশ বছর আগে তিনি মরে ছিলেন বলে শুনেছি।”
“ওহ-ও!” মাখন মাথা নীচু করে ভাবতে থাকে।
“কেন দাদা?”
“না তেমন কিছু না, বাবার মুখটা আমার মনে ছিল না, তবে এখন মনে পড়েছে! কিন্তু কোথায় যে দেখা পাই ! দেখা হলেই বাবা বাবা করে জড়িয়ে ধরব!”
এমন সময় গাছের মগডালের দিক থেকে ডাল-পাতা সরিয়ে কে একজন গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল।
মাখন খোকন দুজনেই ভয়ে কেঁকিয়ে উঠে বলল“কে রে?”
হুঁকো-টানা কাশি কাশতে কাশতে মগডালের সে বলল, “আ ম’লো ! ভূত হয়েচ তো এত ভয় কেন?”
ভূত হলেও এখনও ভয় ভাঙেনি মাখন খোকনের। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল একেবারে মগডালের কাছে বসে আছে জলজ্যান্ত একটা ভূত। খুব বুড়ো, দূর্বল চেহারা। হাঁটুর হাড়ের চিড় এখান থেকেও দেখা যাচ্ছে। চেহারা এমন নড়বড়ে যে, একটু ধাক্কা দিলেই পাটকাঠির মত ভেঙে চৌচির হয়ে যাবে। হাতে একটা খাতা। মুখটা বিরক্তিতে পুড়ে আছে। দু চোখে রাগ। তবে মুখের সমস্ত হাড়গোড়ে একটা সর্বজ্ঞ পন্ডিতি দৃঢ়তা রয়েছে।
মাখন জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?”
“আমি হচ্ছি গিয়ে এখানকার রেজিস্ট্রার, নাম গদাই। তোমাদের দুটোকেই রেজিস্টারে এন্ট্রি করেছি !” বলেই গজগজ করে বলতে লাগল গদাই, “এ কাজ আর ভালো লাগে না, কত ভূত এল গেল, আমার আর জমমো হল না…সব দোষ ওই ব্যাটা লর্ড কার্জনের চাকরটার, ব্যাটা আমার আগে এই রেজিস্ট্রারের কাজ করত, যেই ১৮৯৯ সালের প্লেগে আমি এখানে চলে এলুম, অমনি ব্যাটা আমাকে নতুন পেয়ে আমার ওপর এই বিতিকিচ্ছিরি দায়িত্ব দিয়ে আবার মানুষ জমমো নিল, তারপর দু-তিনবার জমমো নিল আর এল। এবার এলেই হয়, আর ছাড়ছি নে, এবার করোনাতেই আসবে, শুনেছি ওকেনে ডিলারগিরি করচে আর ত্রাণের চাল চুরি করচে, করোনা না নিলেও পাবলিকে ধোলাই দিয়ে সোজা একেনে পাটিয়ে দেবে ব্যাটাকে !…”
লর্ড কার্জনের নামটা শুনে খোকনের বেশ আগ্রহ হল। লোকটাকে কখনও দেখেনি। যদি তার ভূতরুপটিকে দেখা যায়, তাহলে শোনা যাবে, এই যে সব ওলোট-পালোট আইন বৃটিশরা বানিয়েছিল, মাখনদার সাথে তার যে জমিজমার বিবাদ, তার কত যে ফন্দি-ফিকির ওই আইন দিয়ে বের হচ্ছে, আসলে এসব আইন তৈরীর পেছনে রাজকীয় উদ্দেশ্যটা কী ছিল!
খোকন তাই খুশি মুখে শুনতে যাচ্ছিল, “আচ্ছা কাকা…”
অমনি গদাই বেজায় খেঁকিয়ে বলল, “অ্যাই কী বললি !”
খোকন থতমত খেয়ে ভাবল, সম্বোধনে বড্ড অ-বিনয় ছিল, তাই বোধহয় বুড়ো ক্ষেপে গেছে। শুধরে বলল, “আচ্ছা ভূতকাকা…”
“আবার…!,” বড়ো একটা তাড়া দিয়ে গদাই রাগে কাঁপতে লাগল, ডাল থেকে তার এক পা হড়কে যাচ্ছিল।
খোকন ভাবল, সম্বোধনে কোথাও ভুল হচ্ছে। ভূতেরা সম্ভবত অন্যভাবে সম্বোধন করে। নতুন এসেছে বলে এখনও শিখতে পারেনি।
গদাই একটু ঠান্ডা হলে বলল, “ তোর কিসের কাকা রে আমি ! নতুন এয়েচ বলে ভাবচ কচি খোকা ! তুই আমার চেয়েও বড় ! জমমো নিইনি বলে আমার এই দশা, নইলে এই জমমে আমি তোর ছোট ছেলে হতুম! ব্যাটা তুমি একেনে পরথম এয়েছিলে পলাশী যুদ্ধের সময় ! এই নিয়ে তোমার পাঁচবার মানব জন্ম হল। পাঁচবারই তুমি ভাইরাসে মরেছ। পরথম মললে প্লেগে, তারপর পোলিওতে, তারপর স্প্যানিস ফ্লুতে, তারপর ডেঙ্গুতে, আর এবার গেলে কোডিড-১৯-এ। এই রেজিস্টারে লেখা আছে। ভাগ্যিস এইডস-এ মরো নাই, তাহলে একেনে আসতে পেতে না, যেতে হত উ-উ-ই গড়ের মাথায়। আর এবার মানব জমমের আগে তুমি ব্যাটা কী ছিলে, সেইটে বলতেই এই সন্দে-ঘুম ভেঙে জেগে উঠলুম…”
বাবাকে দেখার জন্য মাখনের মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। খোকন আর গদাইয়ের এই চেঁচামেচি তার ভালো লাগছিল না। তাই সে মাঝখানে রফা করতে এগিয়ে এল। বলল, “তা নয় হয় বলবেন বিজ্ঞ ভূতাচার্য ! তার আগে বলুন লর্ড কার্জনকে কি দেখেছেন?’
“অনেকবার দেখেচি, যে কবার মরেচেন, একেনেই এয়েচেন, ওনাদের হাড়ে রাজা-রাজড়ার ক্যালশিয়াম, তাই তো বারবার হয় রাজা, না হয় প্রধানমন্ত্রি, না হয় প্রেসিডেন্ট হয়ে জমমান। এখন ওই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট…কী নাম যেন… ডোনাল্ড ট্রাম্প না ফ্রাম্প, তিনি হচ্ছেন উনি,…তা সেকেনেও নাকি উল্টোপাল্টা করচেন, নিজের দোষ ঢাকতে আরেকজনের কান মলছেন, তা উনি বাপু বুঝোসুঝো ভূত, এবার এলে বলব-দেকুন, শুধু জমমাবার জন্য হাপিত্যেস করেন, তা এবার জমমালে জিদ করে পাবলিককে দেকানোর জন্য আর নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করবেন না, ওই যে কী বলে পুতিন, ওই জিনপিং, মোদি-এদের সাথে আর বিবাদে জড়াবেন না, মানুষ মলে তো ভূত, সেই মানুষ যদি না থাকে, তবে আমাদের তো প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যাবে, তাই ওই কী বলে নভেল করোনা ভাইরাস, দুর্ভিক্ষ এ সবের মহামারি থেকে মানুষকে বাঁচাতে পরস্পরের সহযোগিতা করবেন, একযোগে কাজ করবেন, দেখবেন পৃথিবী আরও সবুজ হয়ে উঠবে…তা বাপু যে কথা বলতে এই সন্দে-ঘুম ভাঙলাম সেটা বলি…শোনো মাখনো!…
“মাখনো না, আমার নাম মাখন !”
“সে তো জানি, কিন্তু আমরা ওটা উচ্চারণ করতে পারি না, আমাদের গন্না কাটা।”
‘কিন্তু আমি যে পারলাম।”
“তোমাদের একনও গন্না কাটেনি, তাই তো মানুষ জমমের কথা ভূলতে পারছ না, আর ক’দিন পরেই তোমাদের গন্না কেটে যাবে, তখন পুরোপুরি ভূতপ্রেম জমমাবে…যাক গে শোনো তাড়াতাড়ি, আমার আবার চালচোর ভূতগুলোকে বাজপাখি ঠোকাচ্ছে কিনা দেকতে যেতে হবে…মাখনো ! তোমার বাপ এই খোকনো, এই জমমের আগের জমমে তোমরা দুজন বাপ-ছেলে ছিলে মনে করে দেখ!”
বলেই গদাই বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। মাখন আর খোকন হতবাক হয়ে দুজন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখ নীচু করে রইল। গদাইয়ের কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। গদাই সাদা ধোঁয়া হয়ে এই গাছে ছোট্ট একটা ধাক্কা মেরে পাশের জঙ্গলের দিকে উড়ে গেল।
গদাই চলে যেতেই মাখন আর খোকনের মনে সদ্য সাবেক মানব জীবনের অহেতুক কুটিল আচরণ, বিশেষকরে জমি-জমা সংক্রান্ত দীর্ঘ বিবাদের সমীক্ষা চলতে লাগল। আর সেই সমীক্ষা থেকে উদগারিত বিষাদ নীচের বেতবন হয়ে শ্যাওড়াগাছের মাথা হয়ে এই পাকুড়গাছের প্রতিটি পাতায় জমে উঠল। প্রতিটি অন্ধকার পাতা মুখ ফিরিয়ে আছে। বিলের দিক থেকে ভেসে আসা মৃদু বাতাস করুণ সুর গাইতে গাইতে জেঁকে বসছে এই গাছের ডাল-পাতায়। চাঁদ-কপালে আকাশটা গম্ভীর হয়ে আছে। তারাগুলো প্রচন্ড রেগে আগুন চোখে তাকিয়ে আছে। দু একটা রেতো পতঙ্গ উড়ছিল, তারা কোথায় যেন পালিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে গেল। হঠাৎ দূর থেকে শ্মশানের একটা পোড়া গন্ধ এসে মিলিয়ে যাওয়ার পর তলার ঝোপজঙ্গল থেকে ঘেঁটু ফুলের গন্ধ বের হল। মৃদু বাতাসে ফড়ফড় করে উড়ে চলে এল কতকগুলো জোনাকি। ঘুগরো পোকাদের তারস্বরে ডাক শুরু হল। জোছনালোকিত দূর ঝাপসা জলাকারে নির্মিলিত চোখ রাখতে রাখতে খোকনের ভূতুড়ে হাড়ে ভূতুড়ে জেনিটিক একটু একটু করে সক্রিয় হল, সেখান থেকে রিলিজ হতে লাগল স্মরণ-রস। পুরো ভূতলোক মাটির সোঁদা গন্ধের মত সুক্ষ-চেতন হয়ে ঢুকতে থাকল খোকনের মধ্যে। তার করোটিতে কী যেন গুটিয়ে গুটিয়ে উঠছে, যেন কেউ এঁটেল মাটি ঘষে দিচ্ছে। সমস্ত হেড়ে শরীরে মৃদু কম্পন হতেই খোকনের কাছে এই জায়গাটা খুব চেনা ঠেকল। বিশাল বটগাছ ছিল! ওই তো ! ওই তো তার গোড়া পড়ে আছে! এই পাকুড়গাছ ছিল না তখন। সামনের ফাঁকা বিলটা তেমন আছে, কিন্তু ওই পাশে ওই যে দূরের জনবসতি ছিল না। এবার শুকনো খুলিতে ভোঁ ভোঁ করে শব্দ উঠছে, সমস্ত জঙ্গল হেলে-দুলে উঠছে। ঝিমধরা চোখে খোকন দেখতে পায় বসন্তপুরের বিলের রাস্তায় গরুরগাড়ি চলছে। জনশুন্য এক বিষাদমাখা বিকেল ছিল সেদিন। খোকন কাঁদতে কাঁদতে ছুটছে পিছন পিছন, গাড়িতে তার একমাত্র পুত্র নগেন, নগেনের জ্বর হয়েছে, কিছুতেই সারছে না। সেই সন্ধ্যেয় হাসপাতালের বারান্দায় নগেন মরে গেল, খোকন পরের ত্রিশ বছরের জীবনে একদিনও প্রিয় পুত্রের শোক ভুলতে পারেনি। নগেন নারকেল কোরা খেতে চেয়েছিল, দিতে পারেনি বলে সারা জীবন আর কখনও নারকেল কোরা খায়নি খোকন। দেখতে দেখতে খোকনের হাড়-চোখে কুয়াসার মত জল জমে উঠল। একটু নাক টানতেই চেনা একটা গন্ধ নাকে এল। এ তো সেই নগেনের গন্ধ! বেশ মনে পড়ছে! শিশু থাকতে নগেনের তুলতুলে নরম দেহখানা যখন বুকের সাথে লেপ্টে ধরে বারান্দার খাটে শুয়ে থাকত, তখন এরকম গন্ধ লাগত। গদাই তো ঠিক বলেছে! গন্ধটা মাখনের গা থেকে আসছে ! এ তো সেই নগেন ! তার প্রিয় পুত্র নগেন ! চোখ-মুখে সেই আদল! খোকন হাঁ-করে বিগলিত হয়ে পাশ থেকে মাখনকে দেখতে থাকে। মাখনও তার বাবাকে চিনতে পেরেছে। ‘বাবা বাবা’ করে ডাকার জন্য তার প্রাণটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। খোকনেরও একই অবস্থা। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে যাকে ‘মাখনদা মাখনদা’ বলে ডেকেছে, তাকে কিকরে ‘নগেন’ বলে ডাকে? তবু সত্যকে তো মেনে নিতে হবে। খোকন আবেগভরা কন্ঠে দু হাত বাড়িয়ে ডাক দিল, “নগেন !”
“বাবা!”
“আয় বাবা কাছে আয়!”
“এই তো বাবা!”
মাখন আর খোকন তাদের সন্তানদের জমি-জমা নিয়ে বিবাদ মিটিয়ে নেওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখাতে যাবে। খোকন থাকবে তাদের উঠোনের নড় নারকেলগাছে, আর মাখন থাকবে ঠাকুরঘরের আড়ার ওপরে। বাপ-বেটা উড়ে যেতে প্রস্তুত, এমন সময় গদাই বড় ডালের ফাঁক দিয়ে একজনকে টানতে টানতে ধরে এনে মাখনকে বলল, “একে চেনো?”
মোটা হাড়গোড়ের কুঁজো একটা ভূত। চোয়ালে অপমানের লজ্বা। মুখ নীচু করে গদাইয়ের হাতে ছুলছে। পা দুটো ডালে লাগলেও লাথি মেরে মেরে সরিয়ে দিচ্ছে।
মাখন খুব ভালো করে দেখে জিজ্ঞেস করল, “এ কি কোভিড উনিশে এসেছে?”
“না না, এ এসেছে হার্ট অ্যাটাকে! এ বেটা ছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী, টাকা খেয়ে সমস্ত হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার দু নম্বর কীট দিয়েছে, ভালো ডাক্তারদের গালাগাল দিত, করোনা পরীক্ষার ব্যাপারে মিথ্যে রিপোর্ট তৈরী করত, একটুখানি সর্দিজ্বর হয়েছে কি হয়নি, অমনি ভয়ে হার্ট অ্যাটাক করে সোজা একেনে, বাজপাখির ঠোকানি খাবে না বলে ব্যাটা আমাকে ঘুষ দিতে চেয়েছিল…সারাক্ষণ মানবজীবনের কথা ভাবছে..এখানে একটা নিয়ম আছে, গন্নাকাটার আগে সারাক্ষণ যদি মানবজীবনের কথা ভাবো, তবে আবার মানুষ হয়ে জমমাবে, এ ব্যাটা আবার মানুষ হয়ে জমমালে হয় মন্ত্রী না হয় সমাজপতি হয়ে আবার অপকর্ম করবে…একে একটু বোঝাও, “ বলেই গদাই মাখনের দিকে চেয়ে বলল, ‘সরফরাজ খানকে খুন করে যে বছর আলিবর্দী খাঁ বাংলার মসনদে বসল, সে সময় এ ছিল তোমার পুত্র!”
মাখন দু চোখ বিষ্ফারিত করে এই নতুনকে দেখে চিনতে পারল, “তাই তো! এ ই তো আমার আলী, আমার প্রিয় পুত্র!”

নতুন ভূত একটু পরেই তার সাত জন্মের আগের বাপকে চিনতে পারল। সেই সাথে মনে পড়ে গেল একমুঠো ভাত জোটানোর জন্য এই বাপ কত কী না করেছে। লজ্বা-টজ্বা ভুলে আলী তার বাবার দিকে মায়াবী আর ছলছল চোখে তাকিয়ে পড়ল।
মাখনের বুকটা ভরে গেল প্রিয় সেই আলীকে দেখে। আলীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি বসো, আমি এক্ষুনি এসে সব গল্প শুনব।”

মাখন অনিচ্ছা সত্বেও ঠাকুর ঘরে ঢুকল। কারণ তাদের বাড়িতে আর কোথাও বসার মত জায়গা নেই। ঠাকুরঘরের একেবারে ওপরে মাকড়সার জাল জড়ানো আড়ায় বসে পুরনো স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছে, এমন সময় তার সমস্ত মনে বিষাদের ছায়া পড়ল। ওপাশের ঘর থেকে কান্নাকাটির শব্দ আসছে। তার ছেলে বিমলের কোভিড-১৯ পজিটিভ এসেছে, মাখন যে ঘরে থাকত, সেই ঘরেই তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। মাখনের এখনও গন্না কাটেনি। কাজেই মায়া-মমতা সেই ভাবেই প্রায় রয়ে গেছে। ঠাকুরের ওপর তীব্র ক্ষোভটা আবার গজিয়ে উঠল। নীচে পাথরটির দিকে রাগচোখে তাকাতেই মাখন চমকে উঠল। এ কী ! পাথরের পাশে অন্ধকার কোণে বড় কালো কলসির মত ওটা কী! দুপাশে রক্তের ফোঁটার মত দুটো আগুনের গোলা ! ঠিক যেন দুটো চোখ! কখনও তো এ বস্তু দেখা যায়নি এখানে ! সেই কলসির মত বস্তুর গা থেকে কালো একটা রশ্মি বিমলের ঘরের ওপর পড়ছে! মাখন থ হয়ে দেখতে থাকে, একদিন, দুদিন, তিন দিন-এভাবে সাতদিন ধরে শুধুই দেখতে থাকে। হঠাৎ বাড়ির মধ্যে তার স্ত্রীর আনন্দ-উল্লাস ভেসে এল। বিমলের কোভিড-১৯ পরীক্ষার রেজাল্ট এবার নেগেটিভ এসেছে। কালো কলসীর মত সেই বস্তু নড়ে উঠল এবার, গা থেকে রশ্মি বের হওয়াও বন্ধ, দূর্বার আকর্ষণে মাখনকে টানছে। মাখন অভিভূত হয়ে বলল, “ঠাকুর! আমার বিমলকে তুমি বাঁচালে? তুমি ? ঠাকুর ! এতদিন পরে…” মাখন আর কথা বলতে পারল না, হাড়গোড় নিয়ে গড় হয়ে পড়ল।। কালো বস্তুটি এবার অস্পষ্ট উচ্চারণে কী সব বলল, মাখন তা পরিষ্কার বুঝতে পারল। সাথে সাথে মাখনের চেহারায় একটা শঙ্খুনি ভাব গজিয়ে উঠল, তার গন্না কেটে যাচ্ছে।
মাখন এক উড়ালেই ফিরে এল পাকুড়গাছে। মানবজীবনে যা ভূল বলে জেনেছিল, সব চুকে গেল। আলী এসে বসল পাশে। চাঁদ উঠেছে। চারদিক শান্ত। খোকন আর গদাই কোথায় যেন গেছে। বাবার মুখখানা একদৃষ্টে দেখতে লাগল আলী। এই তো সেই বাবা। আলীর মনে পড়ে গেল, এক হিন্দু জমিদারকে খাজনা দিতে পারেনি বলে বাবাকে বেধে রেখেছিল। রাজবাড়িতে বাবাকে দেখতে গেলে তাকেও বেধে রেখেছিল। দুদিন তারা কিছুই খায়নি। সুজাউদদৌলার নিয়োগকৃত সেই জমিদার খুব প্রভাবশালী ছিল। ছেলে না খেয়ে আছে জেনে বকস গাজী (এখনকার মাখন) ছটফট করে জমিদারের পায়ে পড়েছিল। তিন দিনের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করবে- অঙ্গীকার করার পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। তখন রাত হয়ে গেছে। ঘোজাডাঙার আকাশে বড় চাঁদ। ঘন আম বাগান দিয়ে আসতে গিয়ে খিদে আর তেষ্টায় আলী হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান! বকস গাজী কেঁদে উঠে তাকে কোলে করে পাশের শান বাঁধানো পুকরে নিয়ে হাতে করে পুকুরের জল খাইয়েছিল। তারপর আলীকে ঘাড়ে করে একটানা তিনঘন্টা হেঁটে বাড়ি।

আলী ভাবল, এক্ষুণি ওসব মনে করার দরকার কী? মন্ত্রীজীবনের কথা ভাবা দরকার, যদি আর একবার…”
মাখন জিজ্ঞেস করল, “আলী ! সেই লজেন্স খাওয়ার কথা মনে আছে তোর?”
“হ্যাঁ আব্বা, সে কথা কী ভোলা যায়! জমিদার বাড়ির বারান্দায় লজেন্স খাচ্ছিল তাদের এক মেয়ে, দেখে আমারও খুব লোভ হল, আমি চাইতেই তুমি কত গালাগালি শুনে একটা লজেন্স চেয়ে আমায় দিলে!”
“এবার সেই লজেন্সটা আমায় দে !” মাখনের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে, চোখে আগুন উসকে উঠছে যেন।
আলী ভয়ে বলল, “কী বলছ আব্বা!…আঃ…!”
গদাই আর খোকন ফিরে আসতে আসতে দেখল, আলীকে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে মাখন!

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

This image has an empty alt attribute; its file name is ttttt888-1024x200.jpg

লেখকের আরও লেখা

গল্প : মেঘলা সময় : বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

About S M Tuhin

দেখে আসুন

ইন্দ্রজিৎ : মৌলীনাথ গোস্বামী

গল্প ইন্দ্রজিৎ মৌলীনাথ গোস্বামী কখন লিখব! সময় কোথায়!- হতাশ হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে ভাবে …

5 কমেন্টস

  1. Like!! I blog frequently and I really thank you for your content. The article has truly peaked my interest.

  2. I like this website very much, Its a very nice office to read and incur information.

  3. Very good article! We are linking to this particularly great content on our site. Keep up the great writing.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *