রবীন্দ্রনাথ আছেন, রবীন্দ্রনাথ কী সত্যি আছেন : শুভ্র আহমেদ

রবীন্দ্রনাথ আছেন, রবীন্দ্রনাথ কী সত্যি আছেন

This image has an empty alt attribute; its file name is suv.jpg

শুভ্র আহমেদ

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

একজন বাংলা ভাষাভাষী মানুষ (নারী,পুরুষ ও ক্লীব) যদি কিছুটা লেখাপড়ায় (শুদ্ধস্বরে বলা,নির্ভুল পড়া ও লেখা) দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়ে ওঠার পর চিঠি লেখার তীব্র ইচ্ছায় খাতা কলম নিয়ে বসে আর যদি সেই চিঠি হয় প্রেমের ধারায় কোনোকিছু তাহলে রবীন্দ্রনাথ এখনো পর্যন্ত তার প্রধান এবং একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ছেলে- মেয়েরা যাদের প্রথম এবং প্রধান প্রেমাস্ত্র সেলফোন (মেসেঞ্জার, ভাইবার, হোয়াটস এ্যাপ, ইমো ইত্যাদি) তাদের ভাষা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মতো নয়।তবে প্রেমরসে যৌথসত্তা যখন একক সত্তায় রূপান্তরিত হয় ততোদিনে এইসব তরুণ -তরুণীর হৃদয় চত্বরে নতুন করে যে দেবতা অধিষ্ঠিত হয় তিনি হচ্ছেন সেই রবীন্দ্রনাথ।

সুকুমার বোধ,সুকুমার ভাবনা, সুকুমার সম্পর্ক, সুকুমার সামাজিকতা,সুকুমার বিরহ-বিচ্ছেদ,সুকুমার ভালো-মন্দ সুকুমার আত্মীয়তা ইত্যাদিতে আজও নিক্তির একপাশের বাটখারা সেই রবীন্দ্রনাথ।

বাংলার ছয় ঋতু আছেন রবীন্দ্রনাথ, নদ-নদী-হাওড়-বাওড়-বিল আছেন রবীন্দ্রনাথ, গ্রামীণ ভাবনায় শহর অথবা শহুরে ভাবাবেগে গ্রাম আছেন রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতি -অর্থব্যবস্হা-সমাজ-সংস্কৃতির বিবর্তনের ধারাবাহিকতা আছেন রবীন্দ্রনাথ, প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্য কী কী নেবো কীভাবে নেবো কী কী নেবো না তার পক্ষে -বিপক্ষে আছেন রবীন্দ্রনাথ। ভ্রমণে আছেন কুঁড়েমিতে আছেন, রঙ্গ-রস-রসিকতা-আড্ডায় আছেন কাজে-কর্মেও তিনি ধ্রুবতারার মতো ধ্রুপদ সত্য।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কী সত্যিই আছেন ?

সাহিত্য প্রসঙ্গে আসি
রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই তো বাংলা কবিতার বিশ্বজয়।অথচ সেই বাংলা কবিতার কবিদের উপর রবীন্দ্র প্রভাব কতটুকু ? সত্যি ভুতে যদি আমরা বিনষ্ট না হই তাহলে অযথাই ঘোরাঘুরি সাম্প্রতিক কবি ও কবিতার উপর রবীন্দ্র প্রভাব খুঁজতে যাওয়া। গত নব্বই বছর বাংলা কবিতার কবিদের উপর যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি, অন্তত প্রকরণ ও ভাষারীতির দিক দিয়ে তিনি হচ্ছেন জীবনানন্দ।

আবার ছোটগল্প নামক সাহিত্য প্রকরণের কথাই যদি ধরি,তাহলেও বলতে হয় বর্তমানে শুধু বাংলা নয় বিশ্ব-সাহিত্যেও সবচেয়ে অবহেলিত (বাণিজ্যিক ও চর্চা) এই ছোটগল্প নামক প্রকরণ। অথচ এই রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই একদা তার(ছোটগল্প) জয়যাত্রা সূচিত হয়েছিল; শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, বিশ্বজনীন ছিল তখন তার পদচারণা।

রবীন্দ্রনাথের বড়গল্পের জায়গাটির নিয়মিত দখল নিয়েছে ‘নভেলেট’ নামক চটি সাহিত্যের আত্মীয় স্বজনরা।

এবারে শিক্ষা শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
‘যুগান্তরের প্রতীক্ষায়’ শীর্ষক বক্তৃতায় শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ রবীন্দ্রনাথের স্মরণ নেন এভাবে, ‘যে ছাত্র পকেটে করে নকল নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকে, তাকে তোমরা হল থেকে খেদিয়ে দাও আর যে মগজের ভেতর চুরি করে নিয়ে ঢ়োকে তাকে তোমরা শ্রেষ্ঠ ছাত্রের সন্মান দাও, এ কেমন শিক্ষাব্যবস্হা?’ এটা ছিল শিক্ষার নীতি নির্ধারনী বক্তৃতা। সৃজনশীল শিক্ষা ভাবনার শুরুতে রবীন্দ্রনাথের স্মরণ নেয়া থেকে বোঝা যায় আমাদের বর্তমান সরকার প্রবর্তিত শিক্ষা কাঠামো যেমন হোক না কেনো এর মূল লক্ষ ও উদ্দেশ্যের সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার গবেষণাগার তার শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্ব সংস্কৃতির সাথে বাংলা সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত শিক্ষা, এবং এর মাধ্যমে মানবহিতৈষী, দক্ষ, দেশপ্রেমিক, মুক্তচিন্তার সৌমিত্র মানুষ তৈরী করতে। রবীন্দ্রনাথ সেজন্য দেশ-বিদেশের কবি, শিল্পী, চিন্তক, বিজ্ঞানী প্রমুখদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তার প্রতিষ্ঠানে। উদ্দেশ্য ছিল মানুষ তৈরী। রবীন্দ্রনাথকে আমরা নিলাম, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত সবজায়গায় নিয়োগের মাপকাঠি করা হলো রাজনৈতিক আনুগত্য অথবা অর্থবিনিয়োগে পদ পদবি সমূহের বাণিজ্য। ফল যা হবার তাই হচ্ছে। সৃজনশীল শিক্ষার নামে নোট গাইড নির্ভরশীল এমন এক ভবিষ্যত প্রজন্ম পরম্পরা তৈরী হচ্ছে যারা শুধু অদক্ষই নয়, চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থান্ধ, অপ্রগতিশীল এবং সাম্প্রদায়িক। এ তাহলে কোন রবীন্দ্রনাথকে আমরা নিলাম।

অর্থব্যবস্থা
রবীন্দ্রনাথ ব্যাংক করেছিলেন, কৃষকদের ঋণ দিয়েছিলেন এবং সে ঋণেন টাকা আদায় না হওয়ার শেষপর্যন্ত ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। এখন বাংলাদেশের কৃষকদের কাছ থেকে শতভাগ ঋণের টাকা আদায়ের পরেও ব্যংকগুলোর দেউলিয়াদশা কাটছে না,অথবা তার (ব্যাংকগুলোর)নতুন জীবনের ভরসায় প্রতিনিয়ত নিতে হচ্ছে সরকারি প্রণোদনা।রবীন্দ্রনাথ ঋণের টাকা আদায়ের ব্যাপারে ততোখানি উৎসাহী ছিলেন না , কারণ তিনি জানতেন টাকা পরিশোধের পরিস্থিতি সে-সময় কৃষকদের ছিলো না। কিন্তু এখনতো তাদের লোভ, তাদের দুর্নীতি, তাদের অদক্ষতাই ব্যাংকের দেউলিয়াত্বের কারণ যাদের হাতে রয়েছে এর রক্ষনাবেক্ষন,পরিচালনার দায়িত্ব। অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আমলা, অর্থনীতিবিদ সকলেই ঘটা করে রবীন্দ্রনাথ কেনেন, রবীন্দ্র জয়ন্তীর উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজনে নেন বিশেষ ভূমিকা।

সম্প্রতি নৃপেন দা’র (কবি নৃপেন চক্রবর্তী) সাথে কথা হচ্ছিল টেলিফোনে। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বর্তমান করোনা পরিস্থিতিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে তুলনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইউরোপ নিয়েও অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। আমি অবশ্য অবরুদ্ধ ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের সেদিনের কর্মকাণ্ডের কথাই বেশি ভাবছিলাম,সেইসাথে ভাবছিলাম বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে আমাদের কী করনীয় , জনপ্রতিনিধিরা কী করছেন, কীভাবে করছেন ইত্যাদি নিয়েও।সেদিন ফরাসি- স্পেনিশ বুদ্ধিজীবী বিশেষত জ্যাঁ পল সাত্রে, আলবেয়ার কামু, দোরা মার,মিশেল আর লুইস লেরি,সিমন দ্য বেঁভোয়া, পিকাসো প্রমুখ যখন কিছু একটা করে মুক্তি খুঁজছিলেন তখন কিন্তু কিছু লোক দখলদার নাৎসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, নিশ্চয়ই কোনো একটা সুখের বিষয় ছিল সেটা,অন্তত তাদের কাছে যারা ছিল আসলে মানুষরূপী এক একজন দানব।করোনার কারনে আজ যখন লকডাউনে সকলে অবরুদ্ধ তখন অনেককেই বলতে শুনছি দু’এক সপ্তাহের খাবার মজুদ নেই এমন পরিবার আবার আছে নাকি, অথচ এদেশের দিনমজুরের শতকরা হার কত তা নিয়ে বিগত দিনের সেমিনার সিম্পোজিয়ামে তাদের তুলনাহীন বাকপটুতার ছবি খুঁজতে খুব একটা কষ্ট হওয়ার নয়।এমনকি আজ যখন সরকারি ত্রান বিতরণের নামে চলছে চাল,ডাল,চিনি,তেল চোরদের রামরাজত্ব তখন প্রশ্ন জাগে এই শিক্ষা তারা কোথা থেকে পেলেন ? এরা নিশ্চয়ই একা নয় কারণ এদেরতো আমরাই নির্বাচিত করি,নিয়োগ করি,পদায়ন করি। এইসব দানব সদৃশ কর্কটরাশির জাতকরা যতদিন আছে ততোদিন কী বুকে হাত দিয়ে আমরা বলতে পারবো রবীন্দ্রনাথও আছেন ?

থাকা না থাকার দ্বন্দ্বে এই যে রবীন্দ্রনাথ এটাই বা কম কিসে ? বিশেষত সার্ধশতবর্ষ পার করে একটু একটু করে যখন তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন(এ বছর পালিত হচ্ছে ১৫৯ তম জন্মদিন) দ্বিশত জন্মদিনের ফলক স্পর্শের দিকে।

তবু বলবো,রবীন্দ্রনাথ সত্য হলে আমরা সত্য হই,রবীন্দ্রনাথ সুন্দর হলে আমরা সত্যিকার অর্থেই সুন্দর হই,রবীন্দ্রনাথ আলোকিত হলে আমরাও আলোকিত হই।রবীন্দ্রনাথের আলোকিত পথে চলার অভ্যাসই পারে অন্য অনেক নতুন আলোকিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ।

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

শুভ্র আহমেদ

জন্ম : ০৩ অক্টোবর ১৯৬৬

প্রকাশিত বই

কার্নিশে শাল্মলী তরু : কবিতা : ১৯৯৯, আড্ডা
বিচিত পাঠ : প্রবন্ধ : ২০১৪, ম্যানগ্রোভ
বলা যাবে ভালোবেসেছি : কবিতা : ২০১৫, ম্যানগ্রোভ
দুই ফর্মায় প্রেম ও অন্যান্য কবিতা : কবিতা : ২০১৬, ম্যানগ্রোভ
রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বাঁশি বাজিয়েছেন এবং অন্যান্য : প্রবন্ধ : ২০১৯, ম্যানগ্রোভ

পুরস্কার / সম্মাননা
কবিতাকুঞ্জ সম্ম্ননা (১৪০৮ ব)
বিজয় সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯)
কবি শামসুর রাহমান পদক (২০১০)
দৈনিক কালের কণ্ঠ শিক্ষক সম্মাননা (২০১২)
কবি সিকানদার আবু জাফর স্বর্পদক (২০১৪)

>> কবিতা । অভিসার পর্ব : শুভ্র আহমেদ

About S M Tuhin

দেখে আসুন

এ পৃথিবী একবার পায় তারে : বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

শুভ জন্মদিন : সত্যজিৎ রায়বিশেষ নিবেদন এ পৃথিবী একবার পায় তারেবাবলু ভঞ্জ চৌধুরী সত্যজিৎ রায়ের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *