কবিতা : রোকেয়া ইসলাম

রোকেয়া ইসলাম

বিকেলটা শুধু উষ্ণতা খোঁজে

টুপ করে সন্ধ্যার শরীরে ডুবে যাওয়া বিকেল
নিবিড় উত্তাপে হাত বাড়ায় স্রেফ উষ্ণতার জন্য
গল্পের ঝাঁপিরা অজানা অচেনা অন্য
মরচে ধরা ফেডেড জীবন বয়ে চলে
ফ্ল্যাপহীন নীল কষ্টের বাইসাইকেল।

তুষের অদেখা অনল জানান দেয়
শুভ্র শীতলতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত পৌষের রাত
ভিজছে কাঠগোলাপ ভিজছে কৃষ্ণচূড়া
ভিজছে নিয়নবাতির ধুলিময় শহর
শিশিরের মোহমায়ায়।

দুয়েকটি ব্যতিক্রম অনাঘ্রাত অভিজাত
পরিযায়ী খেঁচর জীবন উন্মুখ উম প্রার্থনায়
উষ্ণতার দরজায় কলিংবেলের অবিরত ঘাঁত
একান্ত প্রয়োজন এবং উষ্ণতার সে এক প্রবল আকাঙ্ক্ষায়।

থেমে থেমে বেজে ওঠে শুদ্ধ বিলাবল
সে সুরও ঢেকে গিয়ে ক্রমাগত প্রখর শীতল দীর্ঘশ্বাস
বেঁচে থাকার সমার্থক নামকরণ হয়তো শ্বাসপ্রশ্বাস
বিলাবল, দীর্ঘশ্বাস, শ্বাসপ্রশ্বাস
রঙিন পাল উজানে উড়িয়ে যুগল।

ঘাসের সবটুকু উত্তাপ নিয়ে সুদীর্ঘ রাতের হীম
উৎসবে নাম নিয়ে ভায়োলিন
উত্তরের খোলা জানালা নিশ্চুপ চোখ বোজে
বিকেলটা শুধুই উষ্ণতা খোঁজে…

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

ষ্টেশনহীন আন্তঃনগর জীবন

মাতাল রোদের দুপুরে প্রদীপ্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে
স্মৃতির ঝাপসা দুয়ারে কলিং বেল বাজায়
নিতান্তই অবয়বের বিরূপাক্ষ
অমলিন এক বৃক্ষ।
কি যেন তার নাম ?! কেমন দেখতে সে ?!
যার প্রলম্বিত ছায়া প্রথম প্রেম হয়ে
জেগে থাকে আমার নির্ঘুম রাতে-
অনায়াসে…
কিছু শুকনো পাতা ওড়ে দীর্ঘশ্বাস সখ্যে
আমার হৃদপিণ্ডে শব্দের ভেতর একটিই কবিতা
ধলেশ্বরী আমার বর্ষা- প্রিয় প্রবহমান
জলে তার সুরেলা আলোর বারতা
নদী মানেই বেঁচে থাকা, নদী জলেই শেষ অনুপ্রাণ।
অন্ধকারে নূপুর নিক্কণ ছন্দ তোলে
মগ্ন প্রাতে নিশি কাব্য
আজকের বিশ্বায়নের দুর্দান্ত সময়ে
হয়তো শহরটির সারল্য মুখে চর্চিত রঙ প্রলেপ
খানিক অচেনা, খানিক অভব্য।
ছোট্ট শহরটিকে থেমে থেমেই মনে পড়ে
ঐ তল্লাটের নিঃসঙ্গ নীম–
সবুজ পাতা ঝেড়ে ফেলতে ব্যস্ত
হলুদে শিশিরের সুবাসিত স্পর্শ
ত্রিবেণীর ওপারের হুগলি’- আজও অবিন্যস্ত…
রূপবতী গোলাপের দুর্দান্ত প্রতাপে
রুপনারায়ণ ভাগীরথী আর হুগলির সঙ্গমে
গেঁয়োখালি গ্রাম
একটু কান পেতে শোন,
সকাশে অবাক কীর্তন অষ্টপ্রহর, সকাশেই অবিরাম…
প্রথম প্রেমের বৃক্ষটি কর্পোরেট বাসিন্দা
ধলেশ্বরীর বুক জুড়ে বাতাসে অবিরত বাজে
বেহালার ছড় ছুঁইয়ে নিবিড় গান;
আমার মন আর চোখ দুটোতে আজ দারুণ বৈরিতা
ভেবে নেই স্ববিরোধী স্বনিন্দা
ভেবে নেই প্রতিনিয়ত সংসার সন্ন্যাসের পলাতক ঋষি
তবুও
দ্রুম, জনপদ আর জল জাগিয়ে, বাঁচিয়ে রাখে দিবানিশি
ফেলে আসা প্রহরেই ভাবনা, ছেড়ে আসা প্রহরেই প্রণাম…

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

প্রতিশোধের প্রগাঢ় আইসোলেশন

সবুজ বার্তা পেয়ে সমুদ্রের হয়েছে
ডলফিন, কাঁকড়া বা কচ্ছপেরা
গোলাপী, লাল আর কালো আবরণে
যে যার আবীর বেছে নিয়েছে।
দল বেঁধে আসা যাওয়ার সৈকতে
বংশধর বিছিয়ে দেয় নিপুন দক্ষতায়
নির্বিঘ্ন ভূমিতে আনন্দ উল্লাসে
ভয়হীন চোখ নতুন পৃথিবীর চিত্রাঙ্কন
চিরায়ত নৈঋতে।
ঝাউয়ের শাখায় শাখায় ধ্রুপদী নৃত্য
প্রাচীন বৃক্ষেরাও আজ সঙ্গ সঙ্গীতে মত্ত
নবীনেরাও মাথা তোলে ঐক্যতানে
দুষনের নদীগুলো ভুলে গেছে–
নগর, নাগরিক ধর্তব্য।
পুরোনো ব্যথা আর অপমানের প্রগাঢ় কান্নায়
আকাশে আজ নেই অবরুদ্ধ কালো নেকাব
অভিমান ভুলে প্রিয় নীল চোখ দেখে
আজ অনুপস্থিত শুনশান দঙ্গল-
অনুপস্থিত জাগতিক অন্যায়।
পূর্ণ তেজে সূর্য মোহনীয় পূর্ণিমা
সমুদ্র তার সবটুকু সম্ভার নিয়ে আমাদের ছিল
নদী আর বৃক্ষেরা দেবী অন্নপূর্ণা
মেঘ আর রোদের সাথে সূর্য চন্দ্রের মিতালি
আকাশ ছিল আমাদের প্রেম, আকাশের গায়ে নীল জামা।
রোদ যৌবন আর বৃষ্টিই ভরসা
তবে সপ্তর্ষি মণ্ডলের যুদ্ধাস্ত্র তাক কেন?
অণুজীব ফিরে যাও
পরম প্রিয় গ্রহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শ্লোগান-
এই নয় শেষ, বেঁচে থাকার হাপিত্যেশ…

রোকেয়া ইসলাম

জন্ম : ৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৯

প্রকাশিত গ্রন্থ
স্বর্গের কাছাকাছি । আকাশ আমার আকাশ । ছুঁয়ে যায় মেঘের আকাশ ।
তুমি আমি তেপান্তর । তবুও তুমিই সীমান্ত । জ্যোৎস্না জলে সন্ধ্যা স্নান ।
সূর্যে ফেরে দিন দীপ্র তাজরী । আপুজানের কথা । সৌর ও দাদির গল্প
একবার ডাকো সমুদ্র বলে অতঃপর ধ্রুবতারা ।

মোট পয়ত্রিশটি টিভি নাটক রচনা করেছেন। দুটি চলচ্চিত্রের কাহিনী রচনা করেছেন

পুরস্কার ও সম্মাননা
নজরুল সম্মাননা । অরণি গল্প প্রতিযোগিতা পদক । অপরাজিত কথা সাহিত্য পদক ।
কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় পদক । টাংগাইল সাহিত্য সংসদ পদক

লেখকের আরও লেখা

আব্বাস আলী আকন্দের একদিন : রোকেয়া ইসলাম

About S M Tuhin

দেখে আসুন

কবিতা : আশুতোষ সরকার

আশুতোষ সরকার আজ আমি কোথাও যাবােনা আজ আমি কোথাও যাবােনা আসুক যতই কর্তব্যের অমােঘ ডাকসুবেহ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *