নতুন পোস্ট

এ পৃথিবী একবার পায় তারে : বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

শুভ জন্মদিন : সত্যজিৎ রায়
বিশেষ নিবেদন

এ পৃথিবী একবার পায় তারে
বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

সত্যজিৎ রায়ের শিল্পকর্ম সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। বিশ্বব্যাপী এ নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে, আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে আমার অনুভূতি আমার কাছে নতুন। একটি অনভিজ্ঞ শিশু যেমন সূর্য দেখে অভিভূত হয়; সেই অনুভুতিটা যেমন শিশুটির কাছে নতুন, সত্যজিৎও তেমনি আমার কাছে নতুন। আজকের শিশু আগামীতে যারা সত্যজিৎকে দেখবে, শুনবে, পড়বে, জানবে-তাদের প্রত্যেকের কাছে সত্যজিৎ নতুনভাবে আবির্ভূত হবেন। কারণ তাদের আস্বাদনে সত্যজিৎ নামের যে নতুন স্বাদটি তৈরী হবে, তা তারা আগে চাক্ষুস করেনি।

সত্যজিৎ সম্পর্কে আমার অনুভূতি যথাযথভবে ব্যপ্ত করার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ তা এতো বহুবিধ আবেগের সমাহার যে, তাকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। সঙ্গীতের মুর্ছনা যেমন অব্যাখ্যেয়, তেমনি।

ইলাস্ট্রেশনের কথা বাদ দিলাম, শুটিং-এর কথা বাদ দিলাম, ফিল্ম এডিট করার কথা বাদ দিলাম, সুর সৃষ্টি, মিউজিক কম্পোজ, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে শব্দ তেরী, আলো-ছায়া নিয়ে ভাবনা, সম্পাদনা, লেখা ভালো হলে ফ্রিতে অলংকরণ করে দেওয়া, দুস্থ কিন্তু ভালো লেখকদের জন্য প্রকাশককে বলে দেওয়া, নিজ উদ্যোগে নিরুৎসাহি লেখকদের লেখা কম্পোজ, বই প্রকাশের জন্য গেটআপ-মেক-আপ করে দেওয়া -সব বাদ দিলাম। শুধু তাঁর লেখনি, আর ফেলুদা’র থিম মিউজিকটির কথা বলি। মাঝে মাঝে মনে হয়, শুধু এ দুটি নিয়েই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা যায়।

নিজে কখনও নন-ফিকশন লেখেন নি। লিখেছেন সব ফিকশন। ফেলুদা, তারিনি খুড়ো, প্রফেসর শঙ্কু । কিন্তু নন-ফিকশন সিনেমা করেই হয়েছেন জগতখ্যাত; পথের পাঁচালি, মহানগর, অশনি সংকেত। দুটোতেই সিদ্ধ হস্ত, সমান পটু। তাহলে কেন তিনি নন-ফিকশন লিখলেন না? তিনি দুভিক্ষ দেখেছেন, দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। দারিদ্র, শ্রেণী বৈষম্য, পরাধীনতা, মালিক-শ্রমিক সংঘাত দেখেছেন, খুব ছোট থেকে নিজে ছিলেন পিতৃহারা, পিতার লেখা- আঁকা আর এর-ওর কাছ থেকে শুনে তিনি পিতাকে চিনেছেন। নন-ফিকশন লিখলে এসবই আসত তাঁর লেখনিতে। কিন্তু যাপিত জীবনের পরতে পরতে যে অদেখা কথকথা থাকে, সাহিত্যে তা তুলতে না পারলে, ভালো সাহিত্য তো তাকে বলেই না, অন্যদিকে পাঠকমাত্র তাতে আকৃষ্ট হয় না। চোখের সামনে দৈনন্দিন যে হাহাকার দেখছি, তারই সাদামেটা বর্ননা ও দুএকটি কাহিনি বইয়ের পাতায় বেশিক্ষণ কেউ দেখে না। সবাইতো শরৎ-বিভূতি-মানিক-সুনিল হবে না। বরং পাঠের যে আনন্দ রস আছে, সেটাই আগে বিবেচনা করতে হবে। সেই রস দিয়ে পাঠকের কল্পনা রেখা ভাঙতে পারলেই তারা এক একখান মানব সম্পদে পরিণত হবে। পাশ্চাত্যের ভালোটা তিনি জানতেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান-কর্পোরেট চিন্তা। পারিবারিক সন্দেশ পত্রিকা পুনরায় বের করতে যেয়ে তাঁকে লিখতে হত। পত্রিকাটি শিশু-কিশোরদের। পাঠের আনন্দ তৈরী করে শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্কের কসরৎ বাড়ানো আর কল্পনার পরিসর বাড়ানোই তাঁর উদ্দ্যশ্য ছিল। যাতে আগামীতে এই শিশুরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে, চিন্তা-দর্শনে স্বযংসম্পূর্ণ হতে পারে। নিজেদের করণীয়, ভালো-মন্দ নিজেরাই ঠিক করতে পারে, পাশ্চাত্যমূখী যাতে না হয়ে থাকতে হয়। তাহলে দুর্ভিক্ষ-ক্ষুধা-মন্দা-বৈষম্য পীড়িত জাতি উঠে দাঁড়াবে। প্রফেসর শঙ্কু, তারিনি খুড়ো, ফেলুদা-সেই প্রচেষ্টার ফল।

করোনার এক দুঃসহ সময় কাটছে আমাদের। এ থেকে মুক্তির পথ আমরা এখনও খুঁজে পাইনি। অনিশ্চিত জীবন, কর্মহীন হয়ে পড়া ক্ষুধার্ত মানুষের কাতার, হঠাৎ করেই সব এলোমেলো করে দিয়েছে। ভাবি, মানুষের শক্তিটা কোথায়? সকল বাঁধা, সীমাবদ্ধতা, অসহায়ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শক্তিটা কী? কাজে, জ্ঞানে, ধী-শক্তিতে? না অদৃষ্টের উপর সমর্পণে? যে মানুষ মরে যাচ্ছে চিকিৎসা দিতে পারছি না, যে মানুষ কাজ হারাচ্ছে কাজ দিতে পারছি না, যে মানুষ ক্ষুধার্ত খাবার দিতে পারছি না-খালি খালি জ্ঞান দিলে কাজ হবে? চাই ফলপ্রসূ কাজ; এবং তাৎক্ষণিক। সে শক্তি আমাদের নেই। সেই শক্তির জন্য চাই অন্য পথ, অভূতপূর্ব পথ, অশ্রুতপুর্ব পথের কাহিনি। কে দেখাতে পারে সেই পথ? কে খুঁড়তে পারে সেই অদৃষ্টপথের সুড়ঙ্গ? যেই পারুক না কেন, নিশ্চিতভাবে সে একজন শিল্পী, ঈশ্বরের মত নিখুঁত শিল্পী। সে অর্থে একজন রাজনীতিক শিল্পী, একজন সমাজবিজ্ঞানী শিল্পী, একজন চিকিৎসক শিল্পী, একজন বিজ্ঞানী শিল্পী, একজন ব্যবসায়ী শিল্পী, একজন চাষী শিল্পী, একজন ষ্বপ্ন-কল্প জাগানিয়া ব্যক্তি শিল্পী। শিল্পীর মূলত কাজ গড়া, গড়ন-শৈলী অশেষ, যখন যেভাবে প্রয়োজন-গড়তে পারাই শিল্পের শিক্ষা। প্রয়োজনে যথার্থ গড়নটা যেন হতে পারে, তাই উপরোক্ত শ্রেণীর মানুষগুলোকে শিল্পী বলা হচ্ছে। এবার আসি ‘না-বাদী’দের কথায়। পৃথিবী যদি দুঃখের হয়, যদি অসহায়ত্বের হয়, আমরা ক্রমাগত আমাদের অসহায়ত্বকে দেখার জন্য এগিয়ে যাই-এমনও যদি হয়, তবে সেই অসহায়ত্বের মুখে ছোট্ট পদাঘাত করাই কি আমাদের জয়ের আনন্দ দিতে পারে না? সেই আনন্দটি পেতেও শিল্পবোধের দরকার।

এ কথাগুলো এখন আসার কথা নয়। আসছে বন্দীদশা থেকে। কিংকর্তব্যবিমূড় অবস্থা থেকে। বন্দী মানুষ দেওয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখে। আর হতের কাছে এমন কোন মানুষের উদাহরণ যদি থাকে, যাঁর শক্তিমত্তার তারিফ করলে শান্তি লাগে, এই বন্দিত্ব থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে প্রণোদিত হওয়া যায়, এই মুহুর্তে সত্যজিত রায়ই আমার কাছে সেই মানুষ। নিজ ক্ষেত্রে বিচিত্র ও বহুবিধ শিল্পসৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানবের সীমা ভাঙার যে শক্তিটি দেখিয়ে গেছেন, আজকের দিনে যে যার অবস্থানের ক্ষেত্রেও সেরা কাজটি করতে তা থেকে উদ্বুদ্ধ হওয়া যায় বৈকী। সকল নিরাশাকে থোড়াই কেয়ার করে নিজেকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে তিনি যে জগতটি সৃষ্টি করেছেন, তা এই জগতেরই সমান্তরাল। এই জগত সেই জগতকে ভ্রুকুটি দেখাতে পারে না। কারণ আমাদের এই বাস্তব জগত এখনও সত্যজিতের সেই জগত থেকে ভিন্নরুপে নিজেকে দেখাতে পারেনি। এখনও অপার রহস্য, এখনও পথের বাঁকে বাঁকে পথ খোঁজা, এখনও ক্ষুধা-শোষণ, এখনও হীরক রাজার আত্মা-লালন, এখনও কল্যানকামী আবিষ্কারের বার্তা বহন ইত্যাদি এই বহির্জগতে বিদ্যমান। তাই বলা যায়, সত্যজিতের জগত আর এই বহির্জগতে একটা মিল রয়েছে, তা অন্তসারে হোক, আর অন্তনিঃসারেই হোক।

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

About S M Tuhin

দেখে আসুন

গল্পগুলো যখন খুলে দেয় বোধের কপাট : শুভ্র আহমেদ

গল্পগুলো যখন খুলে দেয় বোধের কপাট শুভ্র আহমেদ এক গল্পলেখক-গল্প-গল্পপাঠক, এই তিনটিকে যদি স্বতন্ত্র বিন্দু …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *