নতুন পোস্ট

পাঠের আনন্দ । বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর গল্পগ্রন্থ ‘শালিকবুড়ো ও ফড়িং’

ম্যানগ্রোভ সাহিত্য নির্বাচিত বই
বই আর বই

পাঠের আনন্দ বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর গল্পগ্রন্থ ‘শালিকবুড়ো ও ফড়িং’
আহমেদ সাব্বির

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরির লেখা গল্পের বই ‘শালিক বুড়ো ও ফড়িং’ বইটি পড়ি পড়ি করেও পড়া হয়ে উঠছিল না। অবসরের অভাব হতে পারে। অলসতা হতে পারে। অবহেলা হতে পারে। আসলে তা নয়। ভালো রান্না যেমন আয়েশ করে না খেলে অতৃপ্তি থেকে যায়। মাছের মাথাটা ভালো করে চিবিয়ে চিবিয়ে ছাতু বানাতে হয়। হাড়ের ভিতরে যে মজ্জা থাকে সেটা সুড়ুৎ করে টান দিয়ে বের করে আনতে হয়। ডালনার ডাঁটাটা চুষে ফোঁড়ঙের ঘ্রাণ নিতে হয়। তড়িঘড়ি করে খেলে কেবল পেটই ভরে। তৃপ্তির স্নিগ্ধ ঢেকুর আর উঠে না।

পছন্দের বই পেলে আমি একটু সময় নিই সময় বের করার জন্য। মনোযোগ নিয়ে দিয়ে না পড়লে অস্বস্তি হয়। একটা অপরাধবোধ খোঁচাতে থাকে। ঘটনার ঘণঘটা, বর্ননার মাদকতা, ছন্দের দোলা, বাক্যের বুনন এবং লেখকের উপস্থিতি খঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমি অনুভব করি। খুব খুঁত খুঁতে ধ্যান মগ্ন পাঠক আমি। পাঠে আমার সর্বগ্রাসী তৃষ্ণা।

দৈনন্দিন জীবনে আমরা জটিলতা এড়িয়ে বাঁচতে চাই। মরতেও চাই সরল সমীকরণে। যেখানে সহজলভ্য সেখানেই আমাদের বাহাদুরী। ছোট ছোট সহজ বিষয়ে আমরা অনেক সময় ধান ভানতে শীবের গীত করি। কিন্তু ধান আর চাল হয় না। শালিক বুড়ো ও ফড়িং গল্পে বুড়োর চরিত্রকে আমার তেমনই মনে হয়েছে। একটা ফড়িং ধরার জন্য বুড়োটার কত আয়োজন। মনে হয় বাঘ ধরতে ঢুকেছেন। বুড়োটা নিজের নামটা হারিয়ে শালিকবুড়ো হয়েছেন তার এই অতি আয়োজনের কারণে। শালিক যেন বুড়োর ঘাড়ে চেপে বসে গেছে। বাবলু গল্পটা শুরু করেছেন এভবে-

‘এক ছিল বুড়ো। তার ছিল এক শালিক। তাই তার নাম শালিক বুড়ো’

তিনটি বাক্য সেদিনই আমাকে গল্পের মধ্যে ডুবিয়ে নিয়েছিল। হঠাৎ একদিন অবসর পেলাম। গল্পের বইটা পড়তে শুরু করে দিলাম। কিভাবে কতক্ষণ পড়েছিলাম মনে নাই। শুধু বইটার শেষ পাতা শেষ করে একটা তৃপ্তির একটা ঢেকুর উঠেছিল। আহ! কী সুন্দর। কী সাবলীল। সন্দেশ যেমন মুখে দিতেই আঁশ ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে যায় মুখের মধ্যে। ঠিক তেমনি।

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর শালিক বুড়ো ও ফড়িং বইতে আরো এগারটা গল্প আছে। একেকটা গল্প একেক স্বাদের। গল্পের কলকব্জা খোলার আগে তার লেখার ধরণ সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে বিষ্মিত হয়েছি। বৈঠকী ঢঙে তিনি গল্প বলেন। ছেলেবেলায় দাদু-নানুদের মুখে ঘুম পাড়ানিয়া রূপকথার মতো। গ্রাম বাংলার লোকজ উপদানরসে তার গল্পরা টইটম্বুর। বাক্যের সরল চাকা তিনি গড়িয়ে দেন গল্পের ভিতর দিয়ে। গল্প গড়াতে থাকে গুড়গুড় করে। শেষের দিকটা আরও জমিয়ে তোলেন কৌতুকপুর্ণ যুক্তি-তর্ক দিয়ে। মনে হয় গল্পে সেই বিড়ালটি, টিকটিকিটি, ব্যাঙ, টুনটুনিটি আমি-আমরা।

গল্পে প্রাণিকূলের নানা চরিত্র ছোট ছোট সংলাপের মধ্যদিয়ে রঙ ছড়াতে থাকে। প্রকৃতি ও প্রাণি গল্পগুলোর মূল চরিত্র হলেও সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটে ওঠে নিপুন দক্ষতায়। রস, রোমাঞ্চ আর রহস্যে তিনি জমিয়ে তোলেন গল্পের আসর। ফড়িংবুড়ো যেমন লাঠির মাথায় আঠা দিয়ে ফড়িং ধরে সেই ফড়িং খপ করে কাচের বোতলে পুরে দেন, তেমনি পাঠক তার কথার আঠায় আটকে গল্পের বোতলে বন্দী হয়ে যায়। শালিকের পেটে যাওয়ার আগে ফড়িং যেমন বুড়োকে বুড়োর বিড়ালকে বোকা বানিয়ে ফুড়–ৎ হয়ে গিয়েছিল আমি পাঠক তেমনটা পরিনি। তাই সময় পেলেই বইটা নিয়ে পড়তে থাকি।

গ্রন্থে বারটা গল্পের নামগুলো আশ্চর্য ধরণের। পড়লেই হাসি পায়। আসল মামা, গোল থামানো গোল, ঢ্যাঙ ঢ্যাঙের বুদ্ধি, পিপির মেয়ে লিকা, উম চিকি চিকি আরও কত। সবটা বলে দিলে চলবে না। লেখকের সঙ্গে পাঠকের দূরত্ব তৈরি করতে চাই না। বাবলু চেয়েছেন শিশুদের নকল উৎসবের ভিঁড়ে কিছুটা শিকড়ের রস নিংড়ে দিতে। এ সময়ের শিশু কিশোরদের ক্রমশঃ দূরে সরে যাওয়া, মিডিয়ার সহজলভ্যতা ও সম্পর্কের বক্রতা লেখককে এমন মাটিমাখা গল্প লিখতে প্রাণিত করেছে। তিনি বাংলা ভাষার সুদীর্ঘ প্রাচীন পথে নতুন বৈচিত্রের ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলেছেন।

আসল মামা গল্পটা একটা সাপ আর একটা ব্যাঙের বুদ্ধির লড়াই। উদ্বাস্তু ব্যাঙ আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে ক্ষুধার্ত সাপের সামনে। সাপ ব্যাঙকে গিলে খাবে। আর ব্যাঙ নিজেকে বাঁচবে। সুকুমার রায়ের মুর্খ মাছি, ফসকে গেল কবিতা, উপেন্দ্র কিশোরের টোনটুনির গল্প জসিম উদ্দীনের গ্রাম বাংলার হাসির গল্প-য় যেমনটি খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যাঙকে খাবে বলে সাপ কত ফিকির খোঁজে। ব্যাঙ সাপের চোখে সন্দেহের চোখ রেখে পালানোর পথ খুঁজতে থাকে। উপরে নারকেল গাছে মামা বসে আছে বলে লোভ দেখায় দুজনেই। মামা খোাঁজার ফাঁকে সাপ গিলে ফেলে ব্যাঙকে। কিন্তু আসল মামাই শেষ পর্যন্ত ব্যাঙকে উদ্ধার করে সাপের পেট থেকে।

শিশু-কিশোরেরা সব সময় রোমাঞ্চিত হতে পছন্দ করে। জয়-পরাজয়, বুদ্ধির লড়াই, বীরত্ব শিশুমনে আলোড়ন তোলে। শিশুরা খেলতে খেলতে শেখে। শিখতে শিখতে বড় হয়। সুন্দরের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ থাকে সবসময়। ওদের রঙিন চোখে জাদুর মার্বেলগুলি, স্বপ্নের বেলুনগুলি ছড়িয়ে উড়িয়ে দিতে পারলেই ওরা খুশি হয়। কার্টুন, কমিকস আর স্মার্ট ফোনের মোহে শিশুকিশোরেরা পড়তে চায় না। ডিসপ্লের রঙিন ছবি ওদের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ওরা গিলতে শেখে। ভাবতে শেখে না। বীরপুরুষ, কাজলা দিদি, ডালিমকুমার আজকের শিশুদের কাছে ভিড়তে পারে না। রূপকথার হিরামন পাখি, ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী, আলাদিনের দৈত্য, বুড়ো আংলা, নালক, ক্ষিরের পুতুল, চাঁদের পাহাড় ওদের মনোজগত থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। চোরাবালির অতল থেকে বাবলু ভঞ্জ চৌধুরি সেই সব মণি-কাঞ্জণ-জহরতের ঠিকানা খুঁজতে বেরিয়েছেন। গল্পের ছলে তিনি সেই জাদুকাঠিগুলোই ব্যবহার করেছেন সুনিপুন কৌশলে।

উম চিকি চিকি একটা তুলতুলে পাখির ছানার গল্প, ছানার নাম তোসো। যে কিনা উড়তে শেখেনি। ডাকতে শেখেনি। উড়তে শেখার অদম্য ইচ্ছা তোসোর ছোট্ট বুকে ভর করে। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সে একসময় উড়তে শিখে যায়। এই গল্পের মূল সারকথা মনে হয়েছে ‘আমরা করব জয় একদিন’।

বাবলুর গল্পগুলো আমাদের পরিবারের, সমাজের, সময়ের গল্প। মুহুর্তের প্রতিকুলতাকে ইচ্ছা শক্তি দিয়ে জয় করার গল্প। পিপির মেয়ে লিকা গল্পটি এক পিঁপড়া মা ও মেয়ের গল্প। মায়ের স্বপ্নকুঁড়ি পিঁপড়া মেয়ের জীবনে ফুল হয়ে ফুটল যখন, তখন মা পিপি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। এই গল্পের মধ্যে দিয়ে লেখক একটা মিথকে পুনর্বিন্যাস করতে চেয়েছেন।

ঢ্যাঙ ঢ্যাঙের বুদ্ধি টিকিটিকি ও মোরগের গল্প। নাম শুনলেই পেটের মধ্যে হাসি গুড়গুড় করে ঠেলে ওঠে। খোঁড়া যুক্তি দিয়ে আমরা প্রতিদিন নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে চেষ্টা করি। আমরা কাজে বড় নাকি কথায় বড়, শরীরে বড় নাকি বুদ্ধিতে বড় তার হিসাব রাখিনা। আমাদের নজর কেবল নিজেদের ওজন নিয়ে। দুই পাঅলা মোরগ আর চার’পা অলা টিকটিকির অসম লড়াইয়ে টিকে থাকার গল্প রঙেরসে রাঙিয়ে তুলেছেন লেখক।

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর প্রত্যেকটি গল্প বুদ্ধিদীপ্ত, হাস্যরস আর শিশুশিক্ষায় ঠাঁসা। বড়রা বইটা পড়লে তাদের ঝাপসা চোখে ভেসে উঠবে সেই ফেলে আসা শৈশব, রোদ-বৃষ্টি মাখা হুল্লোড়, খেলা আর আনন্দের রাঙতায় মোড়া এক স্বপ্নিল অভিযাত্রা।


শালিকবুড়ো ও ফড়িং বইয়ের বারটা গল্পের মধ্যে শেষ দুটি গল্প মিনুবৃষ্টি বাগান। এই গল্পদুটি একটু ভিন্ন ধারার ভিন্ন রঙের। গল্পের বুনন শিশুদের হলেও শিশু সীমানা ছাড়িয়ে বড়দের আঙিনায় আছড়ে পড়েছে তার রঙ। বড়দের সীমানায় উঁকি ঝুঁকি দিয়ে বড় হওয়ার গল্প মিনু। গল্পের শুরুটায় তিনি লিখেছেন-

‘ঘরের পিছনের দরজা দিয়ে বাগান দেখা যেত। মিনু দরজায় দাঁড়িয়ে ফুল দেখত। পাখি দেখত। ফুলের গন্ধ ভেসে আসত নাকে। সেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। একটা ফ্রিজ কেনা হয়েছে। সেটা রাখতেই এই অবস্থা।’

সভ্যতার অত্যাচারে প্রকৃতি আজ অসহায়। প্রকৃতিকে নিংড়ে আমরা বিলাস বৈভবের দুর্গ গড়ে চলেছি। নিসর্গের সবুজ স্নিগ্ধতা, পাখির কলকাকলি, চাঁদের বিভা, জোছনার আলোড়ন, সাগরের উচ্ছ্বাস, পাহাড়ের গৌরব আমাদের বিনাশী চরিত্রের কাছে অসহায়। আকাশের স্বাধীনতা হরণ করে বাতাসে বিষ ছড়িয়ে মাটির ঐশ্বর্য্য নষ্ট করে আমরা কখন যে নিজেরাই ধ্বংসের কিনারে এসে দাঁড়িযেছি তা আমরা নিজেরাই জানি না। মিনু গল্পে লেখক বড়দের কাছে ছোটদের অধিকার আদায়ের কথা লিখেছেন। সেই সাথে প্রকৃতির আলোর কাছে বিলাসদ্রব্যের অন্ধকার পরাজয় লিখে দিয়েছেন।

বৃষ্টিবাগান গল্পের রঙটা আরেকটু গাঢ়। রঙধনুর মতো নয়। জলছবির মতো নয়। বিমূর্ত চিত্রকলার মতো। অনেকে গল্পটা পড়ে আমার সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু আমি এই স্বপ্নজাল চোখে জড়িয়েই গল্পটা পড়েছি। বৃষ্টির মায়াচ্ছন্ন মূর্ছনার মতো বাগানের প্রতিটি দৃশ্য ফুটে উঠেছে তার গদ্যে। আমাদের স্থির অনুভূতি তিনি এঁকছেন সাবলীল সমীকরণে। বৃষ্টিবাগান পড়ে মনে হয়েছে এ গল্পটা শুধুই নিজের জন্যে।

রঙিন বেলুন আর আলপিন চির শত্রু। উচ্ছ্বাস আর সমালোচনাও। আমি গল্পের খুঁটিনাটিগুলো লেখকের কানে কানে বলতে চাই। ভালোলাগার কোন সীমানা থাকে না। বাবলু ভঞ্জ চৌধুরীর গ্রন্থ সংখ্যা কম হলেও রচনার সংখ্যা কম নয়। জানাশোনার পরিধিও। তার বিজ্ঞানমনষ্ক মন এবং যুক্তিবাদী স্বভাব আগামীতে আরও ভালো গল্পের জন্ম দিতে পারবে। শুভকামনা রইলো সৃজনশীল এই মনের মানুষটির জন্য।

শালিকবুড়ো ও ফড়িং বইটির প্রকাশক : ডাংগুলি প্রকাশনী, ঢাকা ; অমর একুশে গ্রন্থ মেলা ২০২০। প্রচ্ছদ : নাইমুর রহমান ; মূল্য- একশত ষাট টাকা।

দেলোয়ার রিপন অসাধারণ অলংকরণ করেছেন বইটির

About S M Tuhin

দেখে আসুন

তিসিডোর : মিশ্ররীতির একটি অনবদ্য উপন্যাস- রবিন পাল

  বই নিয়ে পাঠস্পন্দন তিসিডোর; কেতকী কুশারী ডাইসন; প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০০৮, আনন্দ পাবলিশার্স …

2 কমেন্টস

  1. Bablu Bhanja Chowdhury

    আমার বই নিয়ে কেউ আলোচনা লিখবে, তা কখনও ভাবিনি। আজ হঠাৎ করে ‘ম্যানগ্রোভ সাহিত্য’-এ ‘শালিকবুড়ো ও ফড়িং’ বইটির আলোচনা দেখলাম। তাও কে লিখেছেন? আহমেদ সাব্বির। ব্যক্তিটি আমার কাছে বিশাল। কেন বিশাল? কারণ তিনি অ-কল্পনীয় শক্তিতে কল্পনা আর বাস্তবকে শিল্পায়িত করতে পারেন অনায়াসে। মূলত, আহমেদ সাব্বির আমার আইকন। তাঁকে দেখে আমি শিখি।

    সেই আহমেদ সাব্বির-ই অনেক বড়, কষ্টসাধ্য, শিকড়-সন্ধানী ও অনুরুপ সাহিত্য কর্মের সাযুজ্য টেনে যখন আমার বইয়ের আলোচনা করলেন, তখন দেখলাম-বইটি লিখে যতটা না ভার নেমেছে, তার দ্বিগুণ ভার নামল এবার।

    ধন্যবাদ জানানোর ভাষা নেই আমার।

    পত্রিকার সম্পাদক স ম তুহিন মহোদয়ও ফেসবুকে শেয়ার করার সময় চমকে ওঠার মত বাক্য সাজিয়েছেন। শুধু কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আমার আর কিছু বলার নেই।

    • আহমেদ সাব্বির

      ধন্যবাদ ম্যানগ্রোভ পরিবারকে। শুভকামনা বাবলু দাদার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *