নতুন পোস্ট

নির্বাচিত ছড়ার বই : রৌদ্রকণা জোছনাকণা

This image has an empty alt attribute; its file name is 0099999.jpg

নির্বাচিত ছড়ার বই

রৌদ্রকণা জোছনাকণা : নুরুজ্জামান সাহেব

‘ সূর্য আলো দেয়। সে অনেক দূরে। কিছু মানুষ আলো দেয়, তা খুব কাছে। তাঁদের জীবদ্দশায় সূর্যে আর তাঁদের মিল মনে আসে না। যখন হাতের কাছে পাই না তখন বুঝি— সূর্য মানুষ হয়ে এসেছিল। এমন অনেক মানুষ আছে আশেপাশে। নুরুজ্জামান সাহেব তাঁদের একজন। পেশায় আইনজীবী এই মানুষটি অসম্ভব বাকপটু। দরাজ। সৃষ্টির প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। মধুর আলাপি। তাঁর সাথে একবার যে কথা বলেছে, সেই মজেছে। এবারের বই মেলায় (অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০) তাঁর দ্বিতীয় ছড়া গ্রন্থ বেরিয়েছে। শিশুতোষ ছড়ার বই। উপাদেয়। মমতায় ভরা। নাম- রৌদ্রকণা জোছনাকণা। ’

রাশিদুল হাসান-এর প্রচ্ছদ ও অসাধারণ অলংকরণ বাড়তি পাওনা–

This image has an empty alt attribute; its file name is RODDUR-KONA44-720x1024.png

রৌদ্রকণা জোছনাকণা : একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

নাম— রৌদ্রকণা জোছনাকণা। ছবিগুলো চাররঙা, আঠার মতো, দৃষ্টি আাঁটকে রাখে। সুদৃশ্য ঝালরের মতো ঝুলছে ছবিগুলো, তার মধ্যে উজ্জ্বল বাতির মতো জ্বলছে লেখার অক্ষর। বইটি শিশুতোষ, সে হিসেবে একটানে পড়া যায়। শিশুর মনন তৈরীতে আনন্দের কী রকম ফাঁদ পাতা আছে ―তা-ই খুঁজছিলাম। আমি চাই শিশুর সামনে একটা আনন্দের ফাঁদ থাকবে, শিশু সেই ফাঁদে ঢুকবে, আর সতেজ, সৃষ্টিশীল, উদ্যমী ও কৌতুহলী মন নিয়ে বেরুবে। লেখনি হল সেই ফাঁদ। কিন্তু সেই ফাঁদের কোনো মানদন্ড আমার কাছে নেই, তা যার কাছে যেমন, তেমন হতে পারে। কাজেই সেই নিরিখে এই বইয়ের কোন গ্রেডিং আমি করছি না। তবে বলব, আমি শিশু নই, তবে বইটি আমাকে ক্ষণিকের জন্যও শিশু বানাতে পেরেছে। যতই ভেতরে ঢুকি-ভাবনাগুলো বিক্ষিপ্ত নদীর মতো ধেয়ে বেরিয়ে যায়। মনে হয়েছে― একটু ধৈর্য ধরে বসে থাকলে সেই ‘বেরিয়ে যাওয়া’ একটি পথ খুঁজে পাবে, যে পথে আনন্দ, প্রশান্তি ও দুঃখজয়ী শক্তি আসতে পারে।অভিভাবকদের জন্যও এখানে মেসেজ আছে —এ কথা না বলে পারি না। যেসব শিশুদেরকে তিনি বইটি উৎসর্গ করেছেন, তাদেরকে ‘দুরন্ত কণা’ হিসেবে অখ্যায়িত করেছেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, রৌদ্রকণা জোছনাকণা বলতে তিনি মানবকণাকেই বোঝাতে চেয়েছেন–

‘ডানায় ডানায় জানছে অজানা / খুকুর এ ঘর স্বপ্ন দিয়ে বোনা (ছড়া-রৌদ্রকণা জোছনাকণা)।

রৌদ্র যে তেজ, শক্তি ও বর্ণের আধার; আবার জোছনা যে স্নিগ্ধতা, মায়া ও মাধুর্যের ধারক, মানবশিশু তেমনই হোক; একজন অভিবাবক বা ওই স্থানীয় কারো মাথায় শিশু সম্পর্কে যদি এমতটি ঢোকানো যায়— তাই বা কম কীসে? লেখকের ভাবনার মধ্যস্থিত শক্তিশালী ভিত্তিটির খানিকটা পরিচয় ওই নামকরণেই রয়েছে। তবে, ভাবনা যত ভারিক্কি হবে, তার প্রকাশের ভাষাটিকেও তত হাল্কা হতে হয়, যাতে সঠিক গতি বজায় রাখা যায়, শ্লথ না হয়ে পড়ে। দুয়েকটি স্থানে এর ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলেও তাতে লেখকের দোষ নেই। ভাবনাশীল লেখকের উৎসাহ আমার কাছে মুখ্য, সেই উৎসাহ ঝড়ের বেগে প্রকাশে ভাষার ক্ষীণতা চলে এলেও তা গৌণ; যদিও তীব্র সমালোচকরা শিল্পরুপের দোহাই দিয়ে আমার সাথে একমত নাও হতে পারেন। তা না হোন, ধানগাছ ছড়ানো ছিটানো অবস্থায়— এক, আবার সুন্দর পরিপাটি করে আঁটিবাধা অবস্থায় আর এক। আমি ধানগাছের এই দুটো অবস্থাকেই শিল্প বলতে চাই। সোনা-ই যদি মুখ্য, সে খনির মধ্যে খনিজবর্জ্য মেশা অবস্থায় এক, আবার পরিচ্ছন্ন করে দোকানে ঝুলন্ত অবস্থায় আরেক। মুল যে সোনা, সেটা আছে কিনা দেখতে হবে। এই গ্রন্থে নুরুজ্জামান সাহেবের শিল্পমুলটিকে আমি খনিস্থিত সোনা হিসেবে দেখি। তিনি আমাদের নজর নিয়ে গেছেন, তোলার দায়িত্ব আমাদের।

নুরুজ্জামান সাহেবের লেখার সাথে আমি পরিচিত। আকাশ আছে নজর-জুড়ে, বিদ্যুতচমক একটুখানি জায়গায়, যেখানে চমকায় সেখানে নজর না গিয়ে পারে না। পুরো আকাশটা তখন ওই একটুখানি জায়গাতেই এসে দাঁড়ায়। তেমনি নুরুজ্জামান সাহেবের লেখা ওই আকাশের মত, চমক থাকে একটুখানি জায়গাতে, এটা তার স্বভাবজাত; আর এ কারণেই তা আলাদা ও নতুন। ছোট কথা ছড়ায় বেশি। বড় কথা বয়ে বেড়ানো কষ্টের। বিবেকানন্দের পুরো কবিতা বাদ দিয়ে শুধু ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ কবিতাংশটুকুই আমরা বারবার বলি। এই গ্রন্থেও নুরুজ্জামান সাহেবের কিছু কথা রয়েছে, যেগুলো মুখে মুখে ফিরতে পারে–

যেমন— ‘সুখটাই আসল কথা / ক’জন জানে’ (ছড়া: আসল কথা) অথবা ‘সবাইকে বয়ে নিয়ে / পা’দুটো ঠিকই চলে / স্বার্থে ডুবলে সবাই / তাকে কি সমাজ বলে (ছড়া: সমাজ) অথবা ‘সুসময়ে টানলে কাছে / অসময়ে কেন নয় / সবাই সবার আত্মীয় / ভাবনাটাই ছন্দময় (ছড়া : আত্মীয়) অথবা ‘মুক্তবুদ্ধি মুক্তজ্ঞান / সুস্থ করে জীবনমান’ (ছড়া : এসো সুস্থ হই) ইত্যাদি।ছড়ার একটি বনেদি ঘরানা আছে; সেগুলো স্রেফ ছন্দো-সম্মোহনী। তবে কিম্ভুত, নন-সেন্স, আপাত পারম্পর্যহীন। শিশুমনের অদম্য দোল— তা-ই। এ কারণে শিশুমনে তা ছায়ার মতো লেগে থাকে। ‘আতাগাছে তোতাপাখি ডালিম গাছে মৌ / এত ডাকি তবু কথা কয়না কেন বৌ’ ইত্যদি এ জাতীয় ছড়া। নুরুজ্জামান সাহেব ছড়ার সেই চিরায়ত সম্মোহনী রুপটিকেও ধরে রেখেছেন, ‘ছয় বেয়ারার পালকি / খাবে তারা তাল কি / তালের ভেতর মিষ্টি শাঁস / থাকবে সুখে বারো মাস’ (ছড়া : পালকি)।

পুরো বইয়ে তাঁর চেষ্টা ধরা আছে। এমন মানুষের চেষ্টা , না ছুঁলে নিজের চেষ্টা বেরুবে কী করে? কোনো মতামতই চুড়ান্ত নয়। আবার কালোত্তীর্ণ লেখা সমকালের অনেকের কাছে মুল্যহীন হতে পারে, এমন নজির বহু আছে।

This image has an empty alt attribute; its file name is IMG_20200417_181033.png

বইকণ্ঠ । প্রকাশক : ফরহাদ খান চৌধুরী । বাড়ি-৪৩৯, সড়ক-১১, ব্লক-এফ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, ০১৭১৮ ২৯৩১৮৮, ০১৫১৭ ০৫৩৫৮৯ । প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : রাশিদুল হাসান ।

একমাত্র পরিবেশক : নওরোজ কিতাবিস্তান

মূল্য : ১০০ টাকা । বইটি রকমারি ডট কম থেকেও সংগ্রহ করা যাবে ।

About S M Tuhin

দেখে আসুন

তিসিডোর : মিশ্ররীতির একটি অনবদ্য উপন্যাস- রবিন পাল

  বই নিয়ে পাঠস্পন্দন তিসিডোর; কেতকী কুশারী ডাইসন; প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর ২০০৮, আনন্দ পাবলিশার্স …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *