পাউল সেলান : দুর্বোধ্যতম কবি – গাজী আজিজুর রহমান

পাউল সেলান : দুর্বোধ্যতম কবি

গাজী আজিজুর রহমান

This image has an empty alt attribute; its file name is ttttt888-1024x200.jpg

কবি ও তার কবিতা এবং তার ব্যক্তিজীবন-এ দুয়ের মধ্যে যেমন পার্থক্য সুদূর তেমনি অন্তরঙ্গ অন্বয়ও হতে পারে একশোতে একশো। যেমন জীবনানন্দের কবিতা, বিষ্ণু দের কবিতা, আবুল হাসানের কবিতা বা তুষার রায়ের। কবিতা শুধু শব্দ-ছন্দ-অলঙ্কার নয়- সামগ্রিক সৃষ্টি, যার জন্ম হয় কবির চেতনা ও অবচেতনার গভীর অতলে। বাস্তবের বীক্ষা স্মৃতি ও স্বপ্ন যার সৃষ্টি-পুরাণ। আধুনিক কবিতায় এর সাথে মূলত সংযুক্ত হয়েছে অভিজ্ঞতা এবং বহুমাত্রিকতার ব্যাসক্তি। সব মিলে রবীন্দ্রনাথের কথাটাই গ্রহণীয় ‘পাঁজি মিলিয়ে মভারনের সীমানা নির্ণয় করবে কে?’ তবু অস্বীকারের উপায় নেই আধুনিকতার যাত্রা উনিশ শতকে আর বিশ শতকে তার চূড়ান্ত উৎসঞ্জন। বিশেষত মার্কসবাদ, বিজ্ঞানের বিকাশ, রুশ বিপ্লব, দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ, নগর-নাগর কেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতা, সংশয় ও নেতিবাদে তন্মনস্ক মানুষ মোকাবিলা করলো যে কালো বন্যার কাল তারই এক অন্তিম লগ্নের অসহায় কবি পাউল সেলান (জন্ম ; ২৩ নভেম্বর ১৯২০, আত্মহত্যা ২০ এপ্রিল ১৯৭০) এক পিরামিডের বিস্ময়, দুর্গমতা এবং আঁধারেরও অধিক আঁধারে নঞর্যে আলোকিত।

সেলান জন্মেছিলেন রুমানিয়ার বুকভনিয়াতে। স্কুল জীবন এখানে শেষ করে ১৯৩৮ এর ফ্রান্সে আসেন চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে। কিন্তু পরের বছরই স্বদেশে ফিরে রোমান্স ভাষাও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা। ১৯৪০ এ সোভিয়েতের বুকভিয়া দখল, পর বছরই দখল করলো নাৎসী জার্মানি। শুরু হয় ইহুদি গ্রেফতার। বাবা-মাসহ বন্দি হলেন সেলান। পাঠানো হলো বন্দি শিবির Transnistiuci-তে। এখানেই বাবার মৃত্যু। মাকে হত্যা করা হলো গুলি করে। আর সেলান বাঁচলেন পালিয়ে। কিন্তু স্বামীসহ বাঁচতে পারেনি কবি মারিনা ৎভাতেয়েভা। সব কষ্টের অবসান ঘটিয়ে আত্মহত্যা করে তার প্রাণ জুড়ালো। ১৯৪৫-এ বুকভিয়া থেকে সেলান এলেন বুখারেস্টে। চাকরি নিলেন অনুবাদকের। ১৯৪৭-এ এলেন ভিয়েনায়, এখানেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভস্মাধার থেকে বার্লি’। অস্থির সেলান পরবছর প্যারিসে এসে জার্মান সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে জার্মান সাহিত্যের প্রভাষক হন Ecole Normale Superieure-র। ১৯৫২-বিয়ে করলেন গ্রাফিক শিল্পী গিছেল লেস্অ্যঞ্জকে। এবং ফ্রান্সের নাগরিত্ব নেন স্থায়ীভাবে। এ সময় তিনি প্রবলভাবে প্রভাবিত হন আত্মঘাতী কবি জেরার দ্য নের্ভাল, গেঅর্ক ট্রাকল, এসেনিন, মায়াকভস্কিসহ বোদলেয়ার, র‌্যাবোঁ, অ্যালিয়ের, পল ভালেরি, মালার্মে ইত্যাদি আধুনিক কবিতার দেবতাদের দ্বারা আর প্রেষিত ও পীড়িত হলেন মহাযুদ্ধের প্রহরণ ও বিষ সক্রমণে। মৌলিক কবিতাসহ এ সময় তিনি প্রায় পাগলের মতো অনুবাদ করতে থাকেন শেক্সপীয়র, এমিলি ডিকেনসন, আঁরি মিশো, রেনেশার, ব্লখ, মারিঅ্যান মূর, অন্দ্রে বুশ, জঁ দাইভ, এসেনিনসহ ম্যান্ডেলস্টাসের কবিতা।

পাউল সেলান যখন কলম ধরেছিলেন তখন পৃথিবীর বড় দুঃসময়। চারপাশে দুর্যোগ, ক্রন্দন-হাহাকার, নাগিনীরা ফেলিছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, আগুনে অশনিতে সন্ত্রস্ত, সিদ্ধ মানুষ। কুরু-পান্ডবের যুদ্ধ ছিল কৃষ্ণের ভাষায় ন্যায়-নীতি ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ, কারবালার যুদ্ধও ছিল সত্যধর্ম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ, আমাদের ৭১-এর মহান যুদ্ধও ছিল একটি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য ন্যায় যুদ্ধ। কিন্তু প্রথম বা দ্বিতীয় উভয় মহাযুদ্ধ ছিল দুই পরশক্তির বিক্রমের যুদ্ধ, পররাজ্য দখলের যুদ্ধ, নীতি-আদর্শ ও ধর্মহীন কৌরভসুলভ কুকর্ম ও এজিদ সুলভ নিষ্ঠুর পীড়ানন্দের যুদ্ধ। বিশ্বযুদ্ধে যে ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃত্যুমঞ্চ সংঘটিত হয়েছিল, নেমেছিল তিমির অন্ধকার আর বেঁচে থাকা মানুষগুলোর মরে ছিল আত্মায়তাতে আর কবিতা লেখা সম্ভব ছিল না (থিওডোর আর্ভোনোর), অসম্ভব ছিল গান গাওয়া, ভালোবাসা প্রেমাষ্পদকে। কারণ ততক্ষণে পৃথিবীর সব শুভশক্তি, কল্যাণীয় শক্তি ও সুন্দরের মৃত্যু ঘটেছে জল-সৃলে। যে বাস্তবতা মূর্ত হয়ে ওঠে পিকাসোর চিত্রে, রাসেল ও রঁলার লেখায়, রবীন্দ্রনাথের সভ্যতার সংকটে, ট্রাকলের আত্মহত্যায়, লোরকরা নির্মম মৃত্যুতে, আনতোনিন আর্তোর (১৮৯৬-১৯৪৮) মানসিক ভারসাম্য হারানোয়, ডিলান টমাসের (১৯১৪-১৯৫৩) মাত্রাতিরিক্ত মদ্য পানে মৃত্যুতে ভার্জিনিয়া উলফ-এর (১৮৮২-১৯৪১) আত্মঘাতী হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের ভায়বহতা লাভ করে মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার। যুদ্ধ নিয়ে আসে মারী, মড়ক, দুর্ভিক্ষ আর যথাতির জরাগ্রস্ত যৌবনহীনতা। বিশেষত নাৎসীদের ‘আউশউইৎস’ নরমেধযঞ্জের পর যখন সব আশাই দুরাশা, সব স্মৃতি রাত্রি দেবী নিক্সের ভয়ংকর প্রতিমা, ক্যামুর ‘দ্য প্লেগ’-এর মতো মহামারী তাড়িত জীবন তখন রক্তের অক্ষরে কবিতা লিখছে সেলান। যে কবিতা কুয়াশা ঘেরা, অরণ্যের অন্ধাকর খচিত, স্কিংক্সের মতো মৃত্যু তাড়িত এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আতঙ্কিত। তিনি চেয়েছিলেন তার এষণা-অভিশঙ্কা, গ্লানি, অশ্লাঘা, মৃত্যু অধিক মর্ম যাতনা পৌঁছে যাক সবার কাছে খঞ্জরের ঘাতক প্রতীকে। মানুষ জানুক যুদ্ধ কত খারাপ, যুদ্ধ কত বীভৎস, যুদ্ধ কত অমানবিক, যুদ্ধ কত নির্মম ও নিষ্ঠুর। এসব অভিপ্রায় ও আত্মক্ষয়কে তিনি একে একে তুলে ধরে ছিলেন ‘পাপি এবং স্মৃতি (১৯৫২), আঙিনা থেকে আঙিনায়’ (১৯৫৫), ‘ভাষার গ্রীল’ (১৯৫৯), ‘না-কারো গোলাপ’ (১৯৬৩), ‘শ্বাসচক্র’ ‘সুতোর সূর‌্যাবলি’ (১৯৬৮) এবং তার মরণোত্তর আলোক চাপ’ (১৯৭০), তুষার অংশ’ ও ‘কালের খামার’ কবিতাগ্রন্থ পরম্পরায়।

কবি আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সুজিৎ ঘোষ সম্পাদিত (১৯৯২) ‘স্মৃতি ও সত্তায় বিষ্ণু দে’ গ্রন্থে এক প্রবন্ধে যুদ্ধ ও মৃত্যুতাড়িত কবি সেলান সম্পর্কে বলেছিলেন “লাঞ্ছিত ইহুদিসম্প্রদায়ের বিধুর প্রতিভু ঐ কবি প্যারিসে ১৯৭০ এর ২০শে এপ্রিল আত্মহত্যা করেন। আজ তাঁর পাঠকদের মধ্যে কোথাও কোনো সংশয় নেই, তাঁর কবিতার আত্মা ব্যাপক সাধারণ্যে নন্দিত হয়নি বেল পাউল সেলানের যে-ক্ষোভ দীর্ঘায়িত ছিল, আত্মহননের মাধ্যমে তারই সংক্ষিপ্ত সমাধানের ট্রাজিক প্রয়াস প্রকাশিত”। কবির এই ক্ষোভ ও মর্মজ্বালা কবিরই সৃষ্ট। বিশ্বযুদ্ধের বিষে এত গভীরভাবে জর্জরিত হতে দেখা যায় না আর কোনো কবিকে। কেবল তুলনা চলে ট্রাকল, এলিয়ট ও মারিনা ৎভাতেয়েভার জীবন কবিতার সামে। তবে দুর্বোধ্যতায় সেলান ছিলেন সবার শীর্ষে। দুর্বোধ্যতায় আমাদের দেশে সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দেও তার কাছে শিশু। যে কারণে জর্জ স্টাইনার এর মতো সমালোচকও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন “(it’s) very difficult to say anything useful. কবিতার ভাষা নির্মাণে সেলান ছিলেন চরমপন্থীদেরও গুরু। তার কবিতায় ব্যবহৃত অপ্রচলিত শব্দ ও অভিব্যক্তি (আর্কেইজম) এবং নব্য প্রয়োগ বিধি (নিওলজিজম) এতটাই দুর্জেয় ও দুরধ্যয়ী ছিল যে, সে অর্থভেদে সাধারণতো দূরের কথা বিশিষ্টজনের জন্য ও ছিল অনধিগম্য ও অপরিঞ্জেয়। আমি’কে গোপন রেখে ‘তুমি’ ও ‘আমরা’র মধ্য দিয়ে তার কবিতা অগ্রসৃতি লাভ করেছে একবচনে। এখানে রোমান্টিক হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না তার। কারণ তিনি নাৎসীদের বন্দি শিবিরের অবর্ণনীয় অত্যাচার দেখেছেন, দেখেছেন গ্যাসচেম্বারের বীভৎসতা, আর স্বজনদের পোড়া কয়লা দেহের গন্ধে তার জীবনের সব শুভ সুন্দরের গান, কোমলতার কাব্য, স্বভাবের মধুরতা উরে গিয়েছিল যুদ্ধের নৃশংসতায়। তাই তার কবিতায় নন্দনতত্ত্ব রয়ে গেল অনর্পিত ও অনভিপ্রেত। এই সূত্রে সেলান বলেন ‘কবিতা হলো নিঃসঙ্গ। নিঃসঙ্গ এবং (তা সত্ত্বেও) পথে নেমে পড়েছে সে। কবিতা চায় আরেকজনকে, সেই আরেকজনকে তার চাই-ই চাই, তার পরে বড়োই জরুরি ঐ অন্যোন্যতা। সে ‘ঐ আরেকের কাছে গিয়ে হাজির হয়, তার সঙ্গে কথা বলে… তার মধ্য দিয়ে একরকম সংলাপ প্রায়শই দ্বিধাগ্রস্ত সংলাপ জন্ম দেয়।’ ১৯৬০-এ সেলান ব্যুশনার পুরস্কার পেলে সারি-লুইসে কাশানিৎস এই কথাটাই এভাবে ব্যক্ত করেছিলেন- তাঁর নির্জনতা সাধারণীকরণের প্রত্যাশায় স্বকীয়, তিনি আর তাঁর নিজের হয়েই নয়, অন্যদের হয়েও কথা বলে চলেছেন। এমন নির্জন সজনের কবিতার সংগ্রাম আমরা একমাত্র প্রত্যক্ষ করি বিষ্ণুদের কবিতায় এবং রোমান্টিক আবিলতাহীন দুর্বোধ্যতায়।

জগৎ জুড়ে বিশ শতকের কবিতায় কাফেলায় সেলানে কবিতা এতটাই ব্যতিক্রম, এতটাই উত্তরাধিকারহীন যে তার খোলা দ্বারেও কেউ প্রবেশ করে না প্রায়শ। তার কবিতা পড়তে মনে হবে উদ্ভট, যোগসূত্রহীন, নিরবলম্ব, বালু-নুড়ি-পাথরের শুষ্ক বেলাভূমি। মনে হবে কতগুলো শব্দের জট বা দৌড়াদৌড়ি খেলা, যেমন : দানাদার,/দানাদার এবং দড়ি-দড়ি। বোঁটাময়,/ঘন;/ রসােেলা ও উজ্জ্বল; যকৃতোপম,/চ্যাপ্টা এবং/স্থূল; ঢিলে, জটপাকানো;/তিনি, সে”-(সংকীর্ণকরণ) এর সাথে কিছুটা তুলনীয় বিষ্ণুদের “শ্বেতচন্দন লেপ/কুমারী ভঙ্গীমা/ফুলের শয়ান ড্যানায়ে/গন্ধে আতুর/ভারাক্রান্ত মোহ/রাধিকা চাঁদ/সবুজ কুঞ্জবন/সুঠাম সুশী মেদসু কোমল প্রিয়া/সুমধুর কাকলি/বাসনাবিলাস/উপবন পূর্ণিমা/দোল রাত্রি” (উর্বশী ও আর্টেমিস) যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত সৈনিকদের বাতিল অস্ত্রশস্ত্র জড় করে কবি সাজান খড়ের স্তুপ। এখানে অর্থের চেয়ে অনর্থই যেন দুর্বিনীত। সেলানের কবিতার এই জটিলতা, দুর্ভেদ্য অগম্যতা সংবৃততা এবং কন্টক শয্যা কবিতার ইতিহাসে এতটাই বিরল যে শিকড় সন্ধানই বাতুলতা।

খোন্দকার আশরাফ হোসেন পাউল সেলানের কবিতার সামনে দাঁড়ানোকে স্কিংক্সের সামনে দাঁড়ানোর মতো মনে হয়েছে দুর্বোধ্য। পরে পড়তে পড়তে উদ্ধার করলেন পাউল সেলানের প্রথম দিককার কবিতার বিষয় প্রায়শ থার্ডরাইখের বন্দীশিবিরে ইহুদীদের নিধনযজ্ঞ। সেলানের কবিতার আরো দুটো প্রধান উপস্থিতি হলো দু’জন লেখকের : অসিপ্ ম্যানডেলস্টাম (osip mandelstam) রুশ কবি যাঁকে স্টালিন হত্যা করেছিলেন, এবং দার্শনিক ও নাৎসীসমর্থক মার্টিন হাইডেগার (Martin Heidegem) যে ভাবেই বলি না কেন সেলান বোদলেয়ার বা এলিয়ট, নের্ভাল বা অ্যাপোলিনিয়ের দ্বারা খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন তাতেও সনাক্ত হন না সেলান, স্বগত বৃত্তে সেলান নিয়ত একাকী, এই একাকীত্বই তার আত্মবিনাশের সুড়ঙ্গ ছিল।

সেলানের জীবন ও কবিতা উচ্চকিত নয়, স্বর্ধিত নয়, উত্তেজকও নয়- নির্জনের নিত্য সংগ্রামে তা ট্রাজিক ও মহোজ্জ্বল। অবশেষে পরাবাস্তবের আশ্রয়ে জটিল, রূপকাশ্রয়ী, সাংকেতিক ও চৈতন্য নিরপেক্ষ। তার সব সৌন্দর্য ও শিল্পচেতনা যন্ত্রণা ও কান্নায় মসীলিপ্ত। তার এষণা ও অনুরাগ কাফনে-কুম্ভীপাকে প্রহরণে-মৃত্যুদিকে গদ্যময়। তার প্রকৃতিতে বসন্তে রক্তপাত ঘটে, আবর্জনা স্তুপের ঈশ্বর, দুঃখের দাঁড়িপাল্লা ভরা তার প্রতিটি প্রহর, আর রক্তবৃষ্টি চোখে এই পৃথিবী শুধুই ধূসর, শুধুই আমব্রীয় রাত। সেই রূপশ্রীহীন আশ্চর্য অসুস্থ ও শিরচ্ছেদ করা কয়েকটি শিউলি ফুল উদ্ধৃতি এখন : ১. প্রত্যুষের কালো দুধ আমরা তাকে পান করি সন্ধ্যায় (মৃত্যুসঙ্গীত) ২. সাত গোলাপের পরে শুনি ঝর্ণাধারার জলের ঝাঁপুই (ক্রিস্টাল) ৩. শাওনের মেঘ, কুয়োর উপর তুমি ঘোরো?/আমার সুশান্ত মা কান্না কাঁদে সবার জন্য (চিনার গাছা) ৪. কালো কোকিল/হীরার নাল দিয়ে তার অবয়ব খোদাই করে আকাশের দরজায় (লোহার জুতোর মচমচ আওয়াজ) ৫. সময় হয়েছে পাথরের ফুল হয়ে উঠবার/অস্থিরতার একটা স্পন্দমান হৃদয় পাবার (সূর্যবলয়) ৬. মনিকনীনিকা, সন্তরক, স্বপ্রহীন, নীরক্ত/আকাশ, হৃদয়-ধূসর, হয়তো নিকটে (ভাষার জাল)-এ রকম প্রচুর উদাহরণে ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত হবে পাঠকের হৃদয়, কারণ সেলানের সব কিছুই উল্টোপাল্টা, এতদিন মানুষ জানতো ঈশ্বরের কাছেই মানুষকে নত হতে হয়, প্রার্থিত হতে হয়, আর সেলান বললেন “প্রার্থনা করো প্রভু/প্রার্থনা করো আমাদের কাছে/আমরা নিকটবর্তী” (টেনেব্রেই)। এই সাহসের সমাচার কেবল সেলানের পক্ষেই উচ্চারণ সম্ভব।

নিরন্তর হতাশা, ক্ষোভ, অপমান (তিনি নাকি ইভান গলের কবিতা চুরি করে কবিতা লেখেন) আর অশান্তিতে সেলান ক্রমে জটিল থেকে জটিলতর, দুর্বোধ্য থেকে দুর্বোধ্যতর হয়ে উঠতে থাকেন যাপিত জীবনে। হতে থাকেন সমাজ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন (যে বিচ্ছিন্নতা বা এলিয়েনেশন ছিল তৎকালীন আধুনিকতার এক অন্যতম উপসর্গ। কাফকা, ক্যামু, সার্ত্রের লেখায় যার চূড়ান্ত অধিবাস ঘটেছিল), একাকী এবং পলাতক। ভুগতে থাকেন বোদলেয়রীয় সিজোফ্রেনিয়ায়। এ সব বিষ-মৃণাল ধরে তিনি গড়ে তোলেন এক খ-িত ব্যক্তি গত কূটাভাস কণ্টকিত জীবন। যে জীবনের চাবি থাকতো তার নিজের পকেটে। জীবনের শেষ দিকে আক্রান্ত হন প্যারাইনয়া রোগে (নির্যাতন ভ্রম মানসিক বৈকল্য)। তার কেবল মনে হতো সমস্ত পৃথিবী ও মানুষ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত- যে ফাঁদ থেকে তার নিস্কৃতি নেই! এমন এক দুঃখ কষ্টের দিনে, অসহায় সময় হাঁটতে হাঁটতে অস্ত গোধুলীতে সীন নদীর সাথে দেখা। খর বেগে বয়ে চলেছে নদী আনন্দে না ক্রোধে কবি জানেন না, কেবল জানেন আমাদের কেউ ডাকার নেই, বলার নেই আমরা ছিলাম আমরা আছি আমরা থাকবো- তখনই ভাবলো নদী “আর কেউ আমাদের মাটিও কর্দম থেকে গড়বে না/আর কেউ মন্ত্রোচ্চারে ডাকবো না আমাদের ধুলি/কেউ-না” (প্রার্থনা গান), অতএব ছাই-ছাই, তারপরই শিল্পিত ডলফিনের মতো একটা ড্রাইভ, জল তরঙ্গ’ ও কয়েকটি বুদবুদ… পৃথিবী হারালো এক রক্তাক্ত সংবেদনের কবিকে, যার প্রতিটি উচ্চারণ ছিল পাথর আর তরবারির মতো নিষ্ঠুর এবং সত্য, আর সত্য বলেই তা ছিল সুন্দর, ভয়ঙ্কর সুন্দর।

মিল্টন বা ডানের মতো তার কবিতা ছিল বিগদ্ধ জনের জন্য, আর সেই কবিদের জন্য যারা খোঁজেন কবিতায় প্রণোদনা, অভিনব নির্বেদ, হৃদয় ও রক্তের স্বর, বিষ্ময়কর সুন্দর ও ভ্রাষ্টার প্রাজ্ঞতা-তিনি তাদের প্রার্থিত কবি। যেমন এলিয়ট অডেন, জীবনানন্দ সুধীন দত্ত বা রিলকে-র্যাঁবো। সেলানের কবিতা এক দুর্গম অরণ্যের নিশীথ, এক দুর্ভেদ্য কেল্লার জঠর- যেখানে হামাগুড়ি দিয়েও প্রবেশ করতে পারে না যে কেউ প্রতি সেলান ছাড়া। মহামতি প্লেটো তার একাডেমির প্রবেশের ফটকে যেমন লিখে রেখেছিলেন এখানে সাধারণের প্রবেশ তেমনি পাউল সেলানের কবিতার কপালে যেন লেখা থাকে ‘No Entry’ কবি অভিধায়।

মূল সূত্র : পাউল সেলানের কবিতা : খোন্দকার আশরাফ হোসেন

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg
This image has an empty alt attribute; its file name is 2225.jpg

গাজী আজিজুর রহমান

জন্ম : ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭, দার্জিলিং, ভারত

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ

প্রবন্ধ, গবেষণা
সাহিত্যে সমাজবাস্তবতার ধারা (১৯৯২, পুনর্মুদ্রণ ২০১৪)
স্বেচ্ছামৃত্যুর করতলে কবি (১৯৯৬, পুনর্মুদ্রণ ২০১৫)
সাহিত্য ও সিংহাসন (১৯৯৯)
নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের শতবর্ষ (২০০১)
সাতক্ষীরার ভাষা ও শব্দকোষ (২০০৪)
আধুনিক বাংলা উপন্যাসের বিষয় ও শিল্পরূপ (২০০৯)
কবিদের কবি (২০১০)
কালীগঞ্জের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ (২০১৪)

সম্পাদনা
মরণরে তুহু মম (২০০৪)
খান আনসার উদ্দীন আহমেদ রচনাবলী (১৯৯৯)

অন্যান্য প্রকাশনা
বজ্রের বাঁশি (উপন্যাস)
কালো সূর্যের নীচে (নাটক)
সক্রেটিস (নাটক)
যোদ্ধার জতুগৃহ (উপন্যাস)

পুরস্কার / সম্মাননা
সাতক্ষীরা সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার (১৯৯৫)
ম্যান অব দি ইয়ার, বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৯৮)
কবি জসীমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার (২০০১)
শিমুল-পলাশ সাহিত্য পুরস্কার, কলকাতা (২০০৪)
বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র পুরস্কার (২০০৭)
লিনট পদক পুরস্কার (২০০৮)
সিকানদার আবু জাফর পদক (২০১২)
কবি সুকান্ত পুরস্কার (কলকাতা ২০১৫)

১৯৮৩ সাল থেকে সম্পাদনা করে যাচ্ছেন ‘নদী’ নামের একটি সাহিত্যপত্র সাথে অসংখ্য অনিয়মিত সম্পাদনা

This image has an empty alt attribute; its file name is ttttt888-1024x200.jpg

লেখককে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা

বিশেষ সংখ্যা /গাজী আজিজুর রহমান

About S M Tuhin

দেখে আসুন

বীররসের শিল্প-সাহিত্য এবং চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান : আমিনুল ইসলাম

বীররসের শিল্প-সাহিত্য এবং চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান আমিনুল ইসলাম ‘জানি কবিতার চেয়ে তুমি সুন্দরতমওগো মোর …

44 কমেন্টস

  1. This design is steller! You certainly know how to
    keep a reader amused. Between your wit and your
    videos, I was almost moved to start my own blog (well,
    almost…HaHa!) Excellent job. I really enjoyed what you had to say,
    and more than that, how you presented it.
    Too cool!

  2. I simply could not depart your website before suggesting
    that I actually enjoyed the usual info a person provide to
    your guests? Is gonna be back incessantly to check up on new posts

  3. Does your site have a contact page? I’m having trouble locating it but, I’d like to shoot you an email.

    I’ve got some ideas for your blog you might be interested in hearing.
    Either way, great blog and I look forward to seeing it expand over time.

  4. Wow that was unusual. I just wrote an really long comment but after I
    clicked submit my comment didn’t appear. Grrrr… well I’m not writing all that over again. Regardless,
    just wanted to say superb blog!

  5. You actually make it seem so easy with your presentation but I find this topic to be really something that I think
    I would never understand. It seems too complicated and very broad for me.
    I’m looking forward for your next post, I will try to get the hang of
    it!

  6. Hey there! I could have sworn I’ve been to this blog before but after
    browsing through some of the post I realized it’s new to me.
    Nonetheless, I’m definitely glad I found it and I’ll be book-marking and checking back often!

  7. Every weekend i used to visit this website, as i wish
    for enjoyment, since this this site conations truly fastidious funny stuff too.

    my blog post :: zeenite.com

  8. It’s a pity you don’t have a donate button! I’d without a doubt donate to this brilliant blog!
    I suppose for now i’ll settle for book-marking and adding your RSS feed to my Google account.
    I look forward to fresh updates and will share this blog with my Facebook group.
    Talk soon!

  9. Thanks for ones marvelous posting! I quite enjoyed reading it, you might be a great author.I will ensure that I
    bookmark your blog and definitely will come back very soon. I want to encourage you to definitely continue your great writing, have a nice day!

  10. Hi there, yes this piece of writing is actually
    fastidious and I have learned lot of things from it about blogging.

    thanks.

  11. Hey there! I’m at work surfing around your blog from my new iphone!
    Just wanted to say I love reading your blog and
    look forward to all your posts! Carry on the superb work!

  12. You ought to be a part of a contest for one of the finest blogs online.
    I most certainly will recommend this blog!

  13. I am regular visitor, how are you everybody? This post
    posted at this website is in fact pleasant.

  14. Does your website have a contact page? I’m having trouble locating it but, I’d like
    to send you an e-mail. I’ve got some ideas for your blog you might be interested in hearing.
    Either way, great site and I look forward to seeing it improve over
    time.

  15. Ahaa, its pleasant dialogue regarding this post here at this web site, I
    have read all that, so now me also commenting at this
    place.

  16. Hi to every body, it’s my first visit of this webpage; this web
    site contains remarkable and genuinely fine stuff designed
    for readers.

  17. Amazing! This blog looks exactly like my old one! It’s on a
    totally different topic but it has pretty much the same layout and design. Great choice of colors!

  18. Write more, thats all I have to say. Literally, it seems as though you relied on the video
    to make your point. You clearly know what youre talking about,
    why waste your intelligence on just posting videos to your blog when you could be
    giving us something informative to read?

  19. فروشگاه نت شو
    برای خرید محصول دیجیتالی از فروشگاه نت شو به لینک زیر مراجعه نمایید تا بتوانید خرید محصولات خوبی را تجربه نمایید.
    وب سایت نت شو

  20. I know this web site provides quality based content
    and other material, is there any other web page which provides these stuff in quality?

  21. It’s the best time to make some plans for the future and it is time to be happy.
    I’ve read this post and if I could I desire to suggest you few interesting things or advice.
    Maybe you could write next articles referring to this article.
    I want to read even more things about it!

  22. What’s up every one, here every person is sharing such experience,
    thus it’s pleasant to read this weblog, and I used to visit this website all
    the time.

  23. Thanks for sharing your thoughts on meta_keyword. Regards|

  24. We stumbled over here coming from a different website and thought I should check things out. I like what I see so i am just following you. Look forward to looking over your web page repeatedly.|

  25. You need to take part in a contest for one of the highest quality blogs on the web.

    I will highly recommend this web site!

  26. I do not even know how I ended up here, but I thought this post was great.

    I don’t know who you are but definitely you’re going to a famous blogger if you are not already ;
    ) Cheers!

  27. I have been exploring for a little bit for any high-quality
    articles or blog posts on this sort of area . Exploring in Yahoo I eventually stumbled
    upon this web site. Reading this information So i’m happy to convey that I have
    an incredibly just right uncanny feeling I found out exactly what I needed.
    I so much no doubt will make certain to do not disregard
    this web site and give it a glance on a relentless basis.

  28. Hey I know this is off topic but I was wondering if you knew of any widgets I could add to my blog that automatically tweet my newest twitter updates.
    I’ve been looking for a plug-in like this for quite some time and was hoping maybe you would have
    some experience with something like this. Please let me know if you run into anything.
    I truly enjoy reading your blog and I look forward to your new updates.

  29. Hello friends, how is everything, and what you
    wish for to say about this paragraph, in my view its truly
    remarkable in favor of me.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *