লকগেট : ঋভু চট্টোপাধ্যায়

 

কুয়োর কাছে গিয়ে হীরু কিছু সময় অপেক্ষা করতে লাগল। একটাও ঘড়ঘড়ি ফাঁকা নেই। থাকবেই বা কিভাবে? এতবড় পাড়াতে মাত্র একটা কুয়ো। কিছু সময় আগেই কয়েক বালতি জল তুলে বি টাইপের একশ পাঁচের তিনে দিয়ে এসেছে। উপর তলা বালতি নিয়ে উঠতে খুব কষ্ট। কয়েকটা সিঁড়ি উঠেই হাঁপ ধরে যায়।তাও যদি শ’তিন হাতে পাওয়া যেত একটা পরতা হত। কিন্তু বুড়িটা ভারি পাজি মিষ্টি করে কথা বলে জল তুলিয়ে একশ টাকার একটা নোট হাতে ধরিয়ে বলে, ‘আর পারব না বাবা, দেখছ তো আমাদের ঘরে কেউ নেই, তার উপর দু’জনের বয়স হয়েছে।’

এই চত্বরে হীরুর অনেক বছর থাকা হয়ে গেল। সেই বাবার হাত ধরে এখানে এসেছিল। তখন কারখানা পুরোদমে হৈ হৈ করে চলছে। বাবা একটা কনট্রাকটরের কাছে সকালের দিকে কাজ করত। বিকালে একটা চপ বেগুনীর দোকানও করেছিল। তখন বড় বড় কারখানা তৈরী হয় নি, আশপাশে গভীর জঙ্গল, সন্ধের দিকে উঠোনে শেয়াল ঘুরত, একটু দূরের জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে বাঘের ডাকও শোনা যেত। হীরুর বাবাকে কারখানা থেকে অনেকবার চাকরি করতে ডেকেছে। লোকটা যেন কেমন একটা ছিল। হীরু অবশ্য কোন দিন বাবাকে সাহায্য করতে যায় নি। ছোট ভাই পাঁচু যেত। এখন ওটা আবার রান্নার ঠাকুর হয়ে ভালো কামাচ্ছে। কয়েক মাস আগে পাঁচুর কাছে নিজের কাজের কথা বলতেই পাঁচু রেগে উঠে বলে, ‘আগে গেলাটা কম কর্। শেষকালে তোকে নিয়ে বিপদে পড়ি।’

বাবার মত এটাই হীরুর সব থেকে বড় সমস্যা। প্রতিদিন সকালে উঠেই ভাবে,‘না, আজ আর ওটাকে ছুঁয়েও দেখবে না।’ সেই মত কাজে বেরোয়।কোন দিনই খুব একটা ভালো কাজ পায়না।তাও দুপুরের দিকে হাতে একটু টাকা এলেই পেটের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনা। সোজা বাজারের বটতলার নিচের চায়ের দোকানটাতে চলে যায়।

– এই হীরু, ঠিক আছিস? দু’বালতি জল তুলে দিবি?

কথাগুলো হীরুর গায়ে লাগে। সকাল থেকে পেটে এখনও কিছু ঢালেনি।গতকাল সেই সন্ধে বেলাতে যা একটু খেয়েছে।কিন্তু জোরে তো বলা যায় না। আস্তে আস্তেই উত্তর দেয়,‘কি যে বল। সকাল থেকে জল তুলে তুলে এলা মেরে গেলাম।’

– সেন কাকু, এখন হীরুদের পোয়া চৌদ্দ। আজকে নিয়ে তিন দিন হল হীরু সমানে জল তুলে যাচ্ছে।

হীরুর কানে কথাগুলো গেল। লোকটার মুখটা দেখা যাচ্ছে না।কুয়োর একটা থাম্বাতে মুখটা আটকে আছে।একটু আগে এই অন্য টাউনশিপে জলের ট্যাঙ্কি করে জল বা পানের জন্যে পাউচে জল দিলেও এখানে কেন দিচ্ছে না, পাউচের জলে গন্ধ এই সব কথাগুলো শুনছিল।হীরু ঘাড়টাকে বকের মতো একটু পাশে সরাতেই দেখল টি’টাইপের বাপ্পা।শালা সরকারি বাস চালায়।সন্ধে বেলাতে খানের চায়ের দোকানের পিছনের দিকে বসে বসে গেলে।কয়েক বছর আগে একবার চাকরিতে কি একটা সমস্যা হয়েছিল।কিন্তু হাতে টাকা আছে তাই ভদ্রলোক।আর হীরু বামুনের ব্যাটা তাও সবাই তুই তোকারি খিস্তি খাস্তা করে।

– শোনো গো আমি পুকুরের নোংরা জল তুলে দি না।কুয়ো থেকে দড়ি বালতি দিয়ে জল তুলে ঘরে দিয়ে আসি।এখানে আবার ড্রাম ভরতে দিচ্ছে না।আমাদের পাড়ার কুয়ো থেকে জল তুলছি।

– হীরুদা কাল জল না এলে আমাদের এক ড্রাম দিয়ে দেবে ?

কথাগুলো শুনে হীরু ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকায়। টি’টাইপে থাকে।একবার বাগান পরিষ্কার করতে ডেকে ছিল।টাকা নিয়ে খুব কাঁইটামো করে। সে করুক গে।অতো সব মন রেখে কি করবে? হীরু উত্তর দেয়, ‘দেব, কিন্তু সাতশ টাকা লাগবে।’

– সাতশ!এক ড্রাম জল দিতে সাতশ টাকা।

হীরু ভদ্রমহিলার কথার কোন উত্তর দেয় না।ঘন্টা খানেক আগেই এই টি টাইপের তিপান্নের একে জল দিতে গিয়ে চারের ভদ্রমহিলার চিৎকার শুনেছে।কার কাছ থেকে একড্রাম জল কিনেছেন, সেই জলে নাকি খুব গন্ধ।স্নান করা, বাসন মাজা কোন কাজই হবে না। কে দিয়েছে এখন। হীরু কথাগুলো মনে করে বেশ গর্ব অনুভব করে। মদ খাক আর যাই খাক, কেউ বলতে পারবে টাকা নিয়ে বাজে জল দিয়েছে।

– সে সব বুঝলাম, কিন্তু একটু কম কর হীরুদা।সাতশটা খুব বেশি।

টাউনশিপের সব লোকগুলো সমান। এমনিতে শুধু বড় বড় কথা কিন্তু কাউকে টাকা দিতে হলেই সাত পাঁচ ভাবে। গতকাল দুপুরের দিকে জল তুলতে এসে একটা বৌয়ের কথা শুনছিল। তখনও একটাও ঘড়ঘড়ি ফাঁকা ছিল না। বৌটা বি টাইপের কোন একটা কোয়ার্টারে থাকেন। কোয়ার্টারটা হীরুর ঠিক মনে পড়ল না। ঘরে নাকি কুড়ি লিটারের জলের জার ভর্তি। ওনার বর ঐ জলে স্নান করতে বলে গেছে। এই সব কথাগুলো শুনে হীরুর ঝাঁট জ্বলে যায়।কম্পানির কেনা জলে স্নান করবে, পোঁ..।

– হবে না বৌদি।এখন সবাই টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। ড্রামের ভাড়া কয়েকদিন আগেই কুড়ি টাকা ছিল, এখন মওকা বুঝে পঞ্চাশ, ভ্যানের ভাড়া একশ, এরপর আমাদের দু’জন আছে। কেউ পাম্প চালাতে দেয়না। ছোট বালতি করে জল তুলতে খুব কষ্ট।

ভদ্রমহিলা কিছু সময় চুপ থেকে বলে ওঠে,‘অন্যান্য টাউনশিপে পরশু সকালেও জল দিয়েছে। একমাত্র আমাদের এখানটাতেই এই রকম অবস্থা হলো।’

‘বৌদি বন্ধ কারখানাতে প্রতিদিন যে জল পাচ্ছো এটাই বিরাট ব্যাপার।তার উপর আমাদের থেকে জলের জন্যে কিন্তু কোন টাকা নেয় না।’

পাশের থেকে একজন বলে উঠল।

হীরুর এই সব ভাটের কথা শুনে কোন কাজ নেই।এই রকম যতদিন চলে ততদিনই ভালো, কিছু কাঁচা টাকা হাতে আসবে। এমনিতেই কাজের অবস্থা খুব খারাপ।

 

এটা নিয়ে পাঁচদিন হলো, যে কুয়োটা অন্য সময় আড্ডা মারবার জায়গা হতো এখন অন্ধকার থাকতে লোকজনের ভিড়।বাগানের বাইরে নিজের থেকে বেড়ে ওঠা টগর গাছ থেকে ফুল তোলবার সময় চৌধুরি কাকিমা মাঝে মাঝেই কুয়োর দিকে দেখছিলেন। বাইরে তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি।এদিকে বাইরে টগর গাছে সেরকম ভাবে ফুলও ফুটছে না। দুএকটা যা ফুটছে তাও অন্ধকার থাকতে সবাই এসে তুলে নিয়ে পালাচ্ছে। ফুল না বলে তুললে আবার চুরি হয় না।কয়েকদিন আগেই অন্য পাড়া থেকে একজন স্থলপদ্ম চাইতে এসে সে’কথাটাই বললেন।চৌধুরি কাকিমাকে ফুল চাইলে তিনি দেন, কিন্তু চুরি করলে খুব খারাপ লাগে, চুরি করতে বারণ করেন। আসলে ফুল নেওয়ার সাথে লোকগুলো ডাল পালা সব ভেঙে দেন। কিছু বললেই তখন সব দার্শনিক কথাবার্তা বলেন, ‘ফুলই তো নিচ্ছি/ ফুল তোলাকে কি চুরি বলে/ঠাকুরের জন্যেই তো নেওয়া।’ আরে বাবা এখন গাছের খুব দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে সার আছে, টব আছে, খোল আছে একটা লোক প্রতি মাসে বাগানের কাজ করে। তার উপর গাছের পিছনে পরিশ্রম আছে। চৌধুরি কাকিমার বড় ছেলে অবশ্য তার মাকে সকাল বেলায় চিৎকার করতে বারণ করে বলে, ‘কেউ ফুল চাইতে এলে তাকে মগ আর বালতি নিয়ে বাগানে জল দিতে বলবে।আর কিছু টাকা দিতে বলবে, খোল, বোন ডাস্ট, কোকোপিট, গাছের চারা সবের এখন খুব দাম।’

চৌধুরি কাকিমা ঈশৎ রেগে উঠে বলেন, ‘তোর যেমন কথা বাইরের পাড়ার সবাই ফুল চায়, চুরি তো করে সব এই পাড়ার লোকগুলো।গাজুর মা, মানসির মা, আগুয়ানের বৌ এরা।’

গাজুর মা এই পাড়ার এক্কেবারে স্ট্যাম্প মারা মহিলা।আজও সকালে ফুল তোলবার সময় চৌধুরি কাকিমার কানে গাজুর মায়ের সাথে মুখার্জীবাবুর ফিসফিসানি কানে আসে।প্রতিদিন অন্ধকার থাকতে গাজুর মায়ের সাথে মুখার্জীবাবুর গল্প চলে। অনেকেই কয়েকমাস আগে পর্যন্ত জল ট্যাঙ্কের মাঠে দু’জনকে হাতে হাতে ধরে হাঁটতে দেখেছে।তাদের পাশের বাড়ির টুপুরদি আবার এটা দেখেই মুখার্জীবাবুকে ঐ জায়গাতেই চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘দাদু, তোমার লজ্জা করে না।আমি আজই বাপন কাকুকে বলছি। ঐ জন্যে দিদিমাকে চিকিৎসা না করিয়ে ফেলে রেখে ছিলে।’

– আমার কোন দোষ নেই, শোন এই টুপুর শোন, কাউকে কিছু বলতে হবে না।

মাঠের মাঝেই মুখার্জীবাবুর চিৎকারেরর মাঝে টুপুর গাজুর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,‘কাকিমা, তোমারও লজ্জা হওয়া উচিৎ। বাড়িতে নাতনি রয়েছে, আর তুমি এখানে নোংরামো করছো?’

গাজুর মা কোন উত্তর দিতে পারেনা।আমতা আমতা করে।

টুপুরদি বলে যায়, ‘তোমার তো শুধু এটা নয়, অনীল কামার কাকুর সাথে এই ভাবে তোমাকে দেখা গেছে। দিলিপ মিত্র কাকুতো তোমার ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।এখন মনে হচ্ছে তোমার বরটা আরো অনেকদিন বাঁচত।তোমার জন্যেই এতো তাড়াতাড়ি মারা গেল।’

এ’কথা গুলো টুপুটের মুখ থেকে শুনে তার মা পাড়ার সবাইকে জানিয়ে বলে, ‘কাউকে কিন্তু বলবেন না।’

– মুখার্জীদা জল কবে আসবে কিছু খবর পেলেন?

– কি করে খবর পাবো, আমি কি সব খবরের ঠিকা নিয়ে বসে আছি, যে যখন চাইবে শুধু সব খবর জানিয়ে যাবো।

– না আপনি বা বাপন দুজনার বিভিন্ন জায়গায় অনেক জানাশোনা আছে, তাই ভাবছিলাম যদি কোন খবর কোথাও পান।

– ঘরে পেপার টেপার নাও না, নাকি খবর দ্যাখো না। এখনও জলই নামাতে পারেনি। জল নামাবে তারপর মেরামত হবে। আরো চার পাঁচদিন লাগবে।

চৌধুরী কাকিমা ফুল তুলবার সময় ইচ্ছে করে বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। একটু আগেই ফিসফিস করে কি সব কথা বলে মুখার্জীবাবু তার বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে গাজুর মা কথাগুলো বলে ওঠেন।এই পাড়ার সবাই গাজুর মাকে মুখার্জীবাবুর দ্বিতীয় বউ বলে।কারণে অকারণে ওনার বাড়িতে গিয়ে বসে থাকেন, গল্প করেন, এমনকি রাতেও মাঝে মাঝে ফোন করেন, মুখার্জীবাবু ফোন না ধরলে সেকথাগুলো আবার পরেরদিন সকালে নিজের মুখেই বলেন, ‘আপনাকে কালকে কতবার ফোন করেছিলাম, আপনি ফোন ধরেন নি।’

– তুমি যদি ফোন কর।

গাজুর মা কিছু উত্তর দেয় না, হা হা করে হেসে ওঠে তাও সব কথা বলতে হবে। এমনকি দিলিপ মিত্র কবে গাজুর মাকে কোন একটা অশ্লীল ইঙ্গিতের কথা বলেছিলেন সেকথাটাও মুখার্জীবাবুকে বলেন।মুখার্জীবাবু বলেন টুপুরদির মাকে।তার মাধ্যমে সে খবর ছড়িয়ে যায় সারা পাড়ায়।

– তোমার দু’টো ছেলে চাকরি করছে একটা জলের ট্যাঙ্কি বসাও। কত আর খরচা হবে?এই টাউনশিপে তোমরা ছাড়া আর কেউ জলের ট্যাঙ্কি বসাতে বাকি রাখেনি।

শুনতে খারাপ লাগলেও কথাগুলো সত্যি।এই বি’টাইপ কোয়ার্টারে প্রায় সবাই একটা দুটো কেউ কেউ আবার চারটে ছোট ট্যাঙ্কির সাথে দু’হাজার লিটারের জলের রিসার্ভবার পর্যন্ত বসিয়ে নিয়েছে।একদিন জল না এলেও সে অর্থে অনেকেরই কোন অসুবিধা হয় না। কিন্তু একদিন জল না এলেও গাজু অথবা তার দাদা মুক্তকে জলের বালতি হাতে বাইরে বেরিয়ে পড়তে দেখা যায়।খুব একটা বেশি দূর যেতে না হলেও বেরতে হয়। মুখার্জীবাবু সে কথাটা বলতেই গাজুর মা উত্তর দেন, ‘চলে তো যাচ্ছে, ভুদুর মা তো বলেই যে যতখুশি জল নিয়ে যান, স্নান করুন। আমি তো প্রতিদিন ওদের কুয়োর জলেই স্নান করছি।এরা পুকুরে যাচ্ছে।তাছাড়া কোথায় পাবো বলুন এখন একটা জলের ট্যাঙ্ক বসাতেই কুড়ি থেকে তিরিশ হাজার টাকার ধাক্কা।আমার ছেলেরা তো সরকারি কাজ করে না।’

এই কথাগুলো চৌধুরী কাকিমাকে শুনিয়ে বললেন।এই পাড়াতে একমাত্র তাঁরই দুই ছেলে সরকারি কাজ করে। ওদের কোয়ার্টারের বাগানে দুটো জলের ট্যাঙ্কি।এই পাড়াতে এটাই ওনার কোয়ার্টারের ল্যাণ্ডমার্ক।গাজুর মা সময় পেলেই চৌধুরী কাকিমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথা বলেন।

–এটা ভুল কথা, তোমার সব সময় নেই নেই করা একটা স্বভাব।দাসবাবুও তো কম টাকা পায়নি।এম.আই.এসের থেকে টাকা পাও। নিজেতো ছেলেদের একটা টাকাও দাওনা।নিজের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স তো কম হয় নি, তারপরে আবার বিধবা ভাতার টাকা পাও, কম দামে রেশন পাও।

–দ্যাখেন অতো টাকা থাকলে কি আর এইরকম অবস্থা হয়, টাকা নেই।

মুখার্জীবাবু এবার একটু রেগে উঠে উত্তর দেন, ‘শোনো, তোমাদের সব এম.আই এসগুলো আমি করিয়েছিলাম।কতটাকা জমা আছে, আর কত টাকা পাও আমি সব জানি।’

– কি জানেন মুখার্জীদা।চৌধুরী কাকিমা মুখ ঘুরিয়ে একবার দেখে নিলেন, দিলিপ মিত্র চলে এল।

কয়েকদিন আগে মোড় মাথাতে কে যেন এক জন বলেছিল,‘দিলিপ দা, তোমাকে কি বৌদি সকাল হলেও এক লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়।’

– আমার বৌ’য়ের বাপের ক্ষমতা আছে? আমি কখন বেরোব, কখন থাকবো আমার ব্যাপার, এনেছি ঘরে মাথা নিচু করে থাকবে।

চৌধুরী কাকিমার কানে কথা গুলো ভাসে। কয়েকদিন আগেই বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। আগের মাসেও মুখার্জী বাবু দিলিপকে ধমকে বলেন,‘এমন ভাবে এই সময় বাইরে বাইরে ঘুরো না। একটু বাড়িতে থেকো, বিশ্রাম নাও।’  টুপুরের মা বলে,‘গাজুর মায়ের ঘামের গন্ধ না শুঁকলে দিলিপের খাবার হজম হবে না। বৌ’টাকে তো খুব মানসিক অত্যাচার করে, নিজে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, বৌটাকে ঘর থেকে এক্কেবারে বেরোতে দেয় না, খুব অশান্তি করে।এই তো সকালের দিকে গাজুদের ঘরে বসে থাকে, একটু বেলা বাড়লে তখন আড্ডা মারে সাহাদের ঘরে। ভদ্রলোক থাকেন না, আর এই দিলিপ বুড়ো ভাম ওর বৌটার কাছে বসে থাকে।’

– আপনাদের জল এসেছে?

– কেন আমরা কি মঙ্গলগ্রহে থাকি? কিভাবে জল আসবে?

– না আপনাদের ডাউনের দিক তো অনেক ক্ষণ জল থাকে।

– কাল পর্যন্ত বাগানের কলটাতে হাল্কা পড়ছিল।কতজন জল নিয়ে গেল, সামনের ধোপাদের কুয়ো আছে, আমার কোয়ার্টার থেকে খাবার জল নেয়। আজ আর পড়ছে না।

চৌধুরিকাকিমা ফুল তোলবার সময় তাদের কথাবার্তাতে অনেক কিছু জানতে পারে।শুধু এই জলের কোন সঠিক খবর পায় না। প্রতিদিন খবরের কাগজ বা টিভির খবরে বিভিন্ন ভাসা ভাসা খবর এলেও ভরসা পায় না। এখানে খবর বলতে ব্যারেজে কম দামে মাছ বিক্রি হচ্ছে।

– মুখার্জীদা একটা জল তোলার লোক একটু দেখে দিন না। মুক্তোর কাল হাতে লেগেছে, আর আমার গাজু অতো জল তুলতে পারেনা।

– তা কেন বলছ, গাজুটা তোমার পেটের, ওকে দিয়ে বেশি জল তোলাতে চাইছো না। এমনিতেও তো গাজু ঘরের কোন কাজ করেনা। তোমার ঘরে যা কিছু করে সবই তো এই মুক্তো। আমি তো সারাটা সকাল বাড়ির বাগানে বসে থাকি, সব কিছুই দেখতে পাই।

– এমন বলেন না। জল তোলার লোক আছে কিনা বলেন।

– ঠিক আছে আমি বুধোকে বলে দেব।

– না না বুধোকে না, ওর জাতের ঠিক আছে নাকি, কোথা থেকে জল তুলে দিয়ে দেবে তখন আরেক ঝামেলা। এই তো মানসির মা কার থেকে দু’ ড্রাম জল কিনল।স্নান করে গায়ে কি সব বেরিয়ে গেছে।

– জাতের কথা বল না। এমন বলছ তোমরা যেন বড় বামুন।

– রেগে যাচ্ছেন কেন, একটু দেখে বলবেন।

– ঠিক আছে হীরুকে বলে দেবো।

– ঐ মাতাল টাকে?

– ও কিন্তু বামুন, সবাই এখন ওকে দিয়েই জল তোলাচ্ছে।

গাজুর মা কিছু সময় চুপ থেকে বলে উঠলেন, ‘ঠিক আছে তাই হবে।’

 

-ওরা লোক ভালো নয়, টাকা দিতে চাইনা, ওদের জল তুলে দিতে পারবো না।

মুখার্জীবাবুর কথাগুলো শুনে হীরু এই কথাগুলোই এক শ্বাসে বলে দেয়। মুখার্জীবাবু হীরুর দিকে তাকিয়ে একটু রেগে উঠে বলেন, ‘তোর খুব গরম হয়েছে, আগে এমন ছিলিস না, এই ক’দিনে তোকে সবাই জল তুলে দিতে ডাকছে আর তুই এই সব কথা বলছিস। আমিও দেখবো, তোর মেয়ে বড় হচ্ছে, বিয়ের সময় আমাকে দরকারে লাগবেই।’

এবার হীরু একটু শান্ত হয়ে বলে ওঠে, ‘কাকা শোন রেগে যেও না।আমি তো আর কারোর জল তুলব না বলছি না। ঐ দ্যাখো সামনের বি’টাইপের কোয়ার্টারের কাকিমাদের দু’তলাতে চারবার জল তুলে দিলাম।মাত্র কুড়ি টাকা দিয়েছে, আরেকটা কোয়ার্টারে একশ টাকা দিয়েছে, আমি কিছু বলেছি? যাদের টাকা পয়সা নেই তারা দিচ্ছে না ঠিক আছে, কিন্তু গাজুর মা টাকা পয়সা নিয়ে খুব ঝামেলা করে।আমিও তো গরিব।’

মুখার্জীবাবু কথাগুলো শুনলেও কোন উত্তর না দিয়ে কিছু সময় পরে জিজ্ঞেস করেন, ‘কাল সন্ধের সময় দেখলাম তুই স্বরূপদের জল তুলছিলিস।’

কথাগুলো শুনেই হীরু একটু থমকে যায়।এই পাড়াতে স্বরূপদের কোয়ার্টারের খুব বদনাম।সবাই এক রকম এক ঘরে করে রেখেছে। কোন কাজের লোক কাজ করতে যায় না, পাড়ার কোন লোক কোন সম্পর্ক রাখে না। এতে অবশ্য স্বরূপদের কোন অসুবিধা হয় না। উপর মহলে বিরাট জানাশোনা,বুক ঠুকে সবার সামনে কোয়ার্টারে মধুচক্রের ব্যবসা করে।সবাই জানলেও এড়িয়ে চলে।কয়েকটা মেয়ে কোয়ার্টারে থাকে। মাঝে মাঝে সকালের দিকে দোকানে আসে।একটা প্যাঁকলা মতন ছেলে থাকে। সেই সব কাজ করে।কয়েকদিন আগেই হীরুকে দু’ড্রাম জল তুলে দেবার জন্যে বলেছিল। এই অবস্থার মাঝেই একদিন একটা জলের বড় ট্যাঙ্ক কিনেছিল। তাও সন্ধের দিকে হীরুকে ডাকে।

কথাগুলো মুখার্জীবাবু হীরুকে মনে করিয়ে দিয়ে বলে, ‘এই খবরটা পাড়াতে ছড়িয়ে দিলে তোকে আর কেউ জল তুলতে বলবে না। এই কয়েকদিনে তো ভালোই কামালি, জল আসতে আরো তিন চারদিন লাগবে। এবার তুই চিন্তা কর।’

– চৌধুরিদি, বলেন না, কাল রাত সাড়ে দশটার সময় জলের ট্যাঙ্কি এনে জল ভরতে হল।বাইরের দু’হাজার লিটারের রিজার্ভভারটাতে জল ভরে নিলাম।আজ সকালে জল তুলব।

– কত নিল? মুখার্জীদাদের পনেরোশ, আমাদের পঁচিশ’শ। আমাদের যে বড় পাম্প নেই, ওরা বড় পাম্প আনল।সেই ভাড়া আর দু’জন লেবারের চার্জও নিয়ে নিল। মুখার্জীবাবুরা কেমন বদমাস দেখুন, পাশাপাশি থাকা, চেয়ে চেয়ে সব কিছু দেখল, কিন্তু মুখ ফুটে একবারের জন্যেও পাম্পটা দিল না।

চৌধুরী কাকিমা কথাগুলো শুনে গেলেও মুখে কিছু বলেন না। টুপুরের মা আর মুখার্জীবাবুদের পাশাপাশি দু’টো কোয়ার্টারের মধ্যে খুব কম্পিটিশন। দু’জনায় কোয়ার্টারের বাইরেটাকে অট্টালিকার মত বড় করেছে। বাইরে বড় জলের ট্যাঙ্ক, সব থেকে বড় কথা হল এদের আজ মিস্ত্রী লাগলে ওদের কাল মিস্ত্রী লাগবেই।

চৌধুরী কাকিমা কোন কথার জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘জলের কোন খবর নেই তো?’

– না না কোথায় পাবেন, এখনো দিন চার লাগবে বলছে।

– কি অদ্ভুত ব্যাপার। একটা শহরে এত দিন ধরে জল নেই। অন্য কোন বড় শহরে ঘটনা ঘটলে এতক্ষণে ব্রেকিং নিউস হয়ে আলোচনা আরম্ভ হয়ে যেত।তবে আমার বড় ছেলে গতকাল ব্যারেজে গেছিল। এখনও তো জলই নামেনি।এবার আগের বারের মত অত লোক জনও যায় নি। কয়েক বছর আগেও ঠিক একই ভাবে লক গেট ভেঙে গেছিল। অত বড় নদ এক্কেবারে শূন্য।এক দিকে বুকে ফুট বলের ম্যাচ খেলা যাবে। দেখে কে বলবে এই নদের জলের উপরেই এই শহর দাঁড়িয়ে আছে। শ্বাস নিচ্ছে, পান করছে, এমনকি সব কারখানাগুলো চলছে এই নদের জলেই।লোকজন অত শত বোঝেনা, অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে।না হলে শহরে জল নেই আর শহরের মানুষ গেছিল নদের বুকে মেলা দেখতে।তবে এবারে যারা যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগ জনই খবর নিতেই যাচ্ছে।

-কাল রাতে আবার কারেন্ট চলে গেছিল। আমরা তখন খাচ্ছিলাম।ভয় পেয়ে গেছিলাম, জলের সাথে কারেন্টও চলে গেল নাকি রে বাবা। ইনভার্টারের আর কতক্ষণ টানতে পারে।খবরের পোর্টালে কয়েকদিন ধরেই খবর দিচ্ছে, ‘এই কারখানার উৎপাদন ব্যাহত/ঐ কারখানায় একটা শিফ্টে কাজ হচ্ছে।’ আরে বাবা কারেন্ট না তৈরী না হলে লোকে ব্যবহারটা করবে কিভাবে ? কেউ আবার বলছে ব্যারেজের গার্ডদের সাথে জেলেদের গোপন বোঝাপড়ার জন্যেই এই অবস্থা। মাছ ধরবার জন্যেই নাকি ব্যারেজের লকগেট গুলো ওঠা নামা করায়।

সকালে চৌধুরী কাকিমা আর টুপুরের মায়ের কথাবার্তার মধ্যে সব কথায় উঠে আসে। কোথায় কাউন্সিলারকে মেরেছে সে কথাটাও আলোচনা হয়।মারাটাই স্বাভাবিক, একটা শহরে এতদিন ধরে জল নেই লোকে কি করবে, জন প্রতিনিধিদের পুজো করবে?

কথা বলে চলে যাবার সময় টুপুরের মাকে চৌধুরী কাকিমা ডেকে বলেন, ‘আপনাদের বাড়িতে তো অনেক লোক আসে, আমাদের একটা বালতি গতকাল কুয়োতে পড়ে গেছে। ছোট ছেলে জল তুলতে গেছিল।’

– আমাদের কাবু বলছিল, অনেকের বালতি কুয়োতে পড়েছে। আমি কাবুকে বলে দেবো।ঐ পল্লিটাতে সবার ঘরেই কুয়ো আছে, ওরা থালা বাটি পড়লেও কুয়ো থেকে তুলতে পারে। আমি কাবুকে দিয়ে কাউকে ঠিক বলা করাবো।হীরু তো আমাদের ঘরে প্রায়ই আসে। কাবুর কাজ করে। কিন্তু ওর একটাই সমস্যা। পেটে পড়ে গেলে আরে দিন রাতের হুঁশ থাকে না।

– ওর বাড়িতে কেউ কিছু বলে না।

– কে বলবে, আছে তো ওর বউ।ওদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে ওরই কোন ছেলে মেয়ে নেই।ব্রাহ্মণ তো, বউটাও কয়েকটা বাড়িতে রান্নার কাজ করে। হীরু যা রোজগার করে সব তো মদেই যায়।

পাড়াতে ঢুকতেই বি’টাইপের আশি নম্বরের সতনাম সিং এর তিনটে ছেলেই বেরিয়ে পড়েছে। তাদের সাথে আছে তাদের গাড়ির ড্রাইভার ও ক্লাবের কয়েকটা ছেলে।জলের ট্যাঙ্কিটা ওদের বাড়ির দিকে না গেলে আর কোথাও যেতে দেবে না। এদিকে সান্যালের বাড়ির থেকেও ছেলেটা বেরিয়ে খুব চেল্লাচ্ছে।চৌধুরী কাকিমার বড় ছেলেটা বাইরে বেরিয়ে একবার দেখে নিল।ওদের বাড়ির গেটের কাছেই জলের ট্যাঙ্কিটা দাঁড়িয়েছে। চৌধুরী কাকিমা আস্তে আস্তে বলেন, ‘দু’বালতি নিয়ে আসবো?’ বড়ছেলে একটু রেগে উত্তর দেয়, ‘কুয়ো থেকে কত জল আনলাম বলতো। কাল কাকার ওখান থেকেও গাড়ি ভর্তি করে জল এনেছি। পাড়ার সবাই হাঁ করে দেখছিল। লোকে শুনলে হাসবে প্রাইভেট কার করে জল বয়ে আনা হল। সব কিছু ভিজেও গেল। এর পর যদি জল চাও একটা বড় জলের ট্যাঙ্কি বলে দিচ্ছি।’

– সেটা হলে তো ভালোই হত, কিন্তু অত জল রাখব কোথায়? এখনও বাথরুমের ট্যাঙ্কে জল আছে।

– আমরা কিন্তু একটা অদ্ভুত একটা কাউন্সিলার পেয়েছি। ছয়দিন ধরে জল নেই ওনার কোন পাত্তা নেই।কয়েকটা প্যাঙাকে দায়িত্ব দিয়েছে, ওরা এখন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে মস্তানি করছে।খাওয়ার জলের প্যাকেট দিচ্ছে তাও বাড়িতে চারটে করে। এক কাপ, কার গলায় ঢালব বলতো? শুনলাম ওরা নিজেরা নাকি বস্তা বস্তা জলের পাউচ নিজেদের বাড়ি ঢোকাচ্ছে। আর ওদিকে টুপুরদির মা বলে বেড়াচ্ছে, ‘আমার কাবুর গাড়িতেই সব কিছু হচ্ছে। নিজের পকেটের তেল পুড়িয়ে পাড়া সেবা হচ্ছে।’

‘এমন করে চলতে পারেনা।আগের আমলেও তোমরা দাদাগিরি করেছ এখনো করবে নাকি?’

চৌধুরী কাকিমার বড় ছেলে চমকে ওঠে, ‘নিশ্চয় সান্যালদা আবার খেপেছে।আগেও চিৎকার করত। সেই যে’বার ঘোষরায় কাকুর বাড়ির সামনে জলের ট্যাঙ্কি লেগেছিল, সান্যালদা খুব রেগে গেছিল। মনে আছে চিৎকার করে বলছিল, ‘কাউন্সিলার বলে সাপের পাঁচ পা দেখেছেন, জলের ট্যাঙ্কি এলেই নিজের বাড়ির কাছে দাঁড় করাচ্ছেন।আমরা কি এখানে থেকে পাপ করছি।’

সেই দিন পরিস্থিতি বেশ গরম হয়ে উঠেছিল। আজও কি? চৌধুরী কাকিমার ছোট ছেলে এসে বলে, “যাও, জলের ট্যাঙ্কারটা চলে গেল।বিশু আর পাপু লেকচার দিচ্ছিল, ‘দু বালতির বেশি কাউকে জল দেবো না।’ এবার ভাবো।”

– হ্যাঁ, জলটা ওদের বাবার।
– পাপু আগে ওদের দলের হয়ে কাজ করত, এখন এদের দলের? চৌধুরী কাকিমার বড় ছেলে জিজ্ঞেস করে।
– চাকরিটা বাঁচাতে হবে তো।

ছোট ছেলে বলে।

বাইরে একটা অটো দাঁড়াবার আওয়াজ আসে। চৌধুরী কাকিমার বড় ছেলে দেখে তাদের কোয়ার্টারের সামনের দিকে দাঁড়ানো একটা অটো থেকে ড্রাইভার ভদ্রলোক কুড়ি লিটারের জলের জারগুলো বের করে উপরে তলায় তুলছে।

– বাবারে, উপর ওলা কত জল কিনবে রে? কাল থেকেই দশ বারোটা জার নিল। চৌধুরী কাকিমা বলে উঠলেন।

– কাল সন্ধেবেলায় দুটো ছোট বালতি নিয়ে মাঠে দাঁড়ানো ট্যাঙ্কিটা থেকে জল ভরতে দেখেছি।বড় ছেলে।

– জলের পাউচ নেবার জন্যেও গাড়িটার পিছন পিছন মেয়েটা ছুটছিল।

ছোট ছেলের মুখে কথাগুলো শুনে বড় ছেলে বলে ওঠে,‘যাক, তাও পাড়ার থেকে জলের পাউচ নিল। এমনিতে তো দিন রাত জানলা বন্ধ করে বসে থাকে।’

এপাড়ার আরো অনেকের মত চৌধুরী কাকিমাদের উপর তলার কোয়ার্টারের দে কাকিমা সবার সাথে সেরকম ভাবে মেশেন না। বয়স এখন সত্তরের আশে পাশে হলেও বেশ বর্ণময় চরিত্র।তিনটে বিয়ে করবার পরেও আরো অনেক সম্পর্কে জড়িয়ে গেছিলেন।পাড়াতে কারোর সাথে কথা বলেন না, এমনকি কোন পুজোতে চাঁদাও দেন না। এখন জলের প্রয়োজন কাউকে কিছু বলতেও পারেন নি।গত পরশু জল স্নানের জল কিনেছিলেন।দুটো লোক কোথা থেকে দু’ড্রাম জল এনে ব্যালকোনি থেকে শাড়ি নামিয়ে বালতি বেঁধে উপরে জল তোলে। ওরাও দুটো ড্রামের জন্য আটশ টাকা নেয়।জল পেয়ে দে কাকিমা চিৎকার আরম্ভ করেন। ‘এ রাম, পচা ড্রেনের জল দিলে।এই জলে কি ভাবে কাজ হবে?’

লোকদুটোও খুব বদ।কোন কথা না বলে আটশ টাকা নিয়ে বেরিয়ে যায়। পাড়ার সবাই শুনে বলে, ‘ঠিক হয়েছে, যেমন কিপটামি করবে তেমন অবস্থা হয়েছে। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করলে এমনিই পাড়ার ছেলেরা জলের ব্যবস্থা করে দেয়। নিজেরা না পারলে কাউকে বলে কয়েও তো জল তোলানো যায়। গাড়িতে কুয়োর জল ভরে সব বাড়ি বাড়ি ঘুরে জল তো দিয়েছে। কেউ না থাকুক আমাদের হীরু তো আছে।’

– আমাদের টাউনশিপটা খুব ভালো। ছ’দিন জল নেই।এমনকি দেখুন কাল রাতে সব জায়গায় জল চলে এলেও আমাদের এখানে জল নেই। তাতেও না ঝগড়া না ঝামেলা।

টি’টাইপের একশ চারের তিন নম্বরের বোসবাবুর ছেলের কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বি টাইপের গাঙ্গুলি বাবু উত্তর দেন, ‘এখানে কে ঝামেলা করবে বলতো? সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত, এর মাঝে নিজেদের মত করে জল ভরছে। কেউ কুয়ো থেকে জল টানছে, আর যাদের পয়সা আছে জলের ট্যাঙ্কি কিনছে। কাবুরা, বাচ্চুরা মুখার্জীদারা কিনল। আমাদের এম. আই.এসের উপর সংসার, ছেলেও এখনো দাঁড়ায় নি, অগত্যা আমাদের এই কুয়োর জলই ভরসা। বড় বালতি না পারলে ছোট বালতিতে জল তুলে নিয়ে যাবো।’

শুনলাম সেন্টারের দিকে সরকারের কোন জলের ট্যাঙ্ক আসেনি।ওরাও অবশ্য রাস্তা অবরোধ করেনি। পাশে দাঁড়ানো জাফরের ব্যাটা বলে উঠল।

– ওদের গাদা টাকা। সব ঘরে দুটো তিনটে করে গাড়ি। দু পাঁচ হাজার ওদের কাছে কোন ব্যাপার হল নাকি?এটা সেই গাঙ্গুলি বাবু বলে উঠলেন।

কুয়োর কাছে জল ভরবার ফাঁকে দুপুর নেমে এল। টাউনশিপে এই কয়েক দিন প্রায় সবার দুপুরের খাবার খেতে দেরি হচ্ছে। দুপুরের দিকে কুয়োতলাতে ভিড় বাড়ে। কতগুলো লোক আবার কুয়োর কাছেই স্নান করে।এদের বুদ্ধি বৃহস্পতির থেকেও বেশি। প্রথম প্রথম কয়েকজন কুয়োর ধারে কাচাকাচিও করত।পরে লোকজন চেল্লালে এই সব বন্ধ করে। নিজেদের মধ্যে এই সব আলোচনার মাঝেই হীরু একটা দড়ি নিয়ে কুয়োর কাছে আসতেই জাফর জিজ্ঞেস করে, ‘কি হল গো শুধু দড়ি নিয়ে, বালতি কই? কুয়োর নিচে নামবে নাকি?’

– না, ঐ একটা বালতি নিচে পড়েছে, তুলে দিতে হবে। হীরু একটু হেসে বলে ওঠে।

– তুই খেপেছিস নাকি? এখন সবাই জল তুলছে, কবে জল আসবে তার ঠিক নেই তার মধ্যে তুই চলে এসেছিস বালতি তুলতে। বোসবাবু একটু জোরেই বলে উঠলেন। এই ক’দিনে অনেকগুলো বালতি কুয়োতে পড়ে গেছে। একটা তুলতে গেলে আরো কয়েকটাও উঠবে। হীরু একটা স্বপ্ন দেখে। প্রতি বালতিতে একশ টাকা নিলে…কিন্তু সবাই কি টাকা দেবে? গাজুর মায়ের মত তো অনেকেই আছে। এক্ষুণি বলবে, ‘আমি কি বালতি তুলতে বলেছিলাম?’ এখানকার লোকগুলোও বদ। কতবার যে ফিরতে হল তার ঠিক নেই।

এখনো জলটা স্বাভাবিক না হলেও আট দিন পর জল এসেছে।কাল সকালে অবশ্য শুধু নিচের তলাতেই জল এসেছিল। উপর তলার লোকগুলো খুব চেল্লাচ্ছিল। চৌধুরী কাকিমার উপরের দে কাকিমা একটু বেলার দিকে চিৎকার আরম্ভ করে, ‘উপর তলার লোকগুলো কি মানুষ নয়, জল না পেলে ওরা কিভাবে চালাবে, একবারের জন্যে কেউ ভেবে দেখে না।’

চৌধুরী কাকিমার কোয়ার্টারে টুপুরের মা এসে সব শুনে বলে ওঠেন, ‘কাকে শোনাচ্ছে? আছি তো আমরা, শুনে কি করব?’ নদের একদিকটা পুরো শুকনো হয়ে গেছিল। সবাই বলছিল অন্য জায়গা থেকে জল ছাড়লে এখানে আসতেই আট থেকে ন ঘন্টা লাগবে। তারপর ফিডার ক্যানেল ভর্তি হবে। সেখান থেকে ট্যাঙ্কে জল উঠবে, ফিলটার হবে, তারপর সবাইকে জল দেবে। বেকার চেল্লালে তো কিছু হবে না। এই অসুবিধাটা এই শহরের কম বেশি অনেকের হয়েছে।কত লোক পুকুরে স্নান করতে গেছে, কাপড় কাচতে গেছে।কত লোক জল তুলে কিছু টাকাও কামিয়েছে।নদের থেকে মাছ এনে অনেকে বিক্রি করেও কিছু টাকা রোজগার করেছে।

– জল এখন স্বাভাবিক। কুয়োতে ভিড় নেই, জলের ট্যাঙ্কের বা কুড়ি লিটারের জলের জার নিয়ে এদিক ওদিক হুটোপাটি নেই। হীরুকে আর পাড়াতে দেখা যায় না। এখন সাহা মার্কেটে সব্জির আরোতে কাজে চলে যায়।সেখান থেকে একটু বেলা হলে আরেকটা দোকানে কাজ থাকে।সকালে তার সাথে দেখা হলে অনেকেই একবার করে বলে, ‘হীরু আমার বালতিটা একটু সময় করে তুলে দিবি/দেবে।’

– এই যে কাকিমা আজ বিকালে কাজ থেকে ফিরে তুলে দেবো। এখন তো যখন খুশি তোলা যাবে, জলটা ঘোলা হয়ে গেলে কেউ চেল্লাবে না।

অবশ্য কথাগুলো বললেও হীরুকে বিকালের দিকে কোন দিনই সময়ে সুস্থ ভাবে পাওয়া যায় না।কাজ থেকে ফেরার রাস্তায় বটতলা, তার নিচে একটা চায়ের দোকান। কাজ থেকে ফিরে এখন হীরুর আড্ডা ওখানেই।

This image has an empty alt attribute; its file name is 23579pppp-Copy.jpg

About S M Tuhin

দেখে আসুন

মাটির হাঁড়ি : আহমেদ সাব্বির

মাটির হাঁড়ি আহমেদ সাব্বির মোকাম আলী খান হান্ড্রেড পার্সেন্ট ভদ্রলোক। কাদার মতো নরম মানুষ। কথা …

1,131 কমেন্টস

  1. I have been looking everywhere a post about this.

  2. I am a big fan of this website. Thank you for keeping it going

  3. I am often to blogging and i really appreciate your content. The article has really peaks my interest. I am going to bookmark your site and keep checking for new information.

  4. I don’t need to tell you how important it is to optimize every step in your SEO pipeline. But unfortunately, it’s nearly impossible to cut out time or money when it comes to getting good content. At least that’s what I thought until I came across Article Forge… Built by a team of AI researchers from MIT, Carnegie Mellon, Harvard, Article Forge is an artificial intelligence (AI) powered content writer that uses deep learning models to write entire articles about any topic in less than 60 seconds. Their team trained AI models on millions of articles to teach Article Forge how to draw connections between topics so that each article it writes is relevant, interesting and useful. All their hard work means you just enter a few keywords and Article Forge will write a complete article from scratch making sure every thought flows naturally into the next, resulting in readable, high quality, and unique content. Put simply, this is a secret weapon for anyone who needs content. I get how impossible that sounds so you need to see how Article Forge writes a complete article in less than 60 seconds! order here.

  5. I don’t need to tell you how important it is to optimize every step in your SEO pipeline. But unfortunately, it’s nearly impossible to cut out time or money when it comes to getting good content. At least that’s what I thought until I came across Article Forge… Built by a team of AI researchers from MIT, Carnegie Mellon, Harvard, Article Forge is an artificial intelligence (AI) powered content writer that uses deep learning models to write entire articles about any topic in less than 60 seconds. Their team trained AI models on millions of articles to teach Article Forge how to draw connections between topics so that each article it writes is relevant, interesting and useful. All their hard work means you just enter a few keywords and Article Forge will write a complete article from scratch making sure every thought flows naturally into the next, resulting in readable, high quality, and unique content. Put simply, this is a secret weapon for anyone who needs content. I get how impossible that sounds so you need to see how Article Forge writes a complete article in less than 60 seconds! order here.

  6. Being a digital marketer today is definitely not easy! Not only do you need high-quality content, you need a lot of it. But creating good content is incredibly time consuming. At least that is what I thought until I came across WordAi… In case you have never heard of WordAi, it is a lightning fast content rewriter that uses Artificial Intelligence to automatically create unique variations of any piece of content. The best part is, WordAi creates rewrites that both humans and Google love.  I know, that’s a bold claim and I was pretty skeptical myself. So I decided to test their claims with their free trial and can tell you honestly, I opted directly for the yearly subscription after that. I’m not exaggerating when I tell you that WordAi is better than any other tool, service, or method on the market. I have been using WordAi to fill out my blogs and have already covered the cost of my yearly subscription. Its crazy but Im just scratching the surface of how far I can scale my SEO with WordAi! While I am using WordAi to scale my SEO efforts, you can also use WordAi to diversify your copy or even brainstorm to beat writers block! I could tell you about WordAi all day, but you really just need to try it for yourself. They are so confident in their technology that they offer a completely free 3-day trial AND a 30-day money back guarantee. So what are you waiting for? Click here to get started with WordAi for Free! Register here and get a bonus.

  7. My relatives all the time say that I am killing my time here at net, but I know I am getting
    knowledge every day by reading such pleasant posts.

  8. Heya i’m for the first time here. I came across this board and I find It really useful & it helped
    me out a lot. I hope to give something back and help others like
    you helped me.

  9. It’s a shame you don’t have a donate button! I’d most certainly donate to this superb blog!
    I guess for now i’ll settle for bookmarking and
    adding your RSS feed to my Google account. I look forward to fresh
    updates and will share this website with my Facebook group.
    Talk soon!

  10. Appreciate this post. Let me try it out.

  11. What’s up friends, its great piece of writing regarding tutoringand
    fully defined, keep it up all the time.

    my blog; เว็บข่าว

  12. Hey There. I found your blog using msn. This is a very well written article.
    I will make sure to bookmark it and come back to read more
    of your useful info. Thanks for the post. I will certainly return.

    Also visit my web site … А片

  13. With havin so much content and articles do you ever
    run into any issues of plagorism or copyright violation? My blog has a lot of unique content I’ve either created myself or
    outsourced but it appears a lot of it is popping it up all over the internet without my permission. Do
    you know any solutions to help reduce content from being stolen? I’d certainly appreciate it.

  14. I love your blog.. very nice colors & theme.
    Did you create this website yourself or did you hire someone
    to do it for you? Plz reply as I’m looking to create my own blog and would like to know where u got
    this from. thanks a lot

  15. I have read so many content concerning the blogger lovers
    but this article is truly a good article, keep it
    up.