মহামারী দিনের প্যারাবল : রোমেল রহমান

ফেবল লৌকিক সংস্কৃতির প্রচলিত কথনের আপাত লেখ্যরূপ, প্যারাবলও তাই। প্রাণহীন বস্তু ফেবলের চরিত্র সচরাচর। খু্ব ছোট পরিসরে সহজ কথায় উপস্থাপিত হওয়া গল্প। একই রকম ধারার গল্পে মানব চরিত্র থাকে প্যারাবলে। মহাভারত এবং বাইবেলে অসংখ্য প্যারাবলের উদাহরণ আছে।

বলা যেতে পারে, বৈশিষ্টের নিরিখে পৃথিবীখ্যাত বহু লেখকের প্যারাবলগুলোর সাথে নিজস্বতার মিশেলে রোমেল রহমানের প্যারাবলগুলো সমান্তরাল…
সুলতান মাহমুদ রতন

মহামারী দিনের প্যারাবল
রোমেল রহমান

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

ইলশাচান্দ

খবরটা ছড়ায় এরকম যে, আকাশে ইলিশ দেখা গেছে ফলে ঈদের চাঁদ দেখে অভ্যস্ত জাতী আচানক নাড়া খায়! এই মহামারীর মধ্যে এই সংবাদ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তকে কিছুটা বেচাইন করে! তারা মিডিয়া খানাতল্লাশি করে বের করার চেষ্টা করে এর মাজেজা! টিভি নিউজে যখন সংবাদটা এসে যায় তখন সমস্ত জাতী জানতে পারে ব্যাপারটা, ফলে কেউ কেউ বলে, হালার টিভিওয়ালাগোর মাথায় বিচি উঠছে! প্যাটে ভাত নাই আসমানে ইলশা মাছ! কিন্তু আকাশে জাতীয় মাছ দর্শনের এহেন অভিজ্ঞতা নিয়ে শত শত ভিডিও ভাইরাল হয়ে ঘুরতে থাকে ফেউসবুক সহ সকল সামাজিক মাধ্যমে! আকাশে ইলিশ দর্শনের সেই চরম আচমকা মুহূর্তটা তারা সবাই সত্য মিথ্যা ভয় শিহরণ যৌনতা মিশিয়ে উপস্থাপন করে! ফলে ব্যাপারটা সকল স্তরের মানুষের মাথার মধ্যে ঢুকে যায়! যেহেতু আমাদের ইতিহাসে চাঁদে একজন রাজাকার দেখবার নজির আছে সেইহেতু ব্যাপারটার মর্তবা বিশেষ লাইনে ইঙ্গিত করে কিঞ্চিৎ! তান্ত্রিকেরা বলে, ঘোর অমানিশা সামনে! পণ্ডিতেরা বলে, মিথ্যাচার! ডাক্তার বলে, দীর্ঘদিন গৃহবন্দী থাকার ফলে জনগণের মন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে ফলে তারা বিভিন্ন রকমের পছন্দের জিনিস দেখছেন হেলুসিনেশনে! যেহেতু সামনেই বাংলা নববর্ষ সেইহেতু ইলিশের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে, ফলে সকলেই সন্দিহান এই বছর ইলিশ খেতে পারবে কিনা পহেলা বৈশাখে; আবার যেহেতু তার প্রিয় মানুষটাকে ভাইরাসে ভয়ে সে বাজারেও যেতে দিতে চায় না সেইহেতু এইসব অবদমন থেকে হতে পারে আকাশে ইলিশ দেখার এই বিভ্রম! একজন দায়িত্ববান নেতা সন্ধ্যারাতে খেঁকিয়ে উঠে বলে, ইলিশ দিয়ে আমরা করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করবো! কি প্রসঙ্গে বা কি প্রয়োজনে তিনি এটা বললেন সেটা কেউ বুঝে ওঠার আগেই আরেক নেতা যিনি জন্মসূত্রে এগিয়ে থাকার গুনাবলি নিয়ে জন্মেছেন তিনি সম্ভবত বোতল শেষ করে উঠে ফেসবুক লাইভে এসে বলেন, ইলিশ মাছের ফুসফুস গুর্দা ল্যাঞ্জা কাইট্টা মাইনষ্যেরে লাগায় দিলে মানুষ বাঁচবে, ভাইরাসে কেউ মরবে না; কারণ ইলিশ ভাইরাস খেকো মাছ!! এইসব হুজ্জৎ চলে সারাদিন! তবে কবিরাজেরা বলে, ইলিশের কাঁচা ডিম চিবিয়ে খেলে ভাইরাস থেকে বাঁচার সম্ভাবনা আছে! ফলে পরেরদিন আচানক ইলিশের বাজার চাঙ্গা হয়ে যায়! এবং একটা গোপন ইলিশিয় ব্যাপারস্যাপার সবার মধ্যে ঘুরঘুর করতে থাকে!

কিন্তু নিম্ন আয়ের মজদুরদের মধ্যে এই গল্প খুব একটা প্রভাব ফেলে না! তারা চাল যোগাড়ের ফিকিরেই ব্যস্ত থাকে দুঃসময়ের দিনরাত! কোথাও কাজের দেখা নেই! না খেয়ে থাকার অবস্থা প্রত্যেকের! এর মধ্যে এই ইলিশি কারবার তাদেরকে খুব একটা ছোঁয় না তবে তারা খবরটা শুনতে পায় এবং জানতে পায় টাকাওয়ালারা ইলিশ নিয়ে তুমুল গতিতে আছে! তবে বস্তিতেও আলাপ চলে, তাদের কারো কারো মনে হয় এটা গায়েবী কোন ব্যাপার! আবার কেউ কেউ বলে, মাবুদ হয়তো দুনিয়াডারে ইলিশের প্যাটের মইদ্দে ঢুকায় নিবে! তখন অন্য কেউ হয়তো বলে, কাগোরে নিবে মাবুদ? সবাইরে নিলে আমি যাইতাম না! চাইল চুরের সাথে আমি এক ইলিশে উঠতাম না! তখন হয়তো বক্তা বলে, প্যাঁচ লাগাও ক্যা বাল? দেখতেছ না একটা জিনিস ভাংতেছি! এইসব আলাপের মধ্যে রাত্রি হয়! সারাদিন ঘোরাঘুরি করে ছোলাইমান সামান্য চাইল যোগাড় করে! তার বউ ফজিলা সেটা রান্না করে! একমাত্র মেয়ে টুনিকে নিয়ে তারা খেতে বসে! ছোলাইমান ভাতের থালা নিয়ে অর্ধেক ভাত তার বউয়ের থালায় ঢালে! তারা একথাল ভাগ করে খাচ্ছে! দ্বিতীয় থালা ভাত টুনির একার! ছোলাইমান ছলছল চোখে ঘরের সিলিঙয়ের দিকে মাথা তুলে বলে, মাবুদ তাও আইজকা ভাত দিলা! কাইলো দিও! আমাগোরে না দিলে টুনিরে এট্টু দিও! টুনি বাপের এইসব দেখে বলে, আব্বা আসমানে ইলিশ মাছ উঠছে সেইটা কি ভাত দিয়া খাওয়া যায়? ছোলেমান বলে, চলেন তো আম্মা ব্যাপারটা দেইক্কা আহি! তারা তিনজন ভাতের থাল নিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়, আসমানে একটা চকচকে ইলিশ কাটিঙয়ের চান্দ! তার রূপালী ক্ষীণ আলোয় বস্তির এই শুনশান অন্ধকার কোনাটা জ্যান্ত হয়ে আছে! ছোলেমান বলে, ভাতের থালটা উঁচা কইরা ধরেন আম্মা, ইলিশ মাছটা আপনের পাতে পড়ুক! টুনি অসম্ভব বিশ্বাস নিয়ে ভাতের থালাটা উঁচু করে ধরে! ছোলেমান নিজেও থালাটা উঁচু করে ধরে! তারপর টুনিকে বলে, এইতো পড়ছে! চলেন আমরা ইলিশ মাছের আলো দিয়া ভাত মাইক্কা খায়া ফেলাই!

১৫ এপ্রিল ২০২০

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

দুঃস্বপ্ন

বস্তিতে এক ট্রাক ত্রাণের চাল হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে! ক্ষুধার্ত বস্তিবাসী ক্ষেপে গিয়ে ঘিরে ধরে ট্রাকটা, আরেকটু হলেই তাদেরকে ঘরের বেড়া ভেঙে চাপা দিতো! ড্রাইভারকে বস্তিবাসীরা জিজ্ঞাস করে…

  • আচোদা লোক নাকি? আরেকটু হইলে তো গেছিলাম আমরা!
  • মরেন তো নাই! আমি সামছু ড্রাইভার! হেল্পারেরা কয় কোপা সামছু ওস্তাদ! আমি ট্রাক চালাই না উড়াই!
  • রাখেন মিয়া! ওসব সামছু করার টাইম নাই! পেটে খিদা!
  • এই তো লাইনে আইছেন! নেন! বস্তা গুলান নামায় নেন!
  • বস্তায় কি?
  • খুইলা দেহেন!
  • নাহ! বস্তা খুলবো আর চোর বইলা ফাঁসায় দিবেন! এইগুলান নির্ঘাত চুরির চাইল, আমাগোর কান্ধে সাঁটায় দিতে আনছেন!
  • নারে ভাই! খুইলাই দেখেন ভিত্রে মানুষ আছে! চাইল নাই!
  • মানুষ দিয়া করবো কি আমরা? মানুষ কি খাওয়া যায়?
  • হে হে! দামি কথা! কিন্তু না খুললে তো বুঝবেন না! দেখেন না কি মাল নিয়াসছি! পাইলে খুশি হবেন! আমি আপ্নাগোরই লোক!

বস্তিবাসীরা দ্বিধায় পরে যায়! তাদের মধ্যে একজন অতি সাহসী ট্রাকে উঠে যায়! একটা বস্তার সেলাই করা মুখ খুলেই চিৎকার দিয়ে বস্তাটা নিচে ফেলে দেয়! বস্তায় বন্দি একজন চাল চোর! সবাই দেখে হাতপা গুড়ো করে থ্যাঁতলানো একজন চাল চোর কাৎরাচ্ছে! ড্রাইভার সামছু তার পান খাওয়া লাল মুখ খুলে বলে…

  • নেন বস্তা গুলান নামায় নেন! সব গুলাতে চাইল চোর আছে! রান্না কইরা খায়া ফেলান!

বস্তিবাসী খিঁচ মেরে যায়! তারা ভাবে ড্রাইভার লোকটা রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতিয়ার এবং এটা নির্ঘাত কোন খেলা! তারা জলদি দুঃস্বপ্ন ভেঙে জেগে ওঠে এবং টের পায় ঘরে চাল নেই, কোথাও কোন চালচোর ভর্তি ট্রাক আসে নাই!

১২ এপ্রিল ২০২০

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

ধাপ্পা

এক বুড়ি ভিখেরি ত্রাণ পেয়ে বিপাকে পড়ে গেলো! ভালো ত্রাণ পেয়েছে সে! চাল, ডাল, আলু, লবণ, আটা, তেল মিলিয়ে কেজি পনেরোর বস্তা! এতো ভার বয়ে নিতে তার ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো! বস্তাটা সে কিছু দূর বয়ে নিয়ে নামিয়ে রাখে তারপর আবার তুলে নিয়ে আরেকটু আগায়! এক অল্পবয়সী মেয়ে ত্রাণ না পেয়ে মুখ গোমরা করে হেঁটে যাচ্ছিলো! সে বুড়িকে দেখে পিছু নিলো! বুড়ি যখন বস্তাটা নামিয়ে রেখে হাঁপাচ্ছিল তখন মেয়েটা এসে বলল, বস্তাটা বয়ে দেবো? বুড়ি সন্দেহের চোখে তাকাল! মেয়েটা বলল, আমাকে এক কেজি আটা দিলেই আমি বস্তাটা দিয়াসবো? ভেবো না ফাউ বয়ে দেবো আর নিয়ে পালাবার মতলব নেই! বুড়ি বলল, চল তবে! তারপর তারা দুজন হাঁটতে লাগলো! হাঁটতে হাঁটতে এক সময় মেয়েটা বলল, তোমার বাড়ি কই? কদ্দূর আর? বুড়ি বলল, চল আটা দেবো অতো কথা বলিস না! তারপর আবার তারা হাঁটতে লাগলো! কিন্তু আরও আধঘণ্টা হাঁটার পর একটা ছাউনিতে বসে যখন তারা জিরোতে লাগলো, মেয়েটা বলল, তোমার বাড়ি কই বল তো? বুড়ি বলল, তা দিয়ে কাজ কি? চলতে এসেছিস চল্‌! এই কথা শুনে মেয়েটার সন্দেহ হল, মেয়েটা বলল, শোন বাপু আমার আটা চাই না! আমি চলে যাচ্ছি, তুমি অন্য কাউকে দিয়ে বয়ে নাও! এম্নিতেই কতদূর চলে এসেছি তার ঠিক ঠিকানা নেই! বুড়ি বলল, ফিরে আর যাবি কই? খাবার আছে খা! ওগুলো খুলে খা! মেয়েটা বলল, এসব খাবো কি করে? বুড়ি বলল, খা! আটা খা, আলু খা, চাল খা, নৈলে লবণ খা! মেয়েটা এবার ভড়কে গিয়ে বলল, এগুলো খাবো তা চুলো কই? হাঁড়ি কই? বুড়ি বলল, কাঁচা খা! আমি তো কাঁচা খাই! মেয়েটা এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ঠিক করে বল তো বাড়ি কোথায় তোমার? পাগল নাকি তুমি? বুড়ি বলল, বাড়ি নেই তো! রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, ঘুম পেলে শুয়ে যাই ছায়ায়, খিদে পেলে চেয়ে খাই নৈলে যা পাই কাঁচা খেয়ে ফেলি! দরকার কি অতো চালচুলোর? মেয়েটা ভড়কে গিয়ে বলল, ডাইনি বুড়ি নাকি তুমি? বুড়ি খলবলে হাসি দিয়ে বলে উঠলো, বড্ড দেরিতে চিনতে পেলি রে! আয় তোমাকে মুর্গি বানিয়ে রেখে দিই!

মেয়েটা দৌড়ে বেরিয়ে গেলো! রোদের মধ্যে অনেক দূরে কিছু একটাকে হেঁটে আসতে দেখা গেলো! বুড়ির নাতি! ওটা কি মানুষ নাকি কুকুর?

২২ এপ্রিল ২০২০

রোমেল রহমান

About S M Tuhin

দেখে আসুন

যাপনের জীবন যাত্রা : ঋভু চট্টোপাধ্যায়

যাপনের জীবন যাত্রা ঋভু চট্টোপাধ্যায় -তুমি আজ কিন্তু সন্ধেবেলায় বেরোবে না বাবা, আমাকে লগের প্রবলেম …

31 কমেন্টস

  1. It’ѕ a pity you don’t haνe ɑ donate button! І’d Ԁefinitely
    donate tо this superb blog! І guess fօr now i’ll settle f᧐r bookmarking ɑnd adding уour RSS feed tо my Google account.

    Ӏ loоk forward t᧐ brand new updates and ѡill talk
    aƅout this site wіth my Facebook gгoup. Talk soon!

  2. https://nextadalafil.com/ tadalafil without a doctor prescription

  3. generic cialis online fast shipping cost of cialis

  4. I do not even know how I ended up here, but I thought this post was good. I do not know who you are but definitely you are going to a famous blogger if you are not already 😉 Cheers!

  5. what Is The Recommended Dose Of Cialis For A 37 Year Old Man?

  6. when Is The Best Time To Take Cialis?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *