বিশেষ নিবেদন সংখ্যা : আনিসুজ্জামান ইহজাগতিক মুখাবয়ব

ছবি : মাসুক হেলাল

ড. আনিসুজ্জামান
(১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭- ১৪ মে ২০২০)

‘বাংলা ভাষার উপর দখল থাকার ব্যাপার না, পুরো বাংলাদেশের স্পিরিটটা, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংবিধানে ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দের তাৎপর্য, উৎপত্তি বোঝার মতো যে ক্ষমতা থাকা দরকার সেটার অভাব মেটাতে পেরেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান’

ম্যানগ্রোভ সাহিত্য-র নিবেদন–

সাক্ষাৎকার
ইতিহাস আমাকে আনুকূল্য করেছে

আনিসুজ্জামান

পরিচিত পোশাকে বসে ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। পাজামা-পাঞ্জাবি। পবিত্র সরকার এসেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তাঁদের মধ্যে মৃদু কথাবার্তাও হচ্ছে। বিপরীত দিকের একটা সোফায় বসে আছেন সিদ্দিকা জামান— আনিসুজ্জামানের সঙ্গে যিনি পার করেছেন জীবনের অনেক বড় পথটি। তাঁর কাছে গিয়ে বসি। শুক্রবার বেলা ১১টার মৃদু আলো তখন ঢুকছে জানালা দিয়ে। আজ শনিবার আনিসুজ্জামান ৮০ বছর পূর্ণ করলেন।

‘এই মানুষটার সঙ্গে থেকে গেলেন এত দিন। কেমন মানুষ তিনি?’

‘অসাধারণ।’ বললেন সিদ্দিকা জামান।

‘এতটা পথ কেমন কেটেছে আপনাদের?’

‘আমার মনে হয় আমাদের জীবনটা খুব সহজ-স্বাভাবিকভাবে চলে গেছে। খুব দ্রুত গেছে, ঝরনার মতো বয়ে গেছে। আমার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, ও বাড়ি নিয়ে আমাকে কখনো যন্ত্রণা দেয়নি। আমি যেভাবে চালিয়েছি, ও সেটা মেনে নিয়েছে। আমি যেভাবে জানি, ওর কী পছন্দ; বাচ্চাদের সেভাবেই মানুষ করার চেষ্টা করেছি।’

একই প্রশ্ন থাকে আনিসুজ্জামানের কাছে। সাবলীলভাবে সিদ্দিকা জামান সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘বেবী (সিদ্দিকা জামানের ডাকনাম) পারিবারিক সমস্ত দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে আমাকে কাজের সুবিধা করে দিয়েছে। তবে সে পরিমাণ কাজ আমার দ্বারা হয়নি। আমি মূলে যেটা করতে চেয়েছিলাম সেটা হচ্ছে, আঠারো শতকের আগের বাংলা গদ্য নিয়ে। বইটা লিখলাম, কিন্তু নমুনাগুলো সংকলন আকারে— ওটা আর এখনো করা হলো না। ওটা হওয়া উচিত ছিল।’

আমাদের ইতিহাসের বাঁকগুলোয় আমরা আনিসুজ্জামানকে পাই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ-আদালত পর্যন্ত প্রতিটি বাঁকেই তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিষয়টি মনে করিয়ে দিতেই বললেন, ‘কীভাবে এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকলাম, বলা আসলে কঠিন। তবে আমাদের সময়টাই এমন ছিল, যখন ছাত্র ও যুবকেরা নানা রকম সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আমি তাদের মধ্যে পড়ে গেছি। প্রথমে তো ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দিই। সে সময়কার একমাত্র অসাম্প্রদায়িক সংগঠন। সেই অসাম্প্রদায়িকতার টানেই ওখানে যাওয়া। তারপর তো ভাষা আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের কথা যদি বলো, ১৯৬০-এর দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আমরা সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকেও করেছি, পথেঘাটে নেমেও করেছি। এরই চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া। খুব পরিকল্পিতভাবে যে গিয়েছিলাম, তা বলতে পারি না। প্রথমে তো পালানো। জীবনরক্ষা। তারপর আগরতলা, কলকাতা। ইতিহাস আমাকে আনুকূল্য করেছে।’

আর গণ-আদালত?’

‘ওখানেও আমার ভূমিকাটা বড় নয়। জাহানারা ইমাম বয়সে আমার বড় হলেও উনি আমার ছাত্রী ছিলেন। তিনি যখন বললেন, আপনি আসুন, তখন গেলাম। তারপর কথা হলো, কারা অভিযোগকারী হবে। ঠিক হলো সৈয়দ শামসুল হক, বোরহান (বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর) আর আমি। আমি বললাম, আমি তো দেশে ছিলাম না, তাই গোলাম আযম সম্পর্কে আমার কিছু বলতে হলে বলতে হবে বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যা যা করেছেন। বোরহান বলল বাঙালি সংস্কৃতিবিধ্বংসী কী কাজ করেছে। আর সৈয়দ শামসুল হকের অভিযোগ ছিল সামগ্রিকভাবে বাঙালি নিধন। এই তিনটি অভিযোগ নিয়েই গণ-আদালত।’

‘আপনার ভালো লাগা উপন্যাস, ভালো লাগা সিনেমা সম্পর্কে জানতে চাইলে বলবেন?’

‘আসলে এত কিছুই ভালোবাসি যে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা মুশকিল। বুদ্ধদেব বসুর একটি প্রেমের কবিতা আছে, যেখানে বলছেন, আমরা কত কিছুই ভালোবাসি, তাহলে প্রেমটা কী? আমারও সে রকম বলতে হয়, অনেক কিছুই ভালোবাসি। আলাদা করে বলা মুশকিল। নিশ্চয়ই একটা সময়, উদাহরণ হিসেবে বলছি, রবীন্দ্রনাথের গোরা পড়েছি। মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি। তেমনি আমার খুব প্রিয় লেখক এরিক মারিয়া রেমার্ক, জার্মান ভাষায় যিনি প্রথম মহাযুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন, তাঁর একাধিক বই আমার প্রিয়। ফিল্ম যদি বলো, তাহলে প্রথমেই বলব রোমান হলিডে। সেটা বোধ হয় আমাদের কালের সবার পছন্দের ফিল্ম। তারপর হয়তো ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই। বাংলা ছবির একটা তো সুসময় গেছে, তখনো বোধ হয় আমরা সাবালক হইনি। তবে কিছু দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে, তখনকার যারা শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ছিলেন—ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী স্যান্যাল—তাঁদের দেখেছি। এ রকম নানা কিছুই আছে।’

একটানা বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল আনিসুজ্জামানের। শরীর খুব সুস্থ নয়। চিকিৎসা চলছে। তাঁকে রেহাই দিয়ে আমরা আবার ফিরি সিদ্দিকা জামানের কাছে।

জিজ্ঞেস করি, আনিসুজ্জামানের পছন্দের খাবার কী?

‘সবচেয়ে পছন্দ করে চিংড়ি মাছের মালাইকারি। তারপর তার দ্বিতীয় পছন্দের খাবার হচ্ছে গরুর গোশত, আলু দিয়ে রান্না করা। মাছের মধ্যে ইলিশ মাছ খুব পছন্দ, সরষে ইলিশ বিশেষ করে। ভাজা মাছ পছন্দ করে, তেলের মধ্যে পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে।’

‘কোথাও পড়েছিলাম, বাজার করতে তিনি পছন্দ করেন না।’

‘বাজার করা পছন্দ করে না। তবে চট্টগ্রামে থাকতে বাজার করত।’

যাঁরা তাঁকে চেনেন, তাঁরা জানেন সিদ্দিকা জামানের সারল্য অতুলনীয়। বিদায়ের সময় তিনি যা বললেন, তাতে সে কথাই মনে হলো আরেকবার, ‘আমি এতটুকু বুঝে নিয়েছিলাম, ও একজন শিক্ষক। আমাকে সেটা মনে রেখেই চলতে হবে। আমাদের সীমিত রোজগার। ছেলেমেয়েদেরও আমি সেভাবে বুঝিয়েছি। আমাদের ছেলেমেয়েরাও কোনো দিন আমাদের কাছে কোনো কিছু চেয়ে বিব্রত করেনি। তারা সব সময় বুঝেশুনে চলেছে। সেদিক দিয়ে ভাবলে, আমরা খুব শান্তিপূর্ণ জীবন কাটিয়েছি।’

আরও অনেক দিন শান্তিতে থাকুন আপনারা।

নিবেদিত সাক্ষাৎকারটি তিনি তাঁর আশি বছরে পদার্পণ উপলক্ষে দিয়েছিলেন। গ্রহীতা : জাহীদ রেজা নূর

প্রথম আলো : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

হায়, এ কী সমাপন !
গোলাম ফারুক খান

মাও সে তুং-এর নামে চলে-আসা সেই বহুল-উদ্ধৃত বাক্যটি মনে পড়ছে: ‘কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা, আবার কোনো কোনো মৃত্যু তাই পাহাড়ের মতো ভারী।’ মৃত্যুর এই চলমান ঢলের মধ্যে আজ পাহাড়ের মতো ভারী এক মৃত্যু নেমে এল বাংলাদেশে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাদের ছেড়ে গেলেন।

উনিশশো উনসত্তর সালে তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান, তখন তাঁর শিক্ষক ও বন্ধু অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী বলেছিলেন: ‘এখন প্রতিদিন আটটা বাজবে, নটা বাজবে, দশটা বাজবে, এগারোটা বাজবে — আনিসের সঙ্গে দেখা হবে না।’ সে ছিল এক সাময়িক বিচ্ছেদ। কিন্তু তাও অসহনীয় ঠেকেছিল মুনীর চৌধুরীর কাছে। আর আজ এত বছর পরে যখন আনিসুজ্জামান আমাদের সামষ্টিক জীবনে এক অপরিহার্য উপস্থিতি হয়ে উঠেছিলেন, তখন তাঁকে আমরা চিরদিনের জন্য হারালাম। বয়স হয়েছিল তাঁর। তবুও এই শূন্যতা নিদারুণ। তাঁর সামান্য একজন অনুরাগী হিসেবে আমি ভাবছি: এখন থেকে দিন যাবে, সপ্তাহ যাবে, মাস যাবে, বছর যাবে — আমরা আর আনিস স্যারের স্বচ্ছ, প্রজ্ঞাদীপ্ত বাণী শুনতে পাব না। নতুন কোনো দিকনির্দেশক গবেষণা-প্রবন্ধ বা সহজ, হাস্যোজ্জ্বল, বিন্দুতে সিন্ধুবৎ লেখা পড়তে পারব না। একুশে বইমেলায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকব না তাঁর নতুন কোনো বইয়ের জন্য।

তাঁর বিষয় বাংলা আমি স্নাতক সাবসিডিয়ারি ক্লাসে পড়েছি, কিন্তু সেখানে সরাসরি তাঁর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কারণ আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, তখন তিনি শিক্ষকতা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। উনিশশো পঁচাশি সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছেন, তার আগেই আমার ছাত্রত্ব শেষ। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে না পেলেও বাংলাদেশের অন্য অনেক মানুষের মতো আমিও মনে মনে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে বরণ করেছিলাম।

আনিসুজ্জামানের নামের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম স্কুলজীবনেই। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর যে ব্যাকরণ বইটি আমাকে পড়তে হয়েছিল তার অন্যতম লেখক ছিলেন তিনি। সহলেখক ছিলেন আরো দুজন মনীষী; দুজনই তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক: অজিতকুমার গুহ ও মুনীর চৌধুরী। সাধারণত ব্যাকরণ-বিতৃষ্ণা স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু চিত্তগ্রাহী এই ব্যাকরণটি আমাকে শুধু হাতছানি দিয়ে ডাকত। এটি পড়েই শিখেছিলাম বাংলা ভাষার মৌলিক নিয়মকানুন, বিশেষ করে সাধু ও চলিত ভাষার পার্থক্য।

কলেজে প্রবেশ করে আমার প্রিয় বাংলার শিক্ষকের কাছে শুনলাম অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের পাঠদান বিষয়ক নানা স্মৃতি। তাঁদেরকে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়িয়েছিলেন তিনি। আশ্চর্য কুশলতায় গল্পগুচ্ছের সৌন্দর্য উন্মোচন করেছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে। অনবরত বানান ভুল করে এমন এক শিক্ষার্থীকে একবার তিনি পরামর্শ দেন কোনো বানান নিয়ে সন্দেহ জাগলে অভিধান দেখে নিতে। অম্লানবদনে দ্রুত উত্তর দেন সেই শিক্ষার্থী: ‘স্যার, আমার তো কখনো কোনো বানান নিয়ে সন্দেহ জাগে না।’ হাসির রোল উঠল ক্লাসে আর আনিসুজ্জামান তাঁর অতি পরিচিত সেই স্মিত হাসিটি হাসলেন।

কিছুদিন পরে পড়লাম আনিসুজ্জামানের মহৎ গবেষণা-গ্রন্থ মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য। উনিশশো চৌষট্টি সালে প্রকাশিত এ বইয়ে বাংলা সাহিত্যে প্রতিফলিত মুসলিম মনের যে ঐতিহাসিক মানচিত্র তিনি এঁকেছিলেন তা সম্যকভাবে বোঝার বয়স তখন আমার হয়নি। কিন্তু তার পরও মুগ্ধ হয়েছি, ঋদ্ধ হয়েছি। বয়স যত বেড়েছে ততই মনে হয়েছে বইটি অনন্য। দুর্লভ, অজানা উপাদান ব্যবহার করে এ বিষয়ে এমন প্রাঞ্জল ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বই বাংলা ভাষায় এর পরে আর লেখা হয়েছে কিনা সন্দেহ। তাঁর পুরোনো বাংলা গদ্য নামের বইটিও একটি তাৎপর্যপূর্ণ মৌলিক গবেষণার ফসল। প্রচলিত ইতিহাসে বাংলা গদ্যের সূচনা ধরা হত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। কিন্তু ঢাকায় ইংরেজ কুঠির কর্তা ও তাঁতিদের লেখা চিঠিপত্র ও অন্যান্য দলিল ঘেঁটে আনিসুজ্জামান প্রমাণ করেন যে, কেজো বাংলা গদ্যের ইতিহাস অনেক পুরনো — তা ষোল শতক পর্যন্ত বিস্তৃত।

কাল নিরবধি ও বিপুলা পৃথিবী নামে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীর দুই খণ্ড তো শুধু স্মৃতির সমাহার নয় — প্রজ্ঞা ও সুধার ভাণ্ড। ব্রিটিশ আমলের শেষদিক থেকে শুরু করে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আলেখ্য। কাল নিরবধিতে তিনি উল্লেখ করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নি কোনের কাছ থেকে পাওয়া এক মূল্যবান শিক্ষার কথা। অধ্যাপক কোন তাঁকে বলেছিলেন: ‘দেখো, প্রগতিশীল-রক্ষণশীল বলে মানুষকে চিহ্নিত করার মধ্যে একটা বিপদ আছে। রাধাকান্ত দেবকে তুমি রক্ষণশীল বলছো; ঠিকই, রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ইয়ং বেঙ্গলের প্রতি তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি, তাকে রক্ষণশীল বলা চলে। কিন্তু স্ত্রীশিক্ষাবিস্তারে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে কি রক্ষণশীলতার কথা খাটবে? তখন দেখবে নদিয়ার পণ্ডিতদের তুলনায় তিনি অনেক প্রগতিবাদী। সুতরাং উদারনৈতিকতা-রক্ষণশীলতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার — বিশেষ পরিস্থিতিতে তার প্রয়োগ গ্রাহ্য হতে পারে, একটা বিশেষ প্রশ্নে তা সত্য হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে একজন মানুষকে তেমন ছাপ দেওয়া যায় না।’ এই সতর্কবাণী আনিসুজ্জামান নিজের কাজে অনুসরণ করেছেন।

তাঁর সম্পর্কে অনেকের অভিযোগ আছে যে, সাহিত্য-ব্যতিরেকী বিভিন্ন কর্মে লিপ্ত হয়ে উত্তরকালে তিনি আর তেমন কিছু লেখেননি। তাঁর ‘স্যার’ জ্ঞানবৃক্ষ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকও কৌতুকছলে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনি তো আর লেখাপড়া করলেন না!’ মনস্বী স্নেহভাজনের কাছে আরো প্রত্যাশা থেকেই হয়ত এ কথা বলা। কিন্তু আমাদের সাধারণ চোখে তো ধরা পড়েছে, বিচিত্র কর্মে লিপ্ততা সত্ত্বেও তিনি সবসময় বিদ্যাচর্চায়ই নিবেদিত ছিলেন। অনেকগুলি বইয়ে দীর্ঘ ও হ্রস্ব নানা প্রবন্ধে তিনি মৌলিক চিন্তার যে ঐশ্বর্য রেখে গেছেন তা অমূল্য। যেমন অসাধারণ তাঁর সরল ভাষার মাধুর্য, তেমনি অতুলনীয় তাঁর মিতভাষিতা। নীর থেকে ক্ষীরটুকু আহরণ করার এক আশ্চর্য কৌশল তিনি জানতেন।

আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সংস্কৃতির লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মশালটি যাঁরা উনিশশো একাত্তরের সেই মহালগ্ন পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছিলেন তিনি তাঁদের অন্যতম। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একষট্টিতে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন, সাতষট্টিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সেই সময়ে বাংলা ভাষা সংস্কারের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সক্রিয়তা এবং তারপর মুক্তিযুদ্ধ — সবকিছুতেই তাঁর নিবিড় বিজড়ন ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনায়ও তাঁর ভূমিকাই ছিল মুখ্য। অনেক ঝড়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে দীর্ঘ পথচলা, সেখানেও তিনি সদাদৃশ্যমান, সক্রিয় যাত্রী হিসেবেই ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনের উত্তাপ থেকে গড়ে ওঠা যে প্রজন্মটি আমাদের রুচি ও মননের পাটাতন নির্মাণ করে দিয়েছে, আনিসুজ্জামান তার উজ্জ্বলতম প্রতিনিধিদের একজন। তাঁর মৃত্যু একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসানের সংকেতবহ। তাঁদের আর কজনই বা বাকি আছেন! অল্প যাঁরা আছেন তাঁরা চলে গেলে আমরা কোথায় আলো আর ছায়া খুঁজব? প্রজ্ঞা ও মনীষার ভাঁড়ারে যে শূন্যতার ঢেউ আছড়ে পড়তে চাইছে তার নিরসন কবে, কীভাবে হবে?

arts.bdnews24.com
১৫ মে ২০২০
This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

পণ্ডিতবলয় থেকে রাজপথ জুড়ে
পিয়াস মজিদ

করোনার কারণে যখন আমরা এক নিদারুণ দুঃসময় পার করছিলাম, তখনও বিশেষ উদ্বিগ্ন থাকছিলাম এক জন মানুষের জন্য। মানুষটি তাঁর নামের জোরেই যেন অনায়াসে আদায় করে নিতেন সকলের শ্রদ্ধা, সম্মান আর ভালোবাসা। আবু তৈয়ব মহম্মদ আনিসুজ্জামান, এই পারিবারিক নামে আজ তাঁর পরিবারই তাঁকে চেনেন কি না সন্দেহ। ‘আনিসুজ্জামান’ বলেই তাঁকে চেনে দুই বাংলার সাধারণ মানুষ থেকে বিশ্ব-বিদ্যায়তনিক পরিসর।

১৯৩৭ থেকে ২০২০। তিরাশি বছর তিন মাসের মাঝখানে ব্রিটিশ ভারত, পরাধীন পাকিস্তান আর স্বাধীন বাংলাদেশ। আনিসুজ্জামানের জীবন প্রায় এক শতাব্দীর ভাঙাগড়া ও বাঙালির ইতিবৃত্ত। পার্ক সার্কাস হাইস্কুলের ছাত্র, ‘মুকুলের মহফিল’-এর সদস্য আনিস দশ বছর বয়সে কলকাতা ত্যাগ করে খুলনায় আসেন। তার পর থেকেই আনিসুজ্জামান মানে প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে ক্ষান্তিহীন সংগ্রাম। প্রথম জীবনে ছোটগল্প লিখতেন। তার পর জনজীবনের জঙ্গমতাই যেন তাঁকে টেনে নিয়ে আসে প্রবন্ধ-গবেষণার দরবারে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর পুস্তিকা ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন কী ও কেন?’ তিনি ছিলেন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্মুখ সারির যোদ্ধা। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ছাত্র হিসেবে ভর্তি হয়ে আমৃত্যু এই বিভাগকে মহিমামণ্ডিত করেছেন— অতুলনীয় মেধাবী ছাত্র হিসেবে, বাঙালি মুসলিম মানস (১৭৫৭-১৯১৮) বিষয়ে অসামান্য গবেষণার প্রণেতা হিসেবে, গুণী শিক্ষক হিসেবে এবং এক পর্যায়ে বিভাগের ‘এমেরিটাস অধ্যাপক’ হিসেবে। ১৯৬১-তে পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের বিরুদ্ধতা করে, তখন চব্বিশ বছরের আনিসুজ্জামান যে বিদ্রোহী ভূমিকা নেন, তা ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের রবীন্দ্রপ্রাণতার প্রতীক। ১৯৬৪-তে প্রকাশিত ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ বঙ্গীয় গবেষণা জগতে আজ অবধি এক অপরিহার্য সহায়সূত্র। সে বছরই শিকাগোতে গিয়েছেন পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে। কিন্তু আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ১৯৬৫-তে তাঁর মাসাধিক কাল লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজ়িয়াম লাইব্রেরি ও ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে অধ্যয়ন আর গবেষণা। সেই সময় থেকেই মনের মাঝে উপ্ত হওয়া ধারণা পনেরো বছরের সাধনায় রূপ পায় ১৯৮১ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘ফ্যাক্টরি করেসপন্ডেন্স অ্যান্ড আদার বেঙ্গলি ডকুমেন্টস ইন দি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি অ্যান্ড রেকর্ডস’ রূপে। ১৯৮২ সালে ‘আঠারো শতকের বাংলা চিঠি’ এবং ১৯৮৪-তে প্রকাশিত ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’-এর মতো সমীহ-উদ্রেককারী গবেষণা এর ঠিক পর পরই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আনিসুজ্জামান ছিলেন সক্রিয় ভূমিকায়। সেই সময় কলকাতায় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর সঙ্গে সাক্ষাতের বিবরণ তিনি তাঁর আত্মকথায় দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের সদস্য। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য প্রণয়নের গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তাঁরই উপর, কেননা তাঁর উপর প্রভূত আস্থা ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা তাজউদ্দিন আহমদের মতো নেতাদের। আনিসুজ্জামান অনেক কাল ছিলেন রাজধানী ঢাকার বাইরে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণার কারণে গিয়েছেন দিল্লি, করাচি, সান ফ্রান্সিসকো, ব্লুমিংটন, মনট্রিল, লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ়, অক্সফোর্ড, সাসেক্স, টোকিয়ো, কিয়োটো। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে গিয়েছিলেন মস্কো বা বুডাপেস্ট। এক ব্যক্তিগত আলাপনে তিনি আমায় বলেছিলেন, তাঁর জীবনে সাংগঠনিক সক্রিয়তায় এত সময় গিয়েছে যে নিজের প্রার্থিত লেখাগুলো হয়ে ওঠেনি ঠিকঠাক। বিস্মিত হয়েছিলাম। এত সবের মাঝেও তবে কী করে লেখা হয়েছিল ‘স্বরূপের সন্ধানে’, ‘মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র’, ‘মুনীর চৌধুরী’, ‘বাঙালি নারী: সাহিত্যে ও সমাজে’, ‘ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য’-র মতো দিগদর্শী সব বই! দক্ষ হাতে সম্পাদনা করেছেন ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘নজরুল রচনাবলি’, ‘শহীদুল্লাহ রচনাবলি’ কিংবা ‘ত্রৈলোক্যনাথ রচনা-সংগ্রহ’। অনুবাদ করেছেন অস্কার ওয়াইল্ডের নাটক, পুরোধা হয়েছেন ‘আইন শব্দকোষ’, ‘বাংলা-ফরাসি শব্দকোষ’ প্রণয়নে। তাঁর আত্মজীবনী ‘কাল নিরবধি’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’ কেবল আত্মকথা নয়, বাংলার এই জনপদের ক্রমিক অগ্রগতির বিশ্বস্ত ও নিরাসক্ত ভাষ্যও বটে।

বুদ্ধিজীবীর কেতাবি গণ্ডি ভেঙে রাজপথে-জনপদে, মাটির টানে মানুষের মিছিলে আমরা তাঁকে নেমে আসতে দেখি। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের বিধান সংযোজনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা রুজু করতে, কিংবা ১৯৯২ সালে গণ-আদালতে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপনকারী হিসেবে সামনে দাঁড়াতে দেখি। ১৯৯২-তে তাঁর এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে দেখি। এই সে দিনও সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের কারণে হত্যার হুমকি দেয়।

তবু আনিসুজ্জামান মানে এগিয়ে যাওয়া। তাই অসুস্থ শরীরে, জরাকে উপেক্ষা করে সভা-সমাবেশে স্বচ্ছন্দ থাকতেন সব সময়। তাঁর উদার দুয়ারে সবার প্রবেশ ছিল অবাধ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তিনি, ছাত্র-শুভার্থী-স্বজন সকলেরই ‘আনিস স্যর’। এই ভূষণ আরোপিত নয়, এ তাঁর অর্জন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সরকারি সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত, ‘জাতীয় অধ্যাপক’-রূপে সম্মানিত, ভারত সরকারের ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে গৌরবান্বিত আনিস স্যরের সবচেয়ে বড় পাওয়া মানুষের অনিঃশেষ ভালবাসা, আজীবন।

কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক : বাংলা একাডেমি, ঢাকা

আনন্দবাজার পত্রিকা : ১৫ মে, ২০২০

This image has an empty alt attribute; its file name is MANGROVE.jpg

আশুতোষ সরকার
সংখ্যা সম্পাদক

About S M Tuhin

দেখে আসুন

O. Henry পুরস্কারে ভূষিত হলেন ম্যানগ্রোভ সাহিত্য-র প্রধান উপদেষ্টা সাহিত্যিক অমর মিত্র

O. Henry পুরস্কারে ভূষিত হলেন অমর মিত্র বাংলা সাহিত্য তথা বাংলা ভাষার আরও এক গৌরবোজ্জ্বল …

67 কমেন্টস

  1. best 10 online canadian pharmacies: buy drugs online – canada medications online

  2. canadian pharmacy 24h com: accredited canadian pharmacy – canadapharmacyonline com

  3. Hi there everyone, it’s my first visit at this web page, and paragraph is genuinely fruitful for me, keep up
    posting these articlees or reviews.

    my site: izmir magenverkleinerung

  4. http://indiapharmacy.site/# п»їlegitimate online pharmacies india

  5. fantastic points altogether, you simply received a new reader.
    Whhat might you recommend about your publish that you
    simply made some days in tthe past? Any certain?

    Feel free to visit my web-site: puff likit

  6. canadian rx pharmacy online: Mail order pharmacy – best online international pharmacies

  7. my canadian family pharmacy: online meds – true canadian pharmacy

  8. reputable mexican pharmacies online best online pharmacy mexico pharmacy

  9. http://mexicopharmacy.store/# purple pharmacy mexico price list

  10. Your method of telling the whole thing in this paragraph is truly nice, all be able to
    without difficulty be aware of it, Thanks a lot.

  11. физической активности в интернет-магазине
    Качественные для занятий фитнесом по выгодным ценам в нашем магазине
    Надежность и удобство в каждой детали спорттоваров в нашем ассортименте
    Спорттовары для начинающих и профессиональных спортсменов в нашем магазине
    Ненадежный инвентарь может стать проблемой во время тренировок – выбирайте качественные спорттовары в нашем магазине
    Инвентарь для занятий спортом только от ведущих производителей с гарантией качества
    Сделайте свою тренировку более эффективной с помощью спорттоваров из нашего магазина
    спорттоваров для самых популярных видов спорта в нашем магазине
    Высокое качество спорттоваров по доступным ценам в нашем интернет-магазине
    Удобный поиск и быстрая доставка в нашем магазине
    Специальные предложения и скидки на спорттовары для занятий спортом только у нас
    Прокачайте свои спортивные качества с помощью спорттоваров из нашего магазина
    Большой выбор товаров для любого вида спорта в нашем магазине
    Качественный инвентарь для тренировок спортом для мужчин в нашем магазине
    инвентаря уже ждут вас в нашем магазине
    Поддерживайте форму в любых условиях с помощью спорттоваров из нашего магазина
    Низкие цены на спорттовары в нашем интернет-магазине – проверьте сами!
    Разнообразие для любого вида спорта по доступным ценам – только в нашем магазине
    Инвентарь для амбициозных спортсменов и любителей в нашем магазине
    спортивный магазин http://www.sportivnyj-magazin.vn.ua.

  12. canadian pharmacy 365: canada pharmacy online – the canadian drugstore

  13. Узнайте, какой коврик подойдет именно вам
    спортивный коврик для фитнеса https://kovriki-joga-fitnes.vn.ua.

  14. Cel mai bun site pentru lucrari de licenta si locul unde poti gasii cel mai bun redactor specializat in redactare lucrare de licenta la comanda fara plagiat

  15. Study nursing in Kenya
    Mount Kenya University (MKU) is a Chartered MKU and ISO 9001:2015 Quality Management Systems certified University committed to offering holistic education. MKU has embraced the internationalization agenda of higher education. The University, a research institution dedicated to the generation, dissemination and preservation of knowledge; with 8 regional campuses and 6 Open, Distance and E-Learning (ODEL) Centres; is one of the most culturally diverse universities operating in East Africa and beyond. The University Main campus is located in Thika town, Kenya with other Campuses in Nairobi, Parklands, Mombasa, Nakuru, Eldoret, Meru, and Kigali, Rwanda. The University has ODeL Centres located in Malindi, Kisumu, Kitale, Kakamega, Kisii and Kericho and country offices in Kampala in Uganda, Bujumbura in Burundi, Hargeisa in Somaliland and Garowe in Puntland.
    MKU is a progressive, ground-breaking university that serves the needs of aspiring students and a devoted top-tier faculty who share a commitment to the promise of accessible education and the imperative of social justice and civic engagement-doing good and giving back. The University’s coupling of health sciences, liberal arts and research actualizes opportunities for personal enrichment, professional preparedness and scholarly advancement

  16. neurontin 800 pill: generic gabapentin – neurontin 4 mg

  17. thx for man bro strictly happmoon in moscow. Thanks All brother.

  18. Sosyal medya’da populer veya fenomen olmak istiyorsanız, ucuz takipçi sitesi igtakipcim.com

  19. paxlovid pill: paxlovid cost without insurance – Paxlovid buy online

  20. slot gacor gampang menang 09e4432
    Slot Gacor telah menciptakan fenomena baru dalam dunia slot online, tidak sekadar menjadi istilah biasa, melainkan sebuah jaminan meraih kemenangan dengan menawarkan pengalaman permainan slot yang memikat dengan minimal deposit 5rb.

    Bermain di situs slot gacor yang dapat dijamin amanah bukan hanya memberikan hiburan semata, tetapi juga membuka peluang meraih jackpot terbesar yang sebelumnya mungkin sulit dicapai atau bahkan tidak pernah terwujud.

    Pengalaman Game Slot Gacor: Lebih Dari Sekadar Hiburan
    Slot Gacor bukanlah sekadar permainan slot biasa. Ia menciptakan atmosfer yang berbeda, memanjakan pemain dengan sensasi bermain yang luar biasa dan menawarkan harapan kemenangan yang lebih tinggi. Dengan desain yang menarik dan fitur-fitur inovatif, setiap putaran menjadi pengalaman yang tak terlupakan.

    Strategi Bermain untuk Meningkatkan Peluang Kemenangan
    Meskipun slot gacor dikenal dapat meningkatkan peluang kemenangan, penting bagi pemain memiliki beberapa strategi untuk memaksimalkan potensi kemenangan mereka. Beberapa strategi yang dapat diadopsi antara lain:

    1. Pemilihan Provider Game yang Tepat
    Pemilihan provider game slot online yang tepat menjadi langkah awal yang krusial. Pastikan memilih provider yang memiliki reputasi baik dan menawarkan variasi game slot gacor terbaik.

    2. Pahami Return to Player (RTP) Tertinggi
    Mengetahui tingkat Return to Player (RTP) tertinggi pada setiap permainan slot dapat menjadi kunci kesuksesan. Pilihlah game dengan RTP tinggi untuk meningkatkan peluang meraih kemenangan.

    Slot Gacor Malam Ini: Temukan Keberuntungan Anda
    Setiap malam, dunia slot gacor menyajikan kejutan-kejutan baru. Untuk menjadi bagian dari aksi malam ini, pastikan untuk mengikuti bocoran pola slot gacor yang telah disiapkan. Ini dapat menjadi kunci untuk membuka pintu ke sesuatu yang lebih besar dan meraih kemenangan yang menarik.

    Jadi, jangan ragu untuk bergabung dan bermain di slot gacor hari ini. Saksikan sendiri bagaimana pengalaman bermain dapat menjadi lebih dari sekadar hiburan, melainkan sebuah peluang untuk meraih kemenangan besar. Selamat bermain dan semoga keberuntungan selalu berada di pihak Anda!

  21. wellbutrin no prescription: best generic wellbutrin 2018 – price of wellbutrin without insurance

  22. rtpkantorbola
    Kantorbola adalah situs slot gacor terbaik di indonesia , kunjungi situs RTP kantor bola untuk mendapatkan informasi akurat slot dengan rtp diatas 95% . Kunjungi juga link alternatif kami di kantorbola77 dan kantorbola99

  23. https://wellbutrin.rest/# generic wellbutrin price

  24. paxlovid buy http://paxlovid.club/# Paxlovid buy online

  25. VPS SERVER
    Высокоскоростной доступ в Интернет: до 1000 Мбит/с
    Скорость подключения к Интернету — еще один важный фактор для успеха вашего проекта. Наши VPS/VDS-серверы, адаптированные как под Windows, так и под Linux, обеспечивают доступ в Интернет со скоростью до 1000 Мбит/с, что гарантирует быструю загрузку веб-страниц и высокую производительность онлайн-приложений на обеих операционных системах.

  26. ventolin tablet 4mg: Ventolin inhaler online – ventolin cost

  27. I know this website gives quality dependent content and other material, is there any other
    site which presents these kinds of stuff in quality?

  28. Kantorbola merupakan agen judi online yang menyediakan beberapa macam permainan di antaranya slot gacor, livecasino, judi bola, poker, togel dan trade. kantor bola juga memiliki rtp tinggi 98% gampang menang

  29. ventolin prescription uk: Ventolin HFA Inhaler – buy ventolin australia

  30. Удобство для клиента
    пэ https://truba-pe.pp.ua.

  31. https://claritin.icu/# can you buy ventolin over the counter

  32. ventolin for sale canada: Ventolin inhaler online – how much is ventolin

  33. Interesting blog! Is your theme custom made or did you download
    it from somewhere? A theme like yours with a few simple adjustements would really make my blog shine.
    Please let me know where you got your theme.
    Kudos

  34. https://claritin.icu/# purchase ventolin inhaler

  35. mynet sohbet odalarında sizleride bekleriz.

  36. Great web site. Plenty of helpful information here.
    I am sending it to a few buddies ans also sharing in delicious.
    And certainly, thank you to your effort!

  37. farmacia online migliore: avanafil prezzo in farmacia – farmacie online autorizzate elenco

  38. http://avanafilit.icu/# comprare farmaci online all’estero

  39. farmacie online autorizzate elenco farmacia online migliore migliori farmacie online 2023

  40. pillole per erezioni fortissime: viagra prezzo farmacia – pillole per erezione in farmacia senza ricetta

  41. https://avanafilit.icu/# farmacia online migliore

  42. farmacia online senza ricetta kamagra acquisto farmaci con ricetta

  43. nhà cái
    In recent years, the landscape of digital entertainment and online gaming has expanded, with ‘nhà cái’ (betting houses or bookmakers) becoming a significant part. Among these, ‘nhà cái RG’ has emerged as a notable player. It’s essential to understand what these entities are and how they operate in the modern digital world.

    A ‘nhà cái’ essentially refers to an organization or an online platform that offers betting services. These can range from sports betting to other forms of wagering. The growth of internet connectivity and mobile technology has made these services more accessible than ever before.

    Among the myriad of options, ‘nhà cái RG’ has been mentioned frequently. It appears to be one of the numerous online betting platforms. The ‘RG’ could be an abbreviation or a part of the brand’s name. As with any online betting platform, it’s crucial for users to understand the terms, conditions, and the legalities involved in their country or region.

    The phrase ‘RG nhà cái’ could be interpreted as emphasizing the specific brand ‘RG’ within the broader category of bookmakers. This kind of focus suggests a discussion or analysis specific to that brand, possibly about its services, user experience, or its standing in the market.

    Finally, ‘Nhà cái Uy tín’ is a term that people often look for. ‘Uy tín’ translates to ‘reputable’ or ‘trustworthy.’ In the context of online betting, it’s a crucial aspect. Users typically seek platforms that are reliable, have transparent operations, and offer fair play. Trustworthiness also encompasses aspects like customer service, the security of transactions, and the protection of user data.

    In conclusion, understanding the dynamics of ‘nhà cái,’ such as ‘nhà cái RG,’ and the importance of ‘Uy tín’ is vital for anyone interested in or participating in online betting. It’s a world that offers entertainment and opportunities but also requires a high level of awareness and responsibility.

  44. İçel Psikoloji olarak, Mersin psikolog ekibimizle ruh sağlığınızı önemsiyoruz.

  45. farmacia online migliore: farmacia online piu conveniente – comprare farmaci online all’estero

  46. https://kamagrait.club/# farmacie online affidabili

  47. farmacia online Cialis senza ricetta farmacia online senza ricetta

  48. farmacia online migliore: farmacia online miglior prezzo – comprare farmaci online all’estero

  49. Hello! Would you mind if I share your blog wirh my facebook
    group? There’s a lot of people that I think would really appreciate your content.

    Please let me know. Thanks

    my blog – Цены на пересадку волос в Турции

  50. farmacie online affidabili Farmacie a roma che vendono cialis senza ricetta farmaci senza ricetta elenco

  51. farmacia online miglior prezzo: kamagra gel prezzo – farmacia online

  52. https://kamagrait.club/# farmaci senza ricetta elenco

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *