গল্প : মেঘলা সময় : বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

‘আজ রৌদ্র ডিঙায় ভেসে ভেসে
যাব রোদের বুকে ঢুকে
নীল আকাশের পারা খুলে
মাখব নীল বুকে-মুখে…’

ছত্রটি আর শেষের দিকে গড়ায়নি। শুরু হয়েছিল অনেক আগে। শেষেই বন্দি হয়ে আছে আসল কথাটা। কিন্তু সেই ‘শেষটাকে ছুঁতে দিল না সময়। মুখরা কী এক এসে সময়টাকে টেনে নিয়ে গেছে অন্যদিকে। কী সেটা? গ্রাম্য ঘর-বাড়িতে ঘরকণ্যার কাজ করতে করতে ভাবে মেঘলা। মেঘলা, মানে মেঘবতি মৈত্র। বয়স পঁচিশ। পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক। বিয়ে হয়েছে চার বছর। তিন বছরের একটা মেয়ে আছে। নাম বৃষ্টি। চাকরি পেয়েছিল মেঘলা। কিন্তু মেয়েকে সামলাতে ছেড়েছে নিজের ইচ্ছায়। সজল ওর স্বামী। আয়কর অফিসে চাকরি করে বাইরে। সেখানে একাই থাকে সে। আজ সে চলে যাবে।

গল্প

মেঘলা সময়

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

এক

সজল চলে গেল। দরজাটা এখনও দুলছে। বারান্দায় বিড়ালটা সেইভাবে ঘুমোচ্ছে। সিঁড়ির ওপরে তার গায়ের বাতাস এখনও ঘুরঘুর করছে। পথের বাঁকে তার চকিতে মিলিয়ে যাওয়ার আভাসটা এখনও লেগে আছে।

মেঘলা মুড়ির বাটিটা নিয়ে বারান্দার খাটে এসে বসল। মুড়ি মাখাচ্ছে। বৃষ্টি পাশের বাড়িতে খেলছে। এক্ষুনি ছুটে এসে মায়ের কাছে মুখ পাতবে।

ক্ষণে ক্ষণে মেঘলা শুন্য রাস্তায় তাকায়। সজলের গায়ের গন্ধ ভেসে আসছে। ওর হাসিটা পড়ন্ত বিকেলের রোদে লেগে আছে যেন। রাস্তার পাশে জিবলী গাছে রোদ পড়েছে। একটা বুলবুলি সেখানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। আনমনে একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থাকে মেঘলা। এই ফাঁকে বৃষ্টি এসে যায়।

‘মা মুড়ি দাও !’ বলেই হাঁ-করে গাল পাতে।
মেঘলা একমুঠো মুড়ি গালে ঢুকিয়ে দেয়। মুড়ির সাথে কুট করে আঙুল কামড়ে দেয় বৃষ্টি।
‘উহ্ঃ ! কী করলি এ !’ চমকে ওঠে মেঘলা।
‘হিহিহি ! কামড়ে দিয়েছি !’
মুড়ি চিবুতে চিবুতে মায়ের মুখ দেখে গম্ভীর হয়ে যায় বৃষ্টি।
‘এ মাঃ ! তুমি কাঁদছ !…আমার জন্যে, না বাবার জন্যে?’
সামলে নেয় মেঘলা। ব্লাউজের হাতায় তাড়াতাড়ি চোখ মুছে নেয়। তারপর মেয়ের গালে ছোট্টকরে চিমটি কেটে হেসে বলে, ‘তো-মা-র জন্য!’
‘কেন ? আমিতো ঠিক আছি।’
‘হ্যাঁ একদম ঠিক আছ মা!’ বলেই মেয়েকে একটানে কোলে তুলে মুড়ির পাত্র গুছিয়ে নেয়। তারপর দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, ‘রুটি বানানো হবে এখন।’
‘এক্ষুনি!’
‘হ্যাঁ, সন্ধ্যেবেলায় পড়তে বসতে হবে তো!’

রান্নাঘরের দেওয়ালে রুটি বেলার চাকতিটা হেলান দিয়ে রাখা। মেঝেতে একটা কাঠের পিঁড়ি পেতে বসল মেঘলা। বৃষ্টি মায়ের কাঁধ ধরে হ্যাংলা পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্যাসের চুলার ওপর দিয়ে চাকতিটিতে চোখ পড়ল মেঘলার। গতকাল দুজনে মিলে কিনেছে। চাকতিতে চোখ, কিন্তু মনটা চাকতি ছেড়ে গতরাতে চলে গেছে। সজলের সেই হাসিটা হুট করে মনে উঠল। কনুইয়ে ভর দিয়ে হাতের তালুতে মাথা রেখে মেঘলার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসেছিল সজল। রাতের খাওয়া সেরে শুয়েছিল ওরা। টেবিল ল্যাম্পটা তখনও নেভানো হয়নি। বৃষ্টি অন্যপাশে ঘুমোচ্ছিল। সজল বলেছিল, ‘মায়াবতী শাড়ির নাম শুনেই দোকানদার কেমন একটা অভিসন্ধি নিয়ে মুখের দিকে চাইল, বুঝলাম এরা সিন্ডিকেট করছে, বললাম-আরও পাঁচশ টাকা বাড়িয়ে দেব, কিন্তু ওই শাড়ীই আমার চাই।’

মায়াবতী শাড়ির খুব চল হয়েছে। দাম বারো হাজার টাকা। একটি টিভি সিরিয়ালে দেখা যায়। মেঘলার জন্য একটা এনেছে সজল।

যখন বলেছিল, সজলের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠেছিল। সে হাসি এমনি এমনি নয়। নিজেকে উপুড় করে ঢালতে অজান্তে এই হাসির জন্ম হয়। নিজের বলতে কিছুই আর নিজের কাছে রাখেনি সজল। সবটা উজাড় করে দিয়েছিল ওই হাসির পাত্রে। কখনও কখনও কিছু কিছু মানুষের এমন হয়। সে নিজেও জানেনা। মাছ যেমন চলতে গিয়ে, জলের মধ্যে পিঠের দাঁড়া দেখিয়ে ফেলে, কিছু মানুষও তেমনি তাদের আত্ম-প্রদর্শন ঘটায়।

ভাবতে ভাবতে মেঘলার ঠোঁটের কোণে হাসি এসে যায়। অস্ফুটে বলে, ‘এক্কেবারে ছেলে মানুষ !’ আটার পাত্রটা খুলতে থাকে।
‘কে ছেলেমানুষ মা?’ মেঝের ওপরে একটা চামচ নিয়ে ঠুকঠুক করতে করতে প্রশ্ন করে বৃষ্টি।
সবদিকে কান আছে মেয়ের। ভালোই লাগে মেঘলার। চোখদুটো টেনে ভ্রু প্রসারিত করে মিচকি হেসে মেয়ের দিকে ড্যাবডেবিয়ে চেয়ে উত্তর দেয়, ‘তু-মি-!’
‘আমি! আমি তো ছেলেমানুষই!’
‘হ্যাঁ, একদম ছেলেমানুষ!’ না হেসে পারে না মেঘলা, হাসতে হাসতে মেয়ের গালে আলতো করে টিপ দেয়।

মেঘলা হাত চালাতে থাকে। আটা মাখছে। শিউলিফুলের বোঁটার মত সতেজ দেহখানা। পিঠের ওপর থেকে নীল শাড়ী সামান্য সরে আছে। এক ছড়া চুল নেমে এসেছে মুখের পাশে। স্টিলের একটা থালা থেকে খানিকটা আলো উঠে আসছে মুখে। কালো চুলের পাশে মুখের রেখা ভাসছে, পিছন থেকে স্পষ্ট বেশ। সকালের রোদ যেমন ধীরে ধীরে শক্ত হয়, মুখের রেখায় বাস্তবতাকে সহ্য করার তেমন একটা দৃঢ়তা।

দুই

রাতে জামরঙের শাড়িটা বের করল মেঘলা। একবারও পরা হয়নি। আলমারিতে তোলা ছিল। পরিচ্ছন্নতার গন্ধ বের হচ্ছে।
মেঝেতে মাদুর পেতে বই ছড়িয়ে বসে আছে বৃষ্টি। মেঘলা শাড়িটা নিয়ে খাটে এসে বসল। দুই হাতে শাড়িটা মেলে দেখছে। টিউবলাইটের আলোয় চকচক করছে রঙ। রাতের খানিকটা কালো, আর জামের রঙ, দুই মিলে গভীর সমুদ্রের জলরাশির মত দেখাচ্ছে। দুই হাতে যেন সেই জলরাশি ধরে রেখেছে মেঘলা।
ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে সুচটা বের করল। নানা রঙের সুতোর কয়েকটা বলও নিল হাতে। বৃষ্টি মায়ের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছিল। বলল, ‘কী করবে মা?’
দাঁতে একটা সুতো কেটে খাটে এসে বসতে বসতে মেঘলা বলল, ‘একটা নকশি কাঁথা বানাব!’
‘আমার জন্য?’ দাঁত বের করে জিজ্ঞেস করল বৃষ্টি।
মেঘলা স্মিত হাসল, ‘হ্যাঁ, তোমার জন্যই তো!’ শাড়িটা ভাঁজ খুলে কোলের ওপর ফেলে দিল।
রাত আটটার দিকে সুমনা এল। সুমনা নতুন বৌ। মাস তিনেক বিয়ে হয়েছে। পাশের বাড়িটা ওর শ্বশুর বাড়ি। থার্ড ইয়ারে পড়ে। মেঘলার সাথে বেশ খাতির।
মেঘলা তখনও কাঁথা বুনছে। খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। সুমনাকে পাশেই বসাল। বৃষ্টি শুয়ে শুয়ে ঘুমের গান গাইছে। তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়বে।
‘বাহ্! কী সুন্দর হচ্ছে !’ ঝুঁকে এসে বলল সুমনা।
আনত মস্তকে সুচ টানতে টানতে হাসল মেঘলা।
‘তুমি কাঁথাও বুনতে পারো!’
‘শিখেছিলাম, অনেকদিন অভ্যেস নেই।’
‘দারুণ হচ্ছে! কতদিন লাগবে?’
‘একটু বেশি দিনই লাগবে।’
‘দাদা আসার আগে তো!’ হোহো করে হেসে ওঠে সুমনা। মেঘলাও তাই। সুচ বিশ্রাম পেল একটু।
‘কুল খাবে!’
‘রাতে টক!’
‘খাওনা!’ বলেই সুমনার মুখের দিকে একঝলক হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘খু-উ-ব কাজ দেবে!’
সুমনা খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল। হাসি যেন থামছে না। সাথে মুখের কোথাও যেন লজ্বা-রঙ ছড়াল। বৃষ্টিকে একঝলক দেখেই হাসির টোন কমাল।
‘উঠে যাবে?’
‘য়ু হুক, সবে ঘুমিয়েছে।’
টেবিলের ওপর থেকে কুলের বাটি আনতে গেল মেঘলা।
‘দাদা পৌঁচেছেন?’
‘এখনও ফোন করিনি,’ বাটিটা সুমনার দিকে বাড়াল, ‘ নাও ধরো!’
‘ওমাঃ এখনও খবর নাওনি!’
আগে যেভাবে বসেছিল, ঠিক সেভাবে আবার খাটে এসে বসল মেঘলা। সুচ-গাথা কাঁথাটা কোলের উপরে তুলে নিল।
‘এখনও সময় হয়নি, অনেক দূর তো।’
‘একটা খবর নিতে পারতে, দূরের পথ,’ কুলে কামড় বসাল সুমনা।
‘খুব টক?’ জিজ্ঞেস করল মেঘলা।
‘না না, খাবে?’
‘এখন আর না।’
হেসে ওঠে সুমনা। চিবোতে থাকে।
‘দাদা ফোন করেননি?’
‘করেছিল হয়তো, ’ সুচ ঠেলতে ঠেলতে বলল মেঘলা, ‘ধরিনি।’
‘এ মা কেন! কোন সমস্যা?’ সুমনার কুলেভরা মুখ হাঁ।
‘না না, কোন সমস্যা না, ’ বোঝানোর জন্য একটু প্রস্তুত হয়ে নেয়, ‘দেখো এখন মোবাইল আছে, ফেসবুক আছে, চাইলেই কথা বলা যায়, আর যায় বলেই কথা জমতে পারে না, কথা না জমলে অনুভূতি আসবে কী করে? ’
‘ওরে বাবা, এ তো দার্শনিক কথা! তা এই এক্সপেরিমেন্টটা পরে করলেও পারতে।’
‘এই এক্সপেরিমেন্ট এখনই করার সময়!’

তিন

রাত একটার দিকে আলো নেভাল মেঘলা। শুতে যাবে। টেবিলের ওপরে মোবাইলটা চিকচিক করছে। খাটের দিকে যাওয়ার আগে সেদিকটাতে গেল। সজল অনেকবার ফোন করেছে। মোবাইল সাইলেন্ট মোডে ছিল। ঘর এখন অন্ধকার। তাই নোটিফিকেশন লাইট বোাঝা যাচ্ছে। স্ক্রিন আনলক করে ফোন দিতে যাবে, তখনই সজলের ফোন এল।
‘হ্যালো!’ ধীর গলায় বলল মেঘলা।
‘আরে ফোন ধরছ না কেন?…আমি পৌঁছেছি।’
‘জানি…শোনো!’
পাথরের মত লাগল কথাটা।
‘কী হয়েছে!’ উদ্বেগে বলল সজল, ‘বৃষ্টি আলো আছে তো?’
‘হ্যাঁ একদম ঠিক আছে, ঘুমোচ্ছে।’
‘তবে!’
চুপ থাকে মেঘলা। তারপর দুম করে অনুরোধ করে, ‘একটা চিঠি লিখবে?… না না, একটা মেসেজ?’
‘মেসেজ!’ বলেই নির্ভারের মত খানিকটা হাসে সজল।
‘কী বিষয়ে লিখতে হবে?’
‘বিয়ের আগে আমায় নিয়ে তোমার একটি অনুভূতি।’
‘একটা অনুভূতি?’
‘হু।’ মোবাইলটা কানে ধরেই খাটে এসে শুতে শুতে বলল মেঘলা, ‘আজ রাতেই দেবে! আমি শুধু “ ‘পেয়েছি’ জানাব।”
‘ফিরতি মেসেজ দেবে না?’
‘না, আমার অনুভূতিটা জানাব, তবে মেসেজ লিখে নয়, চিঠি লিখে।’
‘চিঠি দেবে!’ সজলের কন্ঠে বিষ্ময়।
‘পোস্ট করব না, রেখে দেবো, বাড়ি এলে দেখবে।’
সজল নীচুস্বরে বলে, ‘বাহ্বা! কী রোমান্টিক!’
‘কিছু বললে?’
‘না, বলছিলাম মঙ্গল এসেছে।’
‘ও মঙ্গল আছে আজ?’
‘হ্যাঁ, রাতের খাবার নিয়ে এসেছিল, ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে দেখে যেতে দিইনি।’
‘ভালোই হল!… আচ্ছা মেসেজ সেন্ড করে ফোন করবে না, আমিই জানাব!’
‘বুঝেছি, কথা হবে মনে মনে, ফোনে নয়।’
খানিকটা হাসল সজল, মেঘলাও তাই।

মাথার কাছে ফোন রাখে না মেঘলা। এতে ওর ঘুমের ক্ষতি হয়। রাতে সাধারণত মোবাইল বন্ধ রাখে। কিন্তু সজল বাইরে থাকে বলে ফোন খোলা রাখতে হয়। কিন্তু নিরাপদ দূরে রাখে। এখন মোবাইলটা বালিশের পাশে রাখল। সজলের মেসেজ আসবে। কিন্তু তার দেরি আছে। ভাবছে, উঠে গিয়ে মোবাইলটা টেবিলের ওপর রেখে আসবে। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। সজল কী লিখবে-তাই ভাবছে। বৃষ্টি’র কাঁথাটা ঠিক করা হয়নি। ইচ্ছে করছে না। অত ঠান্ডা নেই আজ।

চার

রাত বারোটার দিকে সজলের মেসেজ এল। খেয়াল রেখেছিল মেঘলা। খপকরে মোবাইলটা চোখের সামনে ধরল। সজল লিখেছে :
‘তোমাকে যেদিন প্রথম দেখি, সেদিন একটা কথা মনে জেগেছিল। সময়টা ছিল বসন্ত উৎসবের দিন। আমাদের কলেজে ওইবারই প্রথম বসন্ত উৎসব হয়েছিল। আর কখনও হয়নি। বাসন্তি রঙের শাড়ি পরেছিলে তুমি। কপালে বড় লাল টিপ। কলেজের মাঠে চকচকে রোদ ; তোমার গায়ে পড়ছিল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আর দশজনের মাঝে তোমাকে দেখাচ্ছিল শাখার শেষ পাতাটির মত। যেটাতে “দূর” এবং “কাছে” দুটোই লেগে থাকে। সেদিন আমার কাছে “দূর”টাই বেশি বলে মনে হয়েছিল। মনটা খুব আনচান করে উঠেছিল। তুমি আঁচল ঠিক করতে করতে আমার উপর কিছুক্ষণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে। আর আমি সেই “দূর”কে ছুঁতে পাগল হয়ে উঠলাম। তার দুবছর পর আমাদের বিয়ে হল। বিয়ের পর সেই দিনটার কথা খুব মনে পড়ত। তারপর…’

আর কিছু লেখেনি সজল। তারপর কী―খুব জানতে ইচ্ছে করছে। একবার ফোন করতেও গিয়েছিল। কিন্তু করেনি। মোবাইলটা বুকের ওপর ফেলে দুহাত টানটান করল বিছানায়। চোখবুজে ভাবছে। সজলের পরের ভাবনাটা কী? উত্তরটা সজলের কাছ থেকে নয়, নিজের কাছ থেকে নিতে হবে। তানাহলে সজলের সাথে তার যোগাযোগটা কিসে?
ঘরময় অন্ধকার। সারাদিন আকাশ হেসেছে। মনে হচ্ছে সেই হাসি এখনও ঝরে পড়ছে। অন্ধকারের আনন্দ-আলো আছে। প্রকৃত আলো জ্বাললেই তা উবে যায়। তাই আর আলো জ্বালায়নি মেঘলা। মোবাইলটা দূরে রেখে শুয়ে পড়বে। তার আগে সজলকে মেসেজ লিখে দিল, ‘Got & read…’।

পাঁচ

আকাশ বেশ নীল। মুঠো মুঠো শুভ্রতা ছুঁড়ে দিচ্ছে। সারা উঠোন ভরে যাচ্ছে তাতে। চৈত্র মাসে এমনই হয়। সকালের খাওয়া-দাওয়া শেষ। বৃষ্টি বারান্দায় বসে আঁকিবুকি খেলছে। পাশে টেবিলে বসে চিঠি লিখছে মেঘলা। সজল বাড়ি এলে দেখাবে। কিছুক্ষণ আগে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনছিল, ‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ’। গায়ক-বিক্রম সিং খাংগুরা। সে নিজেও গায়। হারমনিয়াম আছে ঘরে। অনেকদিন বসা হয় না। গানটিও শোনা হয় না অনেকদিন। আজকের আকাশ দেখে শুনতে ইচ্ছে হল। এই গানটি শুনতে শুনতে তার নতুন একটা অনুভূতি হল; সত্যের যেন তিনটে মাথা আছে। এক মাথায় দুঃখ, এক মাথায় আনন্দ, আর তৃতীয় মাথা ফাঁকা। এই গানটি সত্যের দু মাথা থেকে দুঃখ আর আনন্দকে টেনে নিয়ে সেই ফাঁকা মাথায় জড়ো করে রাখে একসাথে। তাতে তাদের যে চেহারা হয়, তা নতুন। সেই নতুনরুপটি দেখার মধ্যে মানবজীবনের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। গানটির রেশ মেঘলার ভাবনায় ছেদ টেনে দিয়েছিল। তাই চিঠি লিখতে লিখতে সব লাইনগুলো কেটে দিল। নতুন পাতায় আবার লিখতে শুরু করল :
‘প্রিয় সজল
ভালোবাসা নিও।
তোমার মেসেজ মন দিয়ে পড়েছি। আমার অনুভূতি এখানে বলার ক্ষমতা আমার নেই। তুমি লিখেছ―বসন্ত উৎসবের দিন আমি তোমার ওপর খানিকক্ষণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলাম। করেছিলাম। কিন্তু তোমার ওপরে না। একটা অবয়বের ওপর। তুমি তখন “তুমি” হয়ে ওঠোনি। তার কয়েকদিন পরে এক দুপুর বেলায় তুমি যখন কলেজের রাস্তার পাশে আমাকে ডাব কিনে খাওয়ালে, তখনই সেই অবয়বটা তুমি হয়ে ভেসে উঠল মনের আয়নায়। যেন আগে থেকেই চিনতাম তোমায়। তারপর…’
এ পর্যন্ত লিখে রেখে দিল মেঘলা। কাঁথা সেলাইয়ের কাজটা শেষ করতে হবে। বৃষ্টি’র দুটো জামা কাচা আছে । রোদে মেলা হয়নি। নিঙড়িয়ে বারান্দার গামলায় রাখা। সে দুটো নিয়ে উঠোনে নেমে এল । রোদ যেন ভেঙে ভেঙে নিজেকে বসিয়ে রেখেছে পাতায় পাতায়। আড়ায় জামা মেলতে মেলতে ভাবে মেঘলা, ‘এই রোদের হৃদয় আছে, আজ যেন তা খোলা।’
সজলের ফোন এল। ঘর থেকে ছুটে এনে দিল বৃষ্টি। মেঘলা বারান্দার নীচে দাঁড়িয়েই তাড়াতাড়ি আঁচলে দুহাত মুছে ফোনটা নিল।
‘হ্যালো !’
‘কী ব্যাপার ! কোন সাড়াশব্দ নেই !’ বলল সজল।
‘কেন ! তোমার মেসেজ পড়েছি, বলেছি তো!’
‘কেমন লাগল বললে নাতো! তোমার কথাও তো বললে না!’
‘মোবাইলে তো বলার কথা না!’
‘মেসেজ লেখো!’
‘আমি খাতায় লিখেছি।’
‘অ্যাই কী লিখেছ বলো না! খুব শুনতে ইচ্ছে করছে, মোবাইলেই বলো না প্লিজ!’
‘হাল্কা হয়ে যাবে, মোবাইল মুখের জিনিস, অন্তরে ঢোকানো যায় না।’
‘তুমি তো পড়ে বলবে!’
‘তুমিও তো যন্ত্রে শুনবে, তারপর কিছু কথার জন্ম হবে, মোবাইলেই বলাবলি হবে, কথা খালি হয়ে যাবে, যে কথা বলার তা আর তৈরী হবে না।’
‘বাপরে! কঠিন ব্রত!’

ছয়

ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল সজলের। এ সপ্তাহ ছুটি নিয়েছে। বৃষ্টি তক্কে তক্কে ছিল। সেই আসা থেকে বাবার সাথে খেলা চলছিল। এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। মেঘলা বাইরেটা গুছিয়ে ঘরে এল। সজল খাটে কাত হয়ে পান চিবুচ্ছে।
‘কই! কী লিখেছ দেখাও!’
‘দেখাব বলেই তো তাড়াতাড়ি গুছিয়ে নিলাম সব!’
টেবিলের ড্রয়ার থেকে খাতাটা বের করে সজলের সামনে মেলে ধরে মেঘলা। নরম আলো জ্বলছে ঘরে। সাদা পাতায় কালো অক্ষরে লেখা চারটে লাইন। খাটের ওপরে কনুইয়ে ভর দিয়েই কাত হয়ে পড়তে থাকে সজল। মেঘলা অদূরে মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ টিপে হাসছে। সজল পড়া শেষ করে বলে, ‘তারপর কী, সেটাতো লেখোনি!’
‘তুমিও তো মেসেজে “তারপর” লিখে আর লেখোনি! এখন একটা কাজ করতে হবে,’ মুচকি হেসে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বলল মেঘলা, ‘তোমার “তারপরের”টা আমি লিখব, আর আমার “তারপরের”টা তুমি লিখবে, এক লাইনে,’ একটা কলম এগিয়ে দিল, ‘জলদি লেখো!’ মুখে হাসি উপচে পড়ছে।
সজলের লিখতে ইচ্ছে করছিল না। সারাদিন জার্নিতে ধকল গেছে। মাথাটাও ফ্রেস নেই। কিন্তু ভাবল, যেকোন মূল্যবান উপহারের চেয়ে একটি লাইন এখন মেঘলার কাছে মহামূল্যবান। তা-ই সে চাচ্ছে। একটু ভেবে সজল লিখল, ‘ধোঁয়াশা অবয়ব করতলে এল, আর আমি সেই অবয়বে নিজের আদল দিলাম।’
মেঘলা লিখেছিল আগেই। খাতার শেষের দিকে আছে। ও লিখেছিল, ‘জানলাম, ঈশ্বর “কাছে”র বিভ্রম দিয়ে দূরকে কাছে রেখে ভোলায়।’
দুজনেই একে অপরেরটা পড়ল; মেঘলা দূরে দাঁড়িয়ে, আর সজল খাটে শুয়ে।
মেঘলা চোখ বন্ধ করে ভাবল, সে যা বলতে চেয়েছে, সজল তাও লিখেছে, যা বলতে চায়নি,তাও লিখেছে।
সুইচ অফ করে টেবিল ল্যাম্পের আলোটা বাড়িয়ে দিল মেঘলা। সারা ঘরে আঁধারের ঝাঁপি পড়ে গেল। আলমারি থেকে কাঁথাটা নিয়ে সজলের পাশে এসে বসল। বুকের সাথে মেলে ধরে সজলকে দেখিয়ে বলল, ‘আমারটার সাথে মিলেছে তোমার?’

সজল প্রথমে বুঝতে পারেনি। সে উত্তর খুঁজছিল। কাঁথাটায় ভালো করে চোখ বসতেই বলল, ‘আরে! সেই মায়াবতী শাড়ি না! কাঁথা বানিয়েছ! ওটা তো তোমার পরার জন্য! অনেক দামী!’
‘হ্যাঁ অনেক দামি, কিন্তু আমার মনের ভেতরে কী একটা ছটফট করছিল, সেটাকে তোমার করে বের করতে না পারলে তার কোন দাম থাকত না, তাই এই একমাস ধরে তোমার জন্য এই কাঁথা বানিয়ে সেটাকে বের করেছি, এখন এটাতে দুটো দাম রয়েছে, একটা শাড়ির, আরেকটা আমার মনের ভেতরের সেইটার, দুটো দাম মিলে খুব ভারি হয়েছে এটা, মোবাইলে কথা বলি না বলে রাগ করো, যদি মোবাইলেই কথা বলতাম শুধু, মনে সেই ছটফটটা জন্মাতো না, দামের বাইরে যে আরেটটা দাম আছে, বুঝতাম কী করে তখন?’

মেঘলার চোখে চোখ স্থির হল সজলের। অনেক বছর আগের সেই প্রথম দেখা, তারপর এত সময়, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, প্রথম দিনের মতই লাগছে মেঘলাকে।
সজল মোবাইল বন্ধ করল। তারপর উঠে জোরে সেটাকে আলমারির ড্রয়ারে এমনভাবে লক করল, যেন হারানো সেই ম্যাড়মেড়ে সময়টা ওই মোবাইল থেকে আবার বেরিয়ে আসবে।

This image has an empty alt attribute; its file name is ttttt888-1024x200.jpg

লেখকের আরও লেখা

গল্প – সব আছে : বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

About S M Tuhin

দেখে আসুন

যাপনের জীবন যাত্রা : ঋভু চট্টোপাধ্যায়

যাপনের জীবন যাত্রা ঋভু চট্টোপাধ্যায় -তুমি আজ কিন্তু সন্ধেবেলায় বেরোবে না বাবা, আমাকে লগের প্রবলেম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *