গল্প । যতিচিহ্নের খোঁজে : মোস্তফা তারিকুল আহসান

গল্প

যতিচিহ্নের খোঁজে

মোস্তফা তারিকুল আহসান

মেয়েটা তার বাম ভ্রু খানিকটা কাঁপিয়ে চোখটা বাইরে আকাশের দিকে ফেরালে যে দৃশ্যটার জন্ম হয় তার ব্যাখ্যা হাবিব দিতে পারে না; অনুভব করে, বুকের মধ্যে একটা হাহাকার জাতীয় স্বরহীন শব্দ হয়- খানিকটা উত্তেজনাও একে বলা যায়। বাম চোখের তারার মধ্যে যে সৌন্দর্যময় রঙ খেলা করছে বিদ্যুতপ্রভার মতো তাকে সে কি বলবে? পঞ্চাশের পরে খানিকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জীবন অতিবাহিত করতে গিয়ে, সংসার চাকরিতে নিজেকে সপে দিয়ে সে সব হারাতে বসেছে বলে একসময় ভাবত, এখন আর ভাবে না,তখন সে কবিতার ডালপালা নিয়ে সময় কাটাতো, নতুন শব্দ, শব্দময়তার ইন্দ্রজাল নিয়ে ব্যস্ত দিনরাত কাটাতো সেই দিনের ছিটেফোটাও তার মধ্যে আর ছিলো না বলে সে জানে বা মেনে নিয়েছে। বন্ধুরা তাকে পলাতক বলে মনে করলেও সে নিশ্চুপ থেকেছে; দুটো কবিতার বই বের হওয়ার পরও সে ইউটার্ন দিয়েছে। ব্যাংকের হিসেব-নিকেশ, সংসারের দায়,বউয়ের চোখরাঙানি-অভিযোগ,সন্তানরদের চাহিদারাজ্য সামলে দিব্যি ধারাবাহিক মনুষ্যজীবন যাপন করে চলেছে কুড়ি কুড়ি বছর। তার চোখ তো মরে গেছে, চশমা দিয়ে সে অংকের চেহারা দেখে, টাকার চেহারা দেখে কাউন্টারে সারি সারি মানুষ দেখে মাছির মতো,আর ম্যানেজার সাহেবের কলিংবেল দেখে কখন সেটা বেজে ঊঠবে।

কুড়ি বছর পর সামনে সদ্য ফোটা গোলাপের মতো কিশোরী নাকি তরুণীর ভ্রুকাপাঁনোর দৃশ্য হাবিব আবিষ্কার করল কীভাবে, সে ভাবতে থাকে। তার বাম পাশে এক ভদ্রলোক কোর্ট-টাই পরা, সামনে একজন বয়স্ক মহিলার পাশে বসে আছে কলাপাতা রঙের একটা জামা আর সাদা পাতলা ওড়না পরা মেয়েটি। সে অটোতে উঠেই প্রতিদিনকার মতো মানিব্যাগ এবং চাবির গুচ্ছ ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে; এই কাজে কিছুক্ষণ ব্যস্ত থাকার পর সে পুরু লেন্সের চশমাটা রুমাল দিয়ে বার কয়েক মুছে নতুন করে নাকের ওপর বসায়। বাম চোখে ঝাপসা একটা অন্ধকার-অন্ধকার ভাব হলে সে আবার চশমাটা খোলে। সে টিসু খোঁজে। কোটের বাম পকেটে কয়েকটা টিসু থাকে বহু দিনের অভ্যেসবশত, সেখান থেকে একটা টিসু নিয়ে চশমাটার বাম কাঁচ ভালো করে মোছে, চকচকে করে তোলে; মুচি যেমন জুতো পালিশ করে চকচকে করে তোলে সেও তেমন চকচকে করে তোলার চেষ্টা করে। পেরেছে বলে মনে হলে চশমাটা আবার নাকের ওপর সটান বসিয়ে দেয়। এখন সে ডানে বামে সামনে তাকায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে; আর পরিষ্কার লেন্সের চশমায় সে বিশ বছর পর তরুণির চোখের দীপ্ত চঞ্চলা চাহনির প্রপাত আবিষ্কার করে; আবিষ্কার করে বলাটা ঠিক কিনা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ তবে সে বুঝতে পারে জীবনঘনিষ্ট সূক্ষ্ম সংবেদগুলো বা মোহনীয় সব খেলাধুলাসমূহ যা সে হারিয়ে ফেলেছিল তা সব লুপ্ত হয়ে যায় নি; চাপা ছিল দুই যুগের মতো। হাবিব খানিকটা আনন্দ পায়,এই আনন্দের নাম কি? সৌন্দর্যময় কোনো মহাদেশ আবিষ্কারের আনন্দ? সে কি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মতো পুলকিত? হাবিব পুলকিত হয়, রোমাঞ্চিত হয়, প্রেমে পড়ার মতো আনন্দ এটা নয় সে জানে তবে সে রোমিও ভাবতে চায় নিজেকে অথবা সেক্সপিয়র। বামপাশের ভদ্রলোক বেশ মোটা হওয়ার কারণে ওর বসতে অসুবিধা হয়; লোকটা সকালে দাঁত ব্রাশ করতে ভুলে গেছে অথবা তার পাইরিয়া রোগ আছে সে সনাক্ত করে আর বিকট গন্ধে তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও সে তেমন কোনো কষ্ট অনুভব করে না। সে আগেও একরম দন্তজনিত দুগর্ন্ধের কবলে পড়েছে এবং তার মনে হয়েছিল সে আর অটো বা এমাতে চড়বে না; ধার করে বা দেনা করে একটা পুরনো গাড়ি কিনে ফেলবে। একটা প্রোমোশন পেলে সে গাড়ি কিনতে পারত। সংসারের লাগামহীন খরচের কথা ভেবে সে আর কিনতে পারে নি। তবে মনে মনে ভেবেছিল পত্রিকায় চিঠিপত্রের কলামে একটা লেখা দেবে। কমনসেন্স বা সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে, সে তৈরি করতে পারে নি।

তবে আজ খুব বেশি পীড়াদায়ক মনে হচ্ছে না ব্যাপারটা। সামনের বাম পাশের বয়স্কা মহিলা খুব সেজেগুজে নিজেকে জগতের শ্রেষ্ঠা সুন্দরী বানাবার চেষ্টা কেেরছেন সেটা বোঝা যায়। ভারি গহনা, দামি শাড়ি,কাজল লিপস্টিক ইত্যাদি সমবায়ে তাকে জড়বস্তু মনে হচ্ছে সেটা মহিলা একবারও ভাবতে পারছেন না। এটাই মনে হয় সত্য, কেউ নিজের অযোগ্যতার কথা ভাবতে পারে না। হাবিবের মনে হলো আজ তার চোখের জ্যোতি বেড়ে গেছে, চোখ আগের মতো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ব্যাপার লক্ষ করতে পারছে, গভীর গহন আনন্দরেখা খুঁজে পাচ্ছে। একবার ভাবে তার হলোটা কী? সকালবেলা সেই একই খাবার- আলু ভাজি, রুটি ডিম খেয়ে বের হলো, শ্যামলি বাজারের একটা লিস্ট ধরিয়ে দিল, ছেলে বড় অংকের একটা টাকা দাবি করল, মেয়ে নতুন ঘড়ি কেনার ঘোষণা দিল- সবতো রুটিন মতো হলো, তাহলে চোখ খুলে গেল কীভাবে? হাবিব মেয়েটার দিকে একবার খুব সংকোচভরে সামান্য উঁচু করে তাকায়, আবার চোখ নামিয়ে ফেলে। সে বাইরের আকাশ থেকে নিজের আকশ বাতাস পৃথিবী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

হাবিব নিজেকে শোনায়: ব্যাটা তোমার আজ কি হলো? তুমি কি জানো তোমার নন্দনের দরোজা আবার উন্মুক্ত হচ্ছে? তুমি আলোকহারা হওনি,তুমি বেঁচে আছ,তুমি আবার প্রজাপতির পাখায় সব রঙ দেখতে পাবে, গাঙশালিকের চোথে আকাক্সক্ষা দেখতে পাবে, প্রগাঢ় সন্ধ্যায় আবীরমাখা কাকাতুয়ার কাছে তোমার মনের সাযুজ্য খুঁজে পাবে অথবা আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসার পর তুমি চিনতে পারবে আত্মার আকুলতা, পরাজিত রাধার সাথে তোমার দেখা হলে তুমি মন খুলে কথা বলতে পারবে, তুমি তো বুঝতে পারো দীর্ঘদিন অন্ধ থাকার পর চোখের আলো কত তীব্র হয়ে ফিরে আসে। তুমি রাতের অন্ধকার জানালার পৃথিবীর সাথে বাক্য বিনিময় করতে পারবে; সত্য মিথ্যার মাঝে আরো অনেক জীবনের রঙ থাকে যা তোমাকে ভাবাত সবসময় তা তুমি আবার বুঝতে পারবে।

মেয়েটার দিকে তাকাতেই সে বুঝতে পারে সে কিশোরী নয় তরুণী তবে তার স্বভাব চঞ্চলা কিশোরীর। সে ডান হাতে ধরা সেল ফোন থেকে নিজের ছবি তোলার চেষ্টা করে। ছবি তোলে
না কেন? হাবিব লক্ষ করে বাম হাত দিয়ে সে তার উড়ন্ত চুল শাসন করার চেষ্টা করে। আবার কখনো কপালের কাছে সিথির কাছে বাম হাত দিয়ে চুলের গুচ্ছকে উপরের দিকে তুলে দিয়ে নতুন আকার দেবার চেষ্টা করে। চুল তার শাসন মানে না। যদিও ফাগুনের সকালে বাতাস খুব নেই তবু অটোর গতি বেশ বাতাস যোগান দেয়। সে তার ছোট্ট আর বাদামি রঙের ব্যাগ থেকে কি যেন খুঁজে চলে। একটু পরে একটা ক্লিপ বের করে বাম কপালের ওপর একগোছা চুল আটকায়। আবার মোবইলের স্ক্রিনে মুখ দেখে,পরক্ষণে ক্লিপটা খুলে ফেলে আর সেটা হাত থেকে অটো রিকশার মেঝেতে পড়ে গেলে মেয়েটা নিচু হয়ে ক্লিপটা তুলতে যায়; হাবিব খেয়াল না করে পারে না তার পায়ের কাছে ক্লিপটা তুলতে গিয়ে মেয়েটার ক্লিভেজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার চোখে,সদ্য তরুণী তার দুই বক্ষের মাঝে অতি মনোহর ত্বকাচ্ছিত সৌন্দর্যের লালিমা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। হাবিব তার চোখের আলোতে ক্ষণিকে নতুন জগত দেখতে পায়। তার হয়তো উচিত ছিলো মেয়েটার ক্লিপটা তুলে তার হাতে দেয়া, সেটাই সৌজন্য। তবে সে অটোতে ওঠা অবধি খানিকটা উতলা ছিলো বা মোহচ্ছনতায় ছিলো বলেই হয়তো এই সৌজন্যটুকু দেখাতে পারে নি। তবে মেয়েটা স্বস্থানে বসার পর তার দিকে ফিরে চুপি চুপি হাসে। এর দুটো অর্থ করা যেতে পারে; প্রথমত, মেয়েটার স্বভাবের মধ্যে চুপি চুপি হাসার ব্যাপার রয়েছে। আর দ্বিতীয়ত, ক্লিপটা পড়ে যাবার জন্য যে চঞ্চলতা তার জন্য ক্ষমাজনিত বা অপরাধবোধজনিত কারণে সে হেসেছে। হাবিব আসলে এসব নিয়ে খুব ভাবে না; সে ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন দেখা একটি ছবির কথা। মার্কিনি একটি ছবি। অস্কার পেয়েছিল সেবার। বন্ধুরা মিলে দেখে ছিল। সেখানে নায়িকা যে পেস্ট কালারের একটা দীর্ঘ গাউন পরে আর তার দুই সুডৌল স্তনের মধ্যবর্তী সৌন্দর্য পোষাকের লুকোচুরিতে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সেই দৃশ্য সে বহুদিন মনে রেখেছিল। আজ আবার মনে পড়ে। মেয়েটি বাম দিকে তাকিয়ে ছিলো, চোখে আগুন রঙের আহবান আর নারীর সৌন্দর্যময় ক্লিভেজের অপূর্ব শোভা। এটা ওদেশের মেয়েদের স্বাভাবিক ঢং সেটা সে জানত । তবে, তার যে অনাবিল আনন্দিত আর রোমাঞ্চিত হয়েছিল বা যেটুকু উত্তেজিত হয়েছিল তা তাকে সামায়িক মোহাবিষ্ট করেছিল তা আজো তার মনে আছে।

মেয়েটা মোবইলের ক্যামেরা চালু করে সেলফি মুডে পর পর কয়েকটা ছবি তোলে; তোলার সময় সে বাইরের পটভূমি ব্যবহার করার চেষ্টা করে। পদ্মা নদীর ধার দিয়ে বড় বড় বট গাছ,কৃষ্ণচূড়ার গাছ আর বাঁধের ঢালু মাটিতে সারি সারি গাঁদা ফুল। বোঝা যায় না চলন্ত গাড়িতে সে কত ভালো ছবি তুলতে পারে। পাশের সুসজ্জিতা মহিলা নাসিকা কুঞ্চিত করে আছেন। তারও নিশ্চয় মোবাইল রয়েছে। তবে তিনি বের করেন না। পাশের কোর্ট বাবুকে দেখে মনে হয় জগতের কোনো দিকে তার খেয়াল নেই। তিনিও হয়তো অফিসে যাচ্ছেন। মহিলা সেজেগুঁজে কোথায় যাচ্ছেন অনুমান করা যাচ্ছে না। তরুণী হাবিবের দিকে একবার গাঢ় দৃষ্টিতে তাকায়,তবে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তার তো সময় নেই, সে মহাব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। কলাপাতা রঙের জামাটা আসলে শার্টের মতো, কলার আছে, বোতাম আছে। এর সাথে মেয়েরা সাধারণত আজকাল ওড়না পরে না, সেও আসলে পরে নি, তবে রেখেছে, রেখেছে গলায় ঝুলিয়ে। ফাল্গুনের শেষের দিকে হলেও এবার মোটামুটি ঠাণ্ডা আছে। সবাই গরম কাপড় পরলেও মেয়েটা পরে নি। ওর কি শীত লাগছে? হাবিব মনে করে, সে কেন এত ভাবাভাবি করছে। প্রতিদিন তো সে অফিসে যায়, কত মেয়ের সাথে দেখা হয়, এভাবে তো সে কোনোদিন ভাবে নি বা চঞ্চল হয়ে ওঠে নি। সে কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। খুব জোরালো কারণ সে খুঁেজ পায় না। তবে বুঝতে পারে সে আজ অন্য এক মানুষ আর তাকে অন্য মানুষে পরিবর্তন করেছে এই মেয়েটা। আবার মনে হয়, তাই বা কেন? মেয়েটা সুন্দরী বা সে নানা রকম চঞ্চলতা দেখাচ্ছে সেটা তো স্বাভাবিক; তাহলে তাকে দায়ি করা তো ঠিক নয়। সে মনে করে এই চঞ্চলতা তার নিজের মধ্যে লুকিয়ে ছিলো,আজ উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে আলোতে বের হয়ে এসেছে। বাঁধের সাথে লাগোয়া পলাশ গাছে থোকা থোকা ফুল, সে তাকিয়ে থাকে; আবার দেখে একটা ন্যাড়া শিমুল গাছ। ফুল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এদের কাজই বোধ হয় মানুষের চোখকে রাঙিয়ে দেয়া। আর কোনো কাজ কি এদের আছে? সকালের রোদের সাথে পলাশের শিমুলের লাল রঙের মিশ্রণে এই অপূর্ব রঙের বিস্তার সে দেখে,যদিও ক্ষণিকের জন্য এবং চলন্ত অটোতে বসে যখন ইচ্ছে করলো আরো একটু গভীর করে দেখবে, দেখতে পায় না। তবু সে তাকিয়ে থাকে,দৃশ্যটা চোখ থেকে হারিয়ে গেলেও সে তাকিয়ে থাকে। এই লালের মধ্যে কি আগুন লেগে আছে? এই লালের মধ্যে কী জীবনের রোদ মুকুরিত হচ্ছে? এই সকালের রোদে শিমুল পলাশ কী তাকে আবাহন করছে? চোখ ফিরিয়ে নিয়ে, কিছুক্ষণ চোখ মুদে সে আবার চোখ খোলে। সামনে মেয়েটার ঠোঁটে লাল পলাশ রঙের গাঢ় লিপস্টিক। সে আই লাইনার দিয়ে চোখটাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। কখন হলো এসব? নাকি আগেই ছিলো। সে আশ্চর্য হয়ে যায়, ঠোটের গাঢ় লিপস্টিক কি সে আগে দেখেছে? নাকি পলাশ শিমুলের লাল ফুল দেখা চোখে ঐ রঙ গেথে আছে; তাই মেয়েটার ঠোঁট লাল? সে খানিকটা বিভ্রমে পড়ে। তার এটাও মনে হয় যে সে যখন হা করে শিমুল পলাশ দেখছিল সেই ফাকে মেয়েটা পলাশ রঙের লিপস্টিক মাখিয়ে নিয়েছে ঠোঁটে। সেটা কি আদৌ সম্ভব? সে আবার তাকায় চুপিচুপি- প্রগাঢ় শিমুল পলাশের লাল রঙে তার দুটো ঠোঁট জ্বল জ্বল করছে, একটু কাঁপছে তির তির করে। মেয়েটা একবার ডানে কাত হয়ে থাকে আর একবার বামে কাত হয়ে থাকে আর ডান হাতের তর্জনী দিয়ে কৃত্রিম গর্ত করে ফেলে কপোলে। আবার সে ডান হাঁটু উঁচু করে সেখানে ডান হাতের কনুই রেখে হাতের তালুতে থুতনি রাখে। এভাবে মুখটা তার আরো একটু কাছে আসে এবং ওপর থেকে নিচে আসে। পাশের ভদ্রলোক এখন সিটে হেলান দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে গভীর ঘুম। সেটাও ভালই। তবে হাবিবের মনে হয় এই হা করে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে ভদ্রলোক তার পুলকিত মনোস্তর নষ্ট করে দিচ্ছেন। পরক্ষণে এটাও মনে হয় এই কুশ্রি ভঙ্গির পাশে এই শিমুলপলাশ ওষ্ঠ রঙিন ভঙ্গিমাটা বেমানান হলেও পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট হয়েছে।

চালক ব্রেক করে অটো থামালে সাজুগুজু ভদ্রমহিলা নেমে যান। নামার সময় হাবিবের দিকে তেরছাভাবে একঝলক তাকান, তাতে ঘৃণামিশ্রিত লক্ষণ স্পষ্টভাবে যুক্ত ছিলো। ভদ্রমহিলা নামার পর ঐ সিটে আর একজন যুবক উঠে বসলে অটো চলতে শুরু করে। ভদ্রমহিলা নেমে যাবার সময় যে ক্রুরভঙ্গিতে তার দিকে তাকালেন তা নিয়ে ভাবতে হাবিব খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়। সে কি তরুণীর প্রতি বালখিল্য আচরণ করছে? নাকি অধিক উত্তেজনাবশত যা অনুচিৎ তাই করছে। বয়স্ক একজন মানুষ একজন তরুণীকে দেখে উৎসুক হলে এদেশের মানুষ ভালোভাবে নেয় না এই জ্ঞান তার আছে। তবে সে কি দৃশ্যত কোনো কিছু করেছে যা তাকে অপরাধী ভাবতে সাহায্য করে? তার ভেতরের কিছু অর্গল গেছে, সে সংবেদী হয়ে উঠেছে বা কয়েকবার তাকে দেখেছে নিভৃতে। সামনে একজন মানুষ বসে থাকলে দেখাটা খুব স্বাভাবিক; চোখ বুজে বসে থাকা যায়, জানালায় তাকিয়ে থাকা যায় সারাক্ষণ তবে সেটাও স্বাভাবিক আচরণ নয়। সে তার নিজের মথ্যে অস্বাভাবিকতা খোঁজার চেষ্টা করে। সে কি মানসিকভাবে খানিকটা অসুস্থ? ক্লান্ত, বিধ্বস্ত? যুবকের দিকে তাকিয়ে তার একটু যেন হিংসে হয়। মেয়েটার ওড়না বাতাসে উড়ে গিয়ে ছেলেটার কাধের ওপরে পড়ছে। ছেলেটা ভ্রুক্ষেপ করে না, মেয়েটাও না। সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে তার একটু রাগ হচ্ছে। ছেলেটার বাম হাতের ভাজ করা কনুই মেয়েটার শার্ট স্পর্শ করছে। তার কী সত্যি রাগ হচ্ছে? মনে মনে ভেবে দেখে,হ্যা হচ্ছে। তা হলে এটা কী লড়াই? অদৃশ্য প্রতিযোগিতা? সে কি মেয়েটার পাশে বসতে চায়? আবার মনে করে, সামনে বসেই বরং তার জন্য ভালো হয়েছে। সে তো চঞ্চলা হরিণী মেয়েটার প্রতিটি প্রযোজনা দেখতে পাচ্ছে। পাশে বসলে সেটা তো আর হতো না। হ্যাঁ, ছেলেটা কখনো কখনো মেয়েটার কাপড়ের মৃদু স্পর্শ পাচ্ছে। এই প্রথম সে বুঝতে পারে মানুষ যা মনে করে বা যা সে প্রকাশ্যে করে তার সব ব্যাখ্যা সে দিতে পারে না। কোনো সুপ্ত বাসনা বা অতৃপ্তি থেকে তার কী আচরণগত পরিবর্তন হবে সেটা সে কি করে বুঝবে?

কয়েকদিন থেকেই হাবিব বিধ্বস্ত ছিল; অন্তত তার এমন ধারণা। দুটো ঘটনার পর সে নিজেকে মিলিয়ে নিতে চেয়েছিল বা বুঝে নিতে চেয়েছিল। তার বায়ান্নতম জন্মদিনে ছেলেমেয়ে বউ মিলে চার পাউন্ড ওজনের একটা দামি কেক সাজিয়ে রেখে তাকে নতুন পাঞ্জাবি পরতে দিয়েছিল। মোমবাতিতে আগুন দিয়ে জ্বেলে তিনজন সমস্বরে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ’ বলে তাকে বরাবরের মতো উইশ করে। নতুন পোশাকে হাসি হাসি মুখ সবার।

জন্মদিন সে কখনোই আগ্রহ নিয়ে পালন করে না, মাঝে মধ্যে সবার চাপে পড়ে করতে হয়। বিশেষত মেয়ে বড় হবার পর সে বাবার জন্মদিন পালন করার রেওয়াজ চালু করেছে। আগে শুধু ওদের দুইভাইবোনের হতো। সে এটা ঠিক উপভোগ করে না। এই নিস্পৃহতার কারণ সে ব্যাখ্যা করতে পারে না। শ্যামলীকে দেখল খুব খুশি খুশি। মেয়ে বাবার গলা জড়িয়ে বলে, তোমাকে খুব মিস করি বাবা। ছেলেটা মেয়েটার তিনবছরের ছোট, সে মুখ টিপে হাসে। শ্যামলী বলে, বুড়ো খোকা, এবার কেক খাও, ভালো করে। মেয়ে কেক কাটে আর তিনজন মিলে চামচ ধরে তার মুখে পোরার আগে মেয়ে সেলফি তুলে ফেলে। এই ছবি তোলা তার কাছে অসহ্য লাগে। সে মনে করে এটা একটা রোগ। তবু মুখে কিছু বলতে পারে না। শ্যামলী যখন বলে বুড়ো খোকা, তখনই সে মনে মনে একটা কথা বলবে ভেবে রেখেছিল, এখন তা বলে: একটা গান আছে ,জানো তো? সবাই বলে বয়স বাড়ে. আমি বলি কমে রে। শ্যামলী বলে, হ্যাঁ, তবে এর কি অর্থ ভেবে দেখি নি। সে বলে, শোনো আমার যা বয়সের বরাদ্দ তার থেকে তো আজ একবছর কমল, তার মানে বয়স তো কমে ,তাই না? শ্যামলী ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, তুমি দেখি মর্বিডের মতো কথা বলছ, কেন? সে বলে, না মনে হলো তো তাই, ধরো, আমার আয়ু ষাট বছর। আজ বায়ান্ন পূর্ণ হলো, তাহলে আর আট বছর হয়তো আমি আছি। শ্যামলী হতচকিতের মতো বলে, এসবের মানে কি? – মানে কিছু না, গত সপ্তাহে স্বপন মারা গেছে, জানো? ও আমার তিন বছরের ছোট ছিলো। কি জীবন্ত আর হাসিখুশি ছেলে, আমাদের সব সময় রঙিন করে রাখত। ওর কোনো অসুখ ছিল না, ডাক্তারের কাছে যায় নি কোনোদিন, হাসপাতালের বেডে একদিনও শুয়ে থাকি নি। সেই দিন আমরা ওকে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। বেডে ডাক্তার ওকে শুইয়ে দিল, আমার দিকে ডান হাত উঁচু করে হালকাভাবে দোলালো,তার মানে, গুড বাই। চোখ বুজে গেল, ডান কাতে ফিরল, সব শেষ । শ্যামলী হাবিবের মুখের দিকে তাকায়। – তুমি বলনি তো আমাকে। – বলতে চেয়েছিলাম, বলতে পারি নি। আজ বলতে পারলাম। শ্যামলী বলে, ওটা একটা এ্যাকসিডেন্ট, আর সব বিষয়কে নিজের করে দেখ কেন? হাবিব বলে, নিজের করে দেখতে চাই না, তবে মাঝে মাঝে সব কিছু নিজের মধ্যে প্রোথিত মনে হয়। ধর, যখন মরমী কবিরা বলেন, আমার বুকের মধ্যে বা আত্মার মধ্যে ঈশ্বর রয়েছেন; আমরা তার সাথে লীন হয়ে বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকি, নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের নামে,বিশ্বাসের নামে,একটা মায়া-বন্ধনের সাথে, জানে সবাই এটা থাকবে না: আমরা একবারে সব ছিন্ন করে দিয়ে হুট করে স্বপনের মতো পাশ ফিরে শোব। ভাবতে পারো, আমার সব অগোছাল পড়ে আছে, কত কত কাজ, কয়েকটা কবিতার বই করব, অজ¯্র খাতা ডায়েরি, হিজি বিজি কত লাইন- একটা টিনের বাড়ি হবে আমাদের, অনেক গাছপালা থাকবে, একটা শান বাঁধানো পুকুর থাকবে। বৃষ্টির দিনে টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টি হবে, তুমি হয়তো রবী ঠাকুরের গান গাইতে বলবে, গ্রামে ফিরে যাব একদিন কাউকে না বলে; আমার রাখাল নামের বন্ধুর খোঁজ করতে ভারতে যাব, সে অখিল বন্ধুর গান করতো- ও দয়াল বিচার কর। আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছি, হালকা দাড়ি গোঁফ গজিয়েছে, সে ঘাড় করতে করতে টান দিচ্ছে সুরে। কত স্মৃতি ডাই হয়ে আছে,সব খুঁজে খুঁজে বের করব,পারব তো? আমার সব কিছু অস্পষ্ট দোলায়মান- অপসৃয়মান; তারা আমাকে ইশারা করে। তুমি, খোকা খুকি সবার সাথে আমার কত স্বপ্ন আছে, মেয়ের আঙুল ধরে ওর ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াব, ফুচকা খাবো, আইসক্রিম খাবো। লালনের গান গাইবে খুকি নতুন গলায় অথবা রবী ঠাকুরের – তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই, কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই। ভাবতে পারো? যতিচিহ্নের খোঁজে আমি হয়তো পথ হাঁটছি, নিজের জন্য যতিচিহ্ন, নিজের স্বপ্ন ভাঙার জন্য যতিচিহ্ন, প্রবহমান নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দেবার জন্য যতিচিহ্ন। হাবিব থামে,থামে মানে অবিরাম কথা বলতে বলতে হাপিয়ে যায় যেন। শ্যামলী মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে আসলে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কি বলবে হাবিবের এই সব কথার জবাবে। তার সুখের সংসার বলা যায়। প্রেম করে বিয়ে না হলেও দুজনের মধ্যে হৃদ্যতার কোনো ঘাটতি নেই। কবিতায় মশগুল থাকে বলে সে মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারে না ঠিকই বা এটাই হয়তো সামান্য দূরত্বের যায়গা। এর জন্যই কি এইসব মর্বিড চেতনায় ডুকে যাচ্ছে হাবিব? সে নিজের ত্রুটি খুঁজতে থাকে। তার ত্রুটি তো রয়েছে। সংসার সামলাতে গিয়ে হাবিবের ওপর চড়াও তাকে হতে হয় কখনো, গালমন্দ করতে হয়। তবে সেটা কোন সংসারে নেই? সে কোনো উত্তর দেবার আগেই হাবিব প্রসঙ্গের ইতি টানে: শোনো, এইসব আমার পাগলামি বলতে পার, মা মারা যাবার পর আমি ভাবতাম আমি আর বাঁচবো না, সে সময় আমার এক চরম দিন গেছে। কাটিয়ে উঠেছিলাম ধীরে ধীরে। এখনো মা আমার সামনে আছে। যে কোনো করুণ মুহূর্তে মা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি ফিরে আসি নতুন বেগে। সব ঠিক হয়ে যাবে, এসব সাময়িক ব্যাপার। শ্যামলী বুঝতে পারে হাবিব তাকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করছে। এটাও তার স্বভাবের অংশ। সে নীরব থাকে। কিছু বলতে পারে না।

মেয়েটা এখন তার মোবাইলের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন পড়ে, ডান হাতের তর্জনী চলে সমানে। বন্ধুর সাথে চ্যাটিং হচ্ছে বলে মনে হলো হাবিবের অথবা ফেইসবুকে কারো স্টেটাস পড়ে মন্তব্য করছে। খানিক পরে সে কথা বলতে শুরু করে ফোন কানে দিয়ে; বাম হাতে কপালের ওপর, কানের ওপর উড়ে আসা চুলগুলো সরায়। সাদা লালের মিশেলে তার ডান কানের লতিতে একটা উজ্জ্বল ছোট মাকড়ি। আজকালকার মেয়েরা কানে তো ছিদ্রই করে না। অথচ মেয়েটা ছোট দুল পরেছে, কারো অনুরোধে? সে ঝর ঝর করে কথা বলে, মনে হয় পাতলা ইস্পাতের টুকরো মেঝেতে পড়ছে ঝন ঝন করে – ওকে, আমি সন্ধ্যে বেলা আসব, তুমি লাউঞ্জে বসো, জাস্ট ছটায়, প্লান করবো কি করা যায়।’ আবার মোবাইল বাম হাতের চেটোয় রাখে, ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ডানে বামে ওপরে নিচে দাগ কাটে অর্থাৎ কথা চালাচালি হচ্ছে। হাবিব লক্ষ করে, মেয়েটার ডান পাশে যে একটা ছেলেটা বসে আছে সে দিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ছেলেটা অবশ্য সামনে নাক ডাকিয়ে ঘুমোনো লোকটার বিশাল ভুড়ির ওঠানামা দেখছে; এটাও হাবিবের অনুমান। চোখটা ওদিকে,তবে সে কি ভাবছে তা তো সে আর জানে না। তবে সে মেয়েটার দিকে একটু সরেই বসে আছে, ইচ্ছে করলে আর একটু ডানে যেতে পারত। হাঠাৎ মেয়েটার ফোন বেজে ওঠে। হাবিব বুঝতে পারে আগে সে কথা বলেছিল মেসেঞ্জারে, তাই রিংটোন বাজার আগেই সে কথা শুরু করে তবে এবার জোরে রিং টোন বেজে উঠল। একটা গানের প্রথম লাইন গেয়ে ওঠল একজন নারী। এটা তার কাছে ব্যতিক্রম মনে হল। কারণ এই সময়ের উঠতি তরুণ তরুণীদের রিংটোনে গান বাজে না। বাজলেও ইংরেজি গান। সে শোনে- আখি তাই তো এমন কোরে বলেছে, এ মন আমার তোমার পানে চেয়ে সারাক্ষণ। হাবিব অবাক হয়। এই গান এই মেয়ে কোথায় পেল? এদের তো এই গান শোনার কথা নয়। এই গান তারা শুনেছে কলেজে পড়ার সময়। রেডিওতে বাজত। গোটা গানটা তার এক সময় মুখস্ত ছিল। তার ছোট বোন গাইত বেশ সুন্দর করে। সে বেশ কিছু লাইন এখনো মনে করতে পারে। সে গানের মধ্য দিয়ে অনেক বছর আগে ফিরে যেতে চেয়েছিল, মেয়েটা যেন কি একটা শব্দ করলে সে ফিরে আসে বাস্তবে। মেয়েটা ডান পা বাম পায়ের ওপর ভাজ করে মোবাইলের স্ক্রিন সেখানে বাম হাতে ধরে নিজের মুখের অবয়ব লক্ষ করে। ব্যাগ থেকে মোটা চিরুনি বের করে মাথার ওপরে কয়েকবার চালান করে দেয়। লিপস্টিক দেয়া ঠোঁটে আবার আলতো করে লিপস্টিক বোলায়। বাম পা লম্বা করে দেয়ায় হাবিবের জুতোয় তার পা স্পর্শ করলেও মেয়েটা কিছু মনে করে না। হাবিব মনে করেছিল, সে হয়তো সরি বলবে অথবা পাটা তৎক্ষণাৎ সরিয়ে নেবে। সে মেয়েটাকে উদ্ধত ভাবতে গিয়েও থেমে যায়। ছোট অটোর মধ্যে পায়ে পা লাগা তো স্বাভাবিক। তবে হঠাৎ করে মেয়েটা নতুন করে সাজুগুজু শুরু করল কেন? সে ভেবে পায় না। তবে তার চঞ্চলতাই যে তাকে আবিষ্ট করে রেখেছে সেখানে এই সব বিষয় তুচ্ছ বিবেচনা করা যায়। সে অভ্যেসবশত নিজের পায়ের দিকে নজর দেবার চেষ্টা করে; তার চকচকে কালো জুতোয় মেয়েটার পাতলা হিলের অগ্রভাগ স্পর্শ করে আছে। মেয়েটা কী জানে? জানলে জানুক,না জানলে নয়। সে বরং তার চোখের গভীর প্রসারতা নিয়ে ভাবতে পারে যা অনেকদিন পর মেয়েটা জাগিয়ে তুলেছে। হালকা ঠা-া আর সামান্য উষ্ণতা নিয়ে মিলে ফাল্গুনের এই সকালে সে হিরন্ময় এক সময় পার করতে যাচ্ছে,তার ভেতরের সব অর্গল খুলে খুলে যাচ্ছে, সেখানে ঠুনকো কোনো বিষয়কে সে পাত্তা দিতে চায় না। অটো চলেছে পূর্ব দিকে, রাস্তার বাম ধার দিয়ে। এখনো ধুলো তার শরীর প্রসারিত করে নি, রোদ তার আসল চরিত্র দেখায় নি। এই সময় সে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হয়েছে। এই মেয়েটা কী পৃথিবী? নাকি পৃথিবীর উপমা অথবা প্রতিরূপ। এই পৃথিবী তাকে ডাকছে তার সব নিপুণ দরোজা উন্মুক্ত করে দিতে। সে বলেছে, তোমার চোখ মরে যাই নি, তুমি মরে যাওনি বরং তুমি এখনো ইজেলে রঙ টানতে পারো ইচ্ছে মতো, ইচ্ছে মতো দেখে নিতে পারো জীবনের নীনাদ- কোন দিকে জীবনের গলি, গভীর আরাধ্য, খুটিনাটি ডালপালা, পাতা ফুলের ব্যঞ্জনা; চোখ খুললেই সব তো নয়, চোখ বুজে থেকেও তুমি সব অবলোকন করতে পারো। চঞ্চলা নদীর নূপুর, কিশোরীর ঘুঙুর রাঙা পা, চোখের মদীর ”ঞ্চলতা, তুমি জীবন-মৃত্যুর ধারাপাত বুঝে নাও,খুজে নাও তোমার নোঙর।

বাম পাশের লোকটা নাক ডাকা থামিয়ে দুম করে জেগে ওঠেন। তিনি রুমাল দিয়ে তার মুখের লালা মোছেন। হাত দিয়ে কোর্টের দুপাশের অদৃশ্য ময়লা ছেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন, চোখ মোছেন রুমাল দিয়ে। ¤্রয়িমান একটা হাই তোলেন। মেয়েটা বোধ হয় নামবে। সে উসখুশ করে। সে অটো চালককে ‘মামা থামান’ বললে অটো আট দশ হাত সামনে গিয়ে থেমে যায়। ছেলেটা কোনো ভনিতা না করে নেমে দাঁড়ায়। মেয়েটা ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেটের দিকে তার সামান্য উঁচু হিলে মৃদু শারীরিক কম্পন তুলে হাঁটতে থাকে। একটা টিয়ে পাখি মরা বাবলার ডালে কোত্থেকে এসে বসে। তার ঠোঁট মেয়েটার ঠোটের মতো লাল, মেয়েটার জামার রঙ টিয়ে পাখির মতো। ছেলেটা সিটে বসলে অটো চলতে শুরু করে।

হাবিব অফিসে ঢুকে তার ডেস্কে বসে। চাবি দিয়ে তার ড্রয়ার খোলে। কলম সিল প্যাড বের করে। কম্পিউটার চালু করে। এখনো অফিস শুরু হতে মিনিট পনের বাকি। পিয়ন মতিন এসে এক কাপ চিনি ছাড়া লাল চা দেয় প্রতিদিনকার অভ্যেসমতো। পাশের ডেস্কেও মেয়েটা হন্তদন্ত হয়ে বসে পড়ে। ম্যানেজার সাহেব এলে সবাইকে একবার ডাকবেন তার রুমে দুমিনিটের জন্য। উদ্দেশ্য হলো সবাই ঠিক সময়মতো অফিসে এসেছে কিনা, তবে তিনি তা না বুঝতে দেবার ভান করবেন,একটা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলবেন।‘ এখানে আমাদের উন্নতি করার চেষ্টা করতে হবে ’ জাতীয় কথা শুনে হাবিবের মুখস্ত হয়ে গেছে; রাগ হয়, বমি বমি ভাব হয়। তবু শোনে, শুনতে হয়। অফিসে সবার সাথে তার সদ্ভাব আছে তবে কারোর সাথে অফিসবিষয়ক কথাবার্তার বাইরে তেমন কিছু বলে না। সে একসময় ভালো কবিতা লিখতো, কবি হিসেবে তার বেশ সুনাম ছিলো তা এরা কেউ জানে না। কাউকে সে বলে নি। বললে কি হতো সে জানে না.তবে তার মনে হয়েছে এই অর্থকড়ি হিসেব-কিতাবের মধ্যে কবিতাবিষয়ক আলোচনার কথা বলা মানে মানুষকে বিব্রত করা অথবা নিজেকে তাচ্ছিল্যের পাত্র হিসেবে উপস্থাপনা করা। তবু সে নির্বিবাদে চাকরি করে ঘাড় গুজে। কোনো দিন তার কোনো কাজে ভুল হয় নি।

কেন ভুল হয় নি? তার তো হরদম ভুল হবার কথা, কেন হয় না? সে তো ভুলো মানুষই ছিলো। এই ব্যাংক, সংসার তাকে টাইপ্ড করে ফেলেছে? নাকি সেই এই রকম হয়ে গেছে। খয়েরি রঙের ড্রেসে লাবণীকে বেশ ভালো লাগছে আজ। সে তার অনেক ছোট। তাকে কখনো সে ভালো করে দেখেছে বলে মনে করতে পারেনা। সে ক্ষণিকের জন্য তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিচের ঠোঁটের বাম পাশের নিচে ছোট্ট একটা লাল জড়–ল আবিষ্কার করে। একটা মোহন ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিলে লাবণী বলে, কি হলো ভাইয়া; হাবিব কিছু বলে না। সে মনে করে পরক্ষণে আসলে সে কিছু দেখেনি। দেখেছে, নাকি দেখে নি এই নিয়ে সে দ্বিধায় পড়ে যায়। সেকি তার দীর্ঘদিনের অফিসজীবনের বাধাধরা নিয়মকানুন ভুলে যাচ্ছে? কম্পিউটার স্ক্রিনে পুরনো দিনের হিসেব দেখে সে কিছুই বুঝতে পারে না। নতুন হিসেব কিভাবে যেন বের করতে হয়? ম্যানেজার যে স্টেটমেন্ট চেয়েছে সেটা সে খুঁজে পায় না। দশ মিনিটের মাথায় এই প্রথম ম্যানেজার সাহেব তাকে থমক দেন। সে চোখ পিট পিট করে তাকায় শুধু। লাবণী এসে তার পিছনে দাঁড়ায়। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখতে পায় ওখানে সব ঠিক আছে। একটা ব্যাকক্লিক করে সে বলে, এই দেখুন, সব ঠিক আছে, প্রিন্ট দিন।’ হাবিব বলে, কোথায়? সব তো এলোমেলো মনে হচ্ছে। লাবণ্য হাবিবকে তার সিটে বসতে বলে। হাবিব উঠলে সে স্টেটমেন্ট দুই মিনিটের মধ্যে প্রিন্ট করে ম্যানেজারের রুমে দিয়ে আসে।

হাবিব লাবণ্যের ডেস্কে মাথা গুঁজে চোখ বুজে আছে। নাকি সে ঘুমোচ্ছে। লাবণ্য দু’বার ডাকলেও সে উত্তর দেয় না। হাবিব গভীর প্রশান্তির দিকে যাচ্ছে, প্রজাপতির পাখার দিকে যাচ্ছে, নিত্যদিনের কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাতাসের সাথে উড়ে উড়ে যাচ্ছে, সে নরিতসু এক জালের ভেতর আটকে যাচ্ছে, তার আনন্দ হচ্ছে,পুলক হচ্ছে, গভীর পুলক। ক্লান্তির বা অবসাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে যাচ্ছে। চোখের দীপ্তিতে দেখতে পাচ্ছে পৃথিবীর সব রঙ – সব চঞ্চলতা। লাবণ্য তাকে মৃদু থাক্কা দিয়ে ডাকে। কোনো উত্তর পায় না।
একটু পরেই সবাই হাবিবকে নিয়ে চঞ্চল হয়ে উঠবে।

About S M Tuhin

দেখে আসুন

যাপনের জীবন যাত্রা : ঋভু চট্টোপাধ্যায়

যাপনের জীবন যাত্রা ঋভু চট্টোপাধ্যায় -তুমি আজ কিন্তু সন্ধেবেলায় বেরোবে না বাবা, আমাকে লগের প্রবলেম …

159 কমেন্টস

  1. Фільми українською в хорошій якості – онлайн
    без реклами Мир Юрского периода 2

  2. Дивитися фільми онлайн в HD якості українською мовою Link

  3. Фільми та серiали 2020 українською мовою в HD якості Link

  4. Новинки фільми, серіали, мультфільми
    2021 року, які вже вийшли Ви можете дивитися українською
    на нашому сайті Вечер с Владимиром Соловьевым

  5. Всі фільми новинки 2020 року онлайн
    українською в хорошій якості Вечер с Владимиром Соловьевым

  6. Не пропустіть кращі новинки кіно українською
    2021 року z.globus-kino.ru

  7. It’s difficult to find well-informed people for this subject, however, you sound like you know what you’re talking about! Thanks|

  8. This is very interesting, You’re a very skilled blogger. I have joined your feed and look forward to seeking more of your wonderful post. Also, I’ve shared your web site in my social networks!|

  9. Всі фільми новинки 2020 року онлайн українською в хорошій якості link

  10. Excellent article. I am facing some of these issues as well..|

  11. I just could not leave your web site prior to suggesting that I actually enjoyed the standard info a person supply to your guests? Is going to be again often in order to inspect new posts|

  12. It’s appropriate time to make some plans for the future and it’s time to be happy. I have read this post and if I could I wish to suggest you some interesting things or advice. Maybe you could write next articles referring to this article. I want to read more things about it!|

  13. You really make it seem so easy with your presentation but I find this matter to be actually something which I think I would never understand. It seems too complicated and extremely broad for me. I’m looking forward for your next post, I’ll try to get the hang of it!|

  14. Great post. I was checking continuously this blog and I am impressed! Extremely helpful info particularly the last part 🙂 I care for such info a lot. I was seeking this certain info for a very long time. Thank you and good luck.|

  15. I believe everything posted made a lot of sense. However, think about this, what if you typed a catchier title? I mean, I don’t wish to tell you how to run your blog, however what if you added a title that makes people desire more? I mean BLOG_TITLE is kinda plain. You ought to look at Yahoo’s front page and note how they create news headlines to grab viewers to click. You might try adding a video or a related pic or two to grab readers excited about what you’ve written. Just my opinion, it might make your posts a little bit more interesting.|

  16. Do you mind if I quote a couple of your articles as long as I provide credit and sources back to your website? My website is in the very same area of interest as yours and my users would certainly benefit from a lot of the information you present here. Please let me know if this alright with you. Regards!|

  17. Pretty! This was an extremely wonderful article. Thank you for providing this information.|

  18. It’s remarkable designed for me to have a website, which is valuable for my experience. thanks admin|

  19. Новинки фільми, серіали, мультфільми 2021 року, які вже вийшли Ви можете дивитися українською на нашому сайті link

  20. Howdy! Do you know if they make any plugins to protect against hackers? I’m kinda paranoid about losing everything I’ve worked hard on. Any tips?|

  21. I constantly spent my half an hour to read this web site’s articles all the time along with a mug of coffee.|

  22. I’m really enjoying the theme/design of your website. Do you ever run into any internet browser compatibility issues? A number of my blog visitors have complained about my website not operating correctly in Explorer but looks great in Firefox. Do you have any advice to help fix this issue?|

  23. Quality content is the key to attract the users to visit the web page, that’s what this web page is providing.|

  24. I am extremely impressed with your writing skills and also with the layout on your blog. Is this a paid theme or did you customize it yourself? Either way keep up the nice quality writing, it is rare to see a nice blog like this one nowadays.|

  25. Hey! I could have sworn I’ve been to this blog before but after reading through some of the post I realized it’s new to me. Anyways, I’m definitely delighted I found it and I’ll be book-marking and checking back frequently!|

  26. I’m extremely impressed together with your writing talents as smartly as with the format for your blog. Is this a paid topic or did you modify it yourself? Either way keep up the excellent high quality writing, it’s rare to look a great weblog like this one nowadays..|

  27. I read this paragraph fully on the topic of the comparison of latest and preceding technologies, it’s awesome article.|

  28. Can you tell us more about this? I’d want to find out more details.|

  29. If some one desires expert view about running a blog after that i suggest him/her to visit this web site, Keep up the fastidious job.|

  30. Today, I went to the beachfront with my children. I found a sea shell and gave it to my 4 year old daughter and said “You can hear the ocean if you put this to your ear.” She placed the shell to her ear and screamed. There was a hermit crab inside and it pinched her ear. She never wants to go back! LoL I know this is completely off topic but I had to tell someone!|

  31. This design is incredible! You most certainly know how to keep a reader entertained. Between your wit and your videos, I was almost moved to start my own blog (well, almost…HaHa!) Excellent job. I really enjoyed what you had to say, and more than that, how you presented it. Too cool!|

  32. It’s in reality a great and useful piece of info. I am satisfied that you just shared this useful info with us. Please stay us up to date like this. Thanks for sharing.|

  33. I’m not sure why but this website is loading extremely slow for me. Is anyone else having this problem or is it a problem on my end? I’ll check back later and see if the problem still exists.|

  34. Howdy would you mind letting me know which webhost you’re working with? I’ve loaded your blog in 3 completely different web browsers and I must say this blog loads a lot faster then most. Can you recommend a good web hosting provider at a fair price? Thanks, I appreciate it!|

  35. It’s not my first time to pay a quick visit this website, i am visiting this site dailly and get nice data from here every day.|

  36. Yes! Finally someone writes about keyword1.|

  37. Hey there, You have done a great job. I’ll definitely digg it and individually suggest to my friends. I am sure they will be benefited from this web site.|

  38. Wow, that’s what I was exploring for, what a information! present here at this website, thanks admin of this web page.|

  39. I like the helpful information you provide in your articles. I will bookmark your weblog and check again here regularly. I am quite sure I will learn lots of new stuff right here! Best of luck for the next!|

  40. This is a topic that’s near to my heart… Many thanks! Where are your contact details though?|

  41. I’m impressed, I must say. Seldom do I encounter a blog that’s equally educative and entertaining, and let me tell you, you’ve hit the nail on the head. The issue is something not enough folks are speaking intelligently about. I am very happy I found this in my hunt for something regarding this.|

  42. Great information. Lucky me I came across your website by accident (stumbleupon). I’ve saved it for later!|

  43. Hi there! This blog post could not be written any better! Going through this post reminds me of my previous roommate! He always kept preaching about this. I will forward this article to him. Fairly certain he’s going to have a very good read. Thank you for sharing!|

  44. What’s up friends, how is the whole thing, and what you want to say on the topic of this post, in my view its actually awesome designed for me.|

  45. Oh my goodness! Awesome article dude! Thanks, However I am having problems with your RSS. I don’t know the reason why I am unable to join it. Is there anybody else having identical RSS problems? Anyone that knows the solution will you kindly respond? Thanks!!|

  46. What i don’t understood is in reality how you’re now not really a lot more neatly-preferred than you might be now. You’re very intelligent. You recognize thus significantly when it comes to this matter, produced me in my opinion believe it from a lot of various angles. Its like women and men are not fascinated unless it is something to do with Lady gaga! Your individual stuffs outstanding. At all times maintain it up!|

  47. Greate pieces. Keep posting such kind of information on your page. Im really impressed by your blog.

  48. I am really enjoying the theme/design of your weblog. Do you ever run into any internet browser compatibility issues? A few of my blog readers have complained about my site not operating correctly in Explorer but looks great in Chrome. Do you have any solutions to help fix this issue?|

  49. Whats up this is kind of of off topic but I was wanting to know if blogs use WYSIWYG editors or if you have to manually code with HTML. I’m starting a blog soon but have no coding expertise so I wanted to get advice from someone with experience. Any help would be enormously appreciated!|

  50. I like it when individuals come together and share thoughts. Great website, stick with it!|

  51. Fantastic goods from you, man. I’ve understand your stuff previous to and you’re just extremely magnificent. I really like what you’ve acquired here, really like what you are stating and the way in which you say it. You make it entertaining and you still care for to keep it wise. I can not wait to read much more from you. This is actually a great site.|

  52. I constantly emailed this blog post page to all my friends, since if like to read it after that my friends will too.|

  53. whoah this blog is magnificent i love studying your posts. Keep up the good work! You know, lots of people are looking round for this info, you could aid them greatly. |

  54. Someone necessarily lend a hand to make critically posts I’d state. That is the first time I frequented your website page and thus far? I amazed with the research you made to make this actual submit extraordinary. Fantastic activity!|

  55. Incredible story there. What occurred after? Thanks!|

  56. Hi there mates, pleasant piece of writing and fastidious arguments commented at this place, I am actually enjoying by these.|

  57. This paragraph will assist the internet viewers for building up new website or even a weblog from start to end.|

  58. Hello there, You’ve done a fantastic job. I’ll definitely digg it and personally recommend to my friends. I am confident they will be benefited from this website.|

  59. Magnificent goods from you, man. I’ve take into accout your stuff previous to and you’re just extremely fantastic. I actually like what you’ve acquired right here, really like what you’re stating and the way wherein you are saying it. You are making it enjoyable and you still care for to keep it smart. I can’t wait to learn far more from you. This is actually a terrific web site.|

  60. I was suggested this web site by my cousin. I am not sure whether this post is written by him as no one else know such detailed about my difficulty. You are amazing! Thanks!|

  61. Howdy this is kinda of off topic but I was wanting to know if blogs use WYSIWYG editors or if you have to manually code with HTML. I’m starting a blog soon but have no coding expertise so I wanted to get advice from someone with experience. Any help would be enormously appreciated!|

  62. If you want to improve your know-how just keep visiting this web site and be updated with the newest news update posted here.|

  63. I have been browsing online more than three hours today, yet I never found any interesting article like yours. It is pretty worth enough for me. In my opinion, if all site owners and bloggers made good content as you did, the web will be a lot more useful than ever before.|

  64. Hello there! Quick question that’s entirely off topic. Do you know how to make your site mobile friendly? My website looks weird when viewing from my apple iphone. I’m trying to find a template or plugin that might be able to fix this issue. If you have any recommendations, please share. Many thanks!|

  65. We absolutely love your blog and find nearly all of your post’s to be just what I’m looking for. Does one offer guest writers to write content for you? I wouldn’t mind publishing a post or elaborating on a lot of the subjects you write regarding here. Again, awesome web site!|

  66. Woah! I’m really enjoying the template/theme of this site. It’s simple, yet effective. A lot of times it’s challenging to get that “perfect balance” between superb usability and visual appeal. I must say that you’ve done a excellent job with this. In addition, the blog loads extremely fast for me on Opera. Excellent Blog!|

  67. Have you ever thought about including a little bit more than just your articles? I mean, what you say is valuable and all. Nevertheless just imagine if you added some great photos or videos to give your posts more, “pop”! Your content is excellent but with images and video clips, this site could certainly be one of the most beneficial in its niche. Terrific blog!|

  68. Everyone loves it when individuals get together and share views. Great site, continue the good work!|

  69. Hi there Dear, are you actually visiting this website on a regular basis, if so after that you will definitely take pleasant knowledge.|

  70. I’m not that much of a online reader to be honest but your blogs really nice, keep it up! I’ll go ahead and bookmark your website to come back later on. All the best|

  71. Hi, just wanted to say, I liked this post. It was helpful. Keep on posting!|

  72. Sweet blog! I found it while searching on Yahoo News. Do you have any suggestions on how to get listed in Yahoo News? I’ve been trying for a while but I never seem to get there! Thank you|

  73. bookmarked!!, I love your website!|

  74. What a data of un-ambiguity and preserveness of precious knowledge about unexpected feelings.|

  75. This is my first time pay a quick visit at here and i am in fact pleassant to read everthing at alone place.|

  76. Excellent, what a weblog it is! This web site gives valuable facts to us, keep it up.|

  77. I do agree with all the concepts you’ve presented in your post. They are really convincing and will certainly work. Still, the posts are very short for newbies. May just you please lengthen them a little from subsequent time? Thanks for the post.|

  78. Nice read, I just passed this onto a friend who was doing some research on that. And he actually bought me lunch since I found it for him smile Thus let me rephrase that: Thank you for lunch!

  79. My brother recommended I might like this website. He was totally right. This post truly made my day. You cann’t imagine just how much time I had spent for this info! Thanks!|

  80. Oh my goodness! Amazing article dude! Thank you, However I am experiencing problems with your RSS. I don’t know why I cannot join it. Is there anybody having identical RSS problems? Anyone who knows the answer will you kindly respond? Thanks!!|

  81. Woah! I’m really enjoying the template/theme of this site. It’s simple, yet effective. A lot of times it’s very hard to get that “perfect balance” between user friendliness and visual appeal. I must say that you’ve done a fantastic job with this. In addition, the blog loads super quick for me on Opera. Exceptional Blog!|

  82. Please let me know if you’re looking for a writer for your weblog. You have some really great posts and I feel I would be a good asset. If you ever want to take some of the load off, I’d love to write some articles for your blog in exchange for a link back to mine. Please blast me an email if interested. Cheers!|

  83. Woah! I’m really loving the template/theme of this website. It’s simple, yet effective. A lot of times it’s very difficult to get that “perfect balance” between superb usability and appearance. I must say you have done a very good job with this. Additionally, the blog loads super fast for me on Safari. Outstanding Blog!|

  84. I’ve been surfing online more than three hours today, yet I never found any interesting article like yours. It is pretty worth enough for me. Personally, if all web owners and bloggers made good content as you did, the net will be much more useful than ever before.|

  85. A motivating discussion is worth comment. I do think that you need to write more about this issue, it may not be a taboo subject but usually folks don’t talk about such subjects. To the next! Many thanks!!|

  86. Having read this I believed it was extremely informative. I appreciate you finding the time and energy to put this article together. I once again find myself spending way too much time both reading and posting comments. But so what, it was still worth it!|

  87. Hi colleagues, its impressive piece of writing about educationand completely explained, keep it up all the time.|

  88. Highly energetic article, I enjoyed that a lot. Will there be a part 2?|

  89. Highly energetic post, I liked that bit. Will there be a part 2?|

  90. Every weekend i used to pay a visit this site, for the reason that i wish for enjoyment, since this this site conations truly fastidious funny material too.|

  91. Hi there, i read your blog occasionally and i own a similar one and i was just curious if you get a lot of spam comments? If so how do you reduce it, any plugin or anything you can advise? I get so much lately it’s driving me crazy so any assistance is very much appreciated.|

  92. I do trust all the concepts you’ve offered in your post. They’re very convincing and will definitely work. Still, the posts are very quick for beginners. May you please lengthen them a little from next time? Thank you for the post.|

  93. Amazing issues here. I’m very glad to see your post. Thank you so much and I am taking a look forward to touch you. Will you kindly drop me a e-mail?|

  94. This is a topic that is near to my heart… Cheers! Exactly where are your contact details though?|

  95. how Long Does Cialis Take Effect?

  96. order generic modafinil 200mg modafinil 100mg over the counter modafinil 100mg without prescription

  97. Howdy! Someone in my Facebook group shared this website with us so I came to give it a look. I’m definitely loving the information. I’m book-marking and will be tweeting this to my followers! Terrific blog and outstanding design and style.|

  98. Aw, this was a very good post. Taking the time and actual effort to produce a top notch article… but what can I say… I put things off a lot and never manage to get anything done.|

  99. generic provigil 100mg provigil tablet provigil 100mg cheap

  100. what Is The Meaning Of The Two Bathtubs In The Cialis Commercials?

  101. Howdy exceptional website! Does running a blog similar to this require a large amount of work? I have absolutely no knowledge of computer programming however I was hoping to start my own blog soon. Anyway, should you have any suggestions or tips for new blog owners please share. I understand this is off subject but I simply had to ask. Cheers!|

  102. excellent issues altogether, you just gained a emblem new reader. What could you suggest about your put up that you just made a few days ago? Any certain?|

  103. Hello, constantly i used to check web site posts here in the early hours in the morning, since i like to find out more and more.|

  104. I’ve been exploring for a little bit for any high quality articles or weblog posts on this sort of house . Exploring in Yahoo I ultimately stumbled upon this site. Reading this information So i’m happy to show that I have a very just right uncanny feeling I found out just what I needed. I so much no doubt will make sure to don?t overlook this website and provides it a glance regularly.|

  105. levitra Or Cialis Which Is Better?

  106. Hello there! I know this is somewhat off topic but I was wondering which blog platform are you using for this site? I’m getting fed up of WordPress because I’ve had issues with hackers and I’m looking at options for another platform. I would be great if you could point me in the direction of a good platform.|

  107. Right here is the perfect website for everyone who would like to find out about this topic. You know a whole lot its almost tough to argue with you (not that I personally would want to…HaHa). You definitely put a brand new spin on a topic that’s been discussed for years. Excellent stuff, just great!|

  108. I don’t even understand how I stopped up here, but I thought this post used to be good. I don’t recognise who you are but certainly you are going to a well-known blogger in the event you are not already. Cheers!|

  109. Психолог онлайн. Консультация Когда необходим прием психолога? – 5005 врачей, 6133 отзывов.

  110. Психолог онлайн. Консультация Когда необходим прием психолога? – 3840 врачей,
    7616 отзывов.

  111. Психолог онлайн. Консультация Прием психолога? – 4408 врачей, 3213 отзывов.

  112. When I originally commented I clicked the “Notify me when new comments are added” checkbox and now each time a comment is added I get four e-mails with the same comment. Is there any way you can remove people from that service? Thanks a lot!|

  113. Hello! This is my first visit to your blog! We are a group of volunteers and starting a new project in a community in the same niche. Your blog provided us useful information to work on. You have done a extraordinary job!|

  114. provigil over the counter cost provigil 100mg buy generic provigil 200mg

  115. Психолог онлайн. Консультация Когда необходим прием психолога? – 6246 врачей, 6570 отзывов.

  116. Психолог онлайн. Консультация
    Когда необходим прием психолога? – 5594 врачей, 6831 отзывов.

  117. Психолог онлайн. Консультация Прием психолога?
    – 5632 врачей, 4344 отзывов.

  118. Психолог онлайн. Консультация Психолога – 6374 врачей, 3322 отзывов.

  119. Психолог онлайн. Консультация Психолога онлайн
    6379 врачей, 7827 отзывов.

  120. Психолог онлайн. Консультация Когда необходим прием психолога? – 4742 врачей, 7990
    отзывов.

  121. Психолог онлайн. Консультация Психолога онлайн – 6940 врачей,
    3529 отзывов.

  122. That is a very good tip especially to those new to the blogosphere. Chadwick Tegan

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *